একটি জয়ই সব বদলে দেবে

১.

স্বপ্ন এমন একটা জিনিস যা চুড়ান্তভাবে কখনোই শেষ হওয়ার নয়। একটি স্বপ্নপূরণের পর সামনে এসে দাঁড়ায় আরেকটি। আবার একটি স্বপ্নভঙ্গ শেষে হাতছানি দেয় অন্য স্বপ্নের গন্তব্য। শুধু ক্রিকেটেই নয়, সব ক্ষেত্রেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে ছুটে চলার অন্য নামই তো জীবন! স্বপ্ন হারিয়ে ফেললেন, মানে জীবন স্থবির!

২.

নাহ, এদের দিয়ে আর হবে না! দক্ষিণ আফ্রিকায় পারবে না বাংলাদেশ – টেস্ট সিরিজে একতরফা হারের পর কেউ কেউ বোধহয় এরইমধ্যে এমন উপসংহারে পৌঁছে গেছেন! প্রোটিয়াদের দেশে এবার জয়ের মুখ দেখা হচ্ছে না, এরকম বাস্তবিক শঙ্কার সামনে দাঁড়িয়েও নাহয় নাসির হোসেনের কথাটা উড়িয়ে দেবেন না, ‘ভক্তরা যেন আমাদের ওপর আস্থা রাখেন, বিশ্বাস রাখেন। আমরা অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াব।’ বেশি আশা করে হতাশ হওয়ার চেয়ে কম আশা করে বেশি পাওয়ার তৃপ্তিই তো আলাদা!

৩.

ক্রিকেটে পরিসংখ্যানকে যতই ‘আস্ত একটা গাধা’ বলুন না কেন, শেষ পর্যন্ত আপনাকে ওই গাধাটার পিঠে সওয়ার হতেই হবে! এ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশ ১৭টি ওয়ানডে খেলে ১৪টিতে হেরেছে এবং ৩টিতে জিতেছে। যার দুটিই শেষ মোকাবেলায়! ওয়েস্ট ইন্ডিজে ২০০৭ বিশ্বকাপে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে প্রথম জয়ের মুখ দেখেছিল বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ঘরের মাঠে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডেতে হারার পর টানা দুটি ম্যাচ জিতে ২-১ এ সিরিজ জয় করেছিল।

আচ্ছা, দক্ষিণ আফ্রিকা কী এতই খারাপ দল হয়ে গেল যে, বাংলাদেশে এসে সিরিজ হেরে যাবে; আবার পরাজিত হবে নিজেদের আঙ্গিনাতেও!

জানিয়ে রাখা ভালো, উপমহাদেশের দলগুলোর মধ্যে কেবল পাকিস্তানই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চার বারের মধ্যে একবার (২০১৩ সালে, ২-১ এ) দ্বি-পক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজ জিতে আসতে পেরেছে। তাও ভাগ্যের ছোঁয়ায়, যেখানে পাকরা হারতে হারতে দ্বিতীয় ম্যাচ জিতেছিল এক রানে! ভারত-শ্রীলঙ্কা এখনো পারে নি দক্ষিণ আফ্রিকায় সিরিজ জিততে, হেরেছে প্রত্যেকটি (চারটি করে) সিরিজ।

৪.

২০১৪ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে হোম সিরিজ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দ্বি-পক্ষীয় সিরিজ ও বহুজাতিক টুর্ণামেন্ট খেলেছে ১২টি। এর মধ্যে নয়টি দ্বি-পক্ষীয় সিরিজের মধ্যে টানা ছয়টিই (যথাক্রমে জিম্বাবুয়ে, পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে) জিতেছে বাংলাদেশ; পরাজিত হয়েছে ২টিতে (ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে) এবং একটি সিরিজ (শ্রীলঙ্কার সঙ্গে) ড্র করেছে।

আর তিনটি বহুজাতিক টুর্ণামেন্টের মধ্যে একটিতে কোয়ার্টার ফাইনাল (বিশ্বকাপ ২০১৫), একটিতে সেমিফাইনাল (চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ২০১৭) এবং অন্যটিতে ফাইনালে (আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ) খেলেছে বাংলাদেশ। এ সময় শুধু একটি সিরিজেই কোনো জয়ের মুখ দেখেনি বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। ওই ব্যতিক্রম বাদে বাকী ১১টি সিরিজেই ভালো খেলেছে বাংলাদেশ এবং একটি হলেও জয়ের স্বাদ পেয়েছে। এসব তথ্য-পরিসংখ্যান এই আশাই জাগায় যে, অন্তত ওয়ানডেতে জয়শুন্য থাকার আশঙ্কা কম বাংলাদেশের।

৫.

তিনদিনের প্রস্তুতি ম্যাচ, দুটি টেস্ট ও একদিনের গা গরমের ম্যাচ; এ পর্যন্ত চারটি ম্যাচ খেলে দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো দলকেই একটা ইনিংসেও অলআউট করতে পারে নি বাংলাদেশ। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার পাশাপাশি বোলারদের পারফরম্যান্স যাচ্ছেতাই। বাংলাদেশ ধরেই নিয়েছিলো যে, সেখানে বাউন্সি ও গ্রিনটপ উইকেট পাওয়া যাবে। কিন্তু ফ্ল্যাট উইকেট বানিয়ে চমকে দিয়েছে স্বাগতিকরা! ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজেও বোলিং সহায়ক সাংঘাতিক কোনো উইকেট পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

তবে এটা তো ঠিক, বিরল ব্যাতিক্রম বাদে টেস্টে যেমন প্রতিপক্ষকে অলআউট করতে হয়; সীমিত ওভারের ক্রিকেটে কিন্তু সবগুলো উইকেট না নিয়েও ম্যাচ জেতা যায়। সেক্ষেত্রে অবশ্যই লাইন-লেংথ ঠিক রেখে বল করে ব্যাটসম্যানদের বেঁধে রাখতে হবে। এই কাজটা বাংলাদেশের বোলাররা মোটামুটি পারেন। পারেন ব্যাটসম্যানরাও। টেস্টে ধৈর্য্য ধরে ইনিংস গড়ার মতো কোনো ব্যাটসম্যান নেই বাংলাদেশের; টি-টোয়েন্টিতে নেই সলিড বিগ হিটার! কিন্তু ওয়ানডেতে সময়ের চাহিদা মিটিয়ে স্কোরকার্ড ছোটানোর মতো অন্তত গোটা চারেক উইলোবাজ আছে বাংলাদেশের।

৬.

যে যাই বলুন না কেন, গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাকিবই বাংলাদেশের নিউক্লিয়াস। তাকে ঘিরেই কিন্তু আবর্তিত হয় বাংলাদেশের ভালো-খারাপের সমীকরণ। টেস্ট সিরিজে বিশ্রাম নিয়ে ওয়ানডেতে সাকিব যোগ দিয়েছেন বলে বাড়তি অনূপ্রেরণা পাবে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বড় কথা, মুশফিকের মতো একঘেঁয়েমি ও নেগেটিভ অধিনায়কত্ব দেখতে হবে না। মাশরাফি মানেই অন্যরকম নেতৃত্ব এবং সময়ের দাবী মেনে কিছু ‘ফাটকা খেলা’ যা প্রায়ই কাজে লেগে যায়।

ইনজুরি কাটিয়ে তামিম ইকবাল খেলতে পারবেন বলেই ধারনা করা হচ্ছে। স্পেশালিস্ট স্পিনার মিরাজকে না নামিয়ে অলরাউন্ডার নাসিরের অফস্পিনের শরণাপন্ন হবে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে গত সিরিজ জয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা, সেখানে দারুণ ব্যাটিং করেছেন সৌম্য সরকার। এবারও তেমন কিছু করতেই পারেন চাপে থাকা সৌম্য।

সব মিলিয়ে টেস্টের মতো অমন ছন্নছাড়া বাংলাদেশ নয়; ওয়ানডে খেলতে নামবে চনমনে মেজাজের ঐক্যবদ্ধ টিম বাংলাদেশ। তাহলে…

৭.

জানেন নিশ্চয়ই, দক্ষিণ আফ্রিকা দলটির সঙ্গে ‘চোকার’ খেতাবটি সুপার গ্লুর মতো লেগেই আছে! একটু চাপে পড়লেই দলটি ভেঙ্গেচুরে একাকার হয়ে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশ খালি চাপটা তৈরি করতে পারলে হলো! চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে প্রোটিয়ারা গ্রুপ পর্বের গন্ডিই টপকাতে পারেনি, তার আগে ইংল্যান্ডে গিয়ে ২-১ হেরে এসেছে ওয়ানডে সিরিজ। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের দিনকাল কিন্তু ভালোই যাচ্ছে।

তো?

এখনই হতাশার অতল তলে হারিয়ে যাওয়ার মানে হয় না। ভরসা রাখুন, ধৈর্য্য ধরুন, বিশ্বাসটা মনে লালন করুন। বাকীটা ছেড়ে দিন ক্রিকেটারদের ওপর। আর চোখ রাখুন মাঠে। লক্ষ্য বলুন আর স্বপ্ন, একটি জয় পেলেই কিন্তু বদলে যাবে বাংলাদেশ!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।