একটি ইন্টারভিউ বোর্ড ও আইকিউ রঙ্গ

প্রতিটা চাকুরির ইন্টারভিউ বোর্ডে এমন কিছু মানুষ থাকে যারা ছেলেমেয়েদের উদ্ভট উদ্ভট প্রশ্ন করে ঘাবড়ে দিতে পছন্দ করে। সদ্য পাশ করে বের হওয়া চাকরীপ্রার্থীরা স্বভাবতই একটু আতঙ্কিত থাকে। চাকুরি পাওয়া কিংবা না পাওয়াটা মূল ব্যাপার নয়, প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দিতে পারলে অজ্ঞতার যে অপমানটা হয় তা অনেক ছেলেমেয়ে সহ্য করতে পারেনা। আর কিছু কিছু মানুষ অপমান করার এই বিকৃত আনন্দটুকু পেতে চায়।

একটা ডিপার্টমেন্টের প্রধান থাকার কারণে মাঝে মাঝে কিছু কিছু ইন্টারভিউ বোর্ডে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়। ব্যাক্তিগতভাবে আমি সবসময় চেষ্টা করি খুবই সহজ কিছু প্রশ্ন করতে যাতে ছেলেমেয়েরা একটু সহজ হতে পারে। এই রকম একটা ইন্টারভিউয়ের কিছু কথা বলছি। চার পাচটা সহজ প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারার পর আমার কাছে মনে হলো ছেলেটা হয়তো একটু ঘাবড়ে গিয়েছে। তাই ওকে সহজ করার জন্য স্বাভাবিক কিছু কথা দিয়ে শুরু করলাম।

প্রশ্ন: কোন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন?

উত্তর: এইচএসসি কমপ্লিট করার পর *** সাবজেক্টে অনার্স করেছি।

প্রশ্নঃ ও বলেন দেখি, এসএসএসি এর পুরো মানে কি?

উত্তর: (একটু ভেবে) জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট।

প্রশ্ন: দূর বোকা। জুনিয়র হয় কিভাবে? জুনিয়র তো শুরু হয় J দিয়ে। এখানে কি J আছে? ভালো করে খেয়াল করে দেখুন। এখানে তো S আছে। S দিয়ে কি জুনিয়র হয়?

উত্তর: (একটু চিন্তা করে, হটাৎ করে মনে পড়েছে এমন একটা ভঙ্গি করে) দুঃখিত স্যার, জুনিয়র না, সিনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট।

ইন্টারভিউ বোর্ডে হাসির ফোয়ারা উঠে গেল আর আমি হয়ে গেলাম অপ্রস্তুত। ভালো করতে চেয়ে আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি প্রশ্ন শেষ করতে চাইলাম। কিন্তু উপস্থিত কেউ কেউ মজা পেয়ে গিয়েছে। তাই প্রশ্ন পর্ব শেষ হলো না। আরেকজন প্রশ্ন করা শুরু করলো।

প্রশ্ন: বেশ বলেছেন। এখন বলেন তো দেখি এইচএসসির এর মানে কি?

উত্তরঃ (ছেলেটা ভেবেছে তার উত্তর ঠিক হয়েছে। তাই আরো উৎসাহী হয়ে) হায়ার স্কুল সার্টিফিকেট।

ইন্টারভিউ এর এই অবস্থা কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। প্রায়ই এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়। অথচ সবাই যে এমন তা নয়। কেউ কেউ তো এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাদের চমকে দেয় যা আমাদের নিজেরও অনেকের জানা ছিল না। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই কম।

সমস্যা হয় বেশী সংখ্যক মানুষদের নিয়েই। আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থায় ত্রুটি থাকার কারণে এরা খুব সহজেই একটা পর্যায় পর্যন্ত উঠে আসে যেখানে তাদের আসার কথা না। অথচ এই উঠে আসার কারণে এরা নিজেরাও কিন্তু কম ভুক্তোভোগী নয়। মামা চাচা থাকার কারণে কিছু সংখ্যক মানুষ হয়তো চাকুরি বাকুরি যোগাড় করে ফেলে। বাকিদের অনেকেই পড়ে যায় মাঝামাঝি অবস্থায়।

মাঝে মাঝেই এমন মানুষের মুখোমুখি হতে হয় যারা ৩/৪ বছর ধরে মাষ্টার্স পাশ করে বেকার বসে আছে। পড়াশোনা না করলে হয়তো একটা ছোট খাট কাজ জুটিয়ে নিতে পারে। কিন্তু একটু পড়াশোনা করে ফেললেই নিজেকে সবার সামনে একটু আলাদা করে উপস্থাপন করাটা জরুরী হয়ে পড়ে, ছোট খাট কাজ করতে তখন আত্মসম্মানে লাগে। পড়াশোনা না জানা লোক হয়তো রিকশা চালাতে পারে, অথচ ইন্টার পাশ করে রিকশা চালানো কি সম্ভব?

কিছু দিন আগে ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট বের হলো। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারো ব্যাপক স্বর্ন ফলন হয়েছে। সমস্যা হলো কোন জিনিসের দাম বাড়ে তার প্রাপ্যতার উপর। আমাদের দেশে যে পানির দাম নেই বললেই চলে, ইউরোপে সেই পানি আমাদের তুলনায় দুষ্প্রাপ্য বলে অনেক ধরেই কিনে খেতে হয় (অবশ্য আমাদের দেশেও ইদানিং কিছু মানুষ পানি কিনে খাচ্ছে)।

একসময় আমাদের বাবা মায়েরা ৫০০+ নাম্বার পেয়ে যে পর্যায়ে উঠতে পারতো আজ আমাদের ছেলেমেয়েরা ৮০০+ নাম্বার পেয়েও সেই অবস্থানে যেতে পারছে না। তবে কেন যেন মনে হচ্ছে এই বছর জি.পি.এ ফাইভ নিয়ে উম্মাদনা কম। খুব সম্ভবত গ্রেড এর সাথে নাম্বার দিয়ে দেয়াতে এই ঘটনাটা ঘটেছে। এখন হয়তো কিছুটা লাইনে আসবে।

৮৫ পেলেও এ+ আর ৯৫ পেলেও এ+, কিন্তু দুটোর মাঝে যে অনেক পার্থক্য সেটা নাম্বার দিয়ে বোঝা যাবে ( কে জানে, কিছুদিন পর হয়তো এক যোগে ৫০০০০ ছেলেমেয়ে বাংলায় ২০০ তে ১৯৯ নাম্বার পেয়ে যাবে)। তবে নাম্বারের সাথে আই.কিউ টা খুব দরকার।

প্রথাগত পড়াশোনা না জানা মানুষও আই.কিউ দ্বারা অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। পরবর্তী প্রজন্মের এই আই.কিউ বাড়ানোর জন্য আমরা কি তেমন কিছু করছি? আমাদের সিষ্টেমে সমস্যা না থাকলে একজন অনার্স পাশ করা ছেলে এইচএসসির পুরো মানে কেন বলতে পারবে না।

আমার বড় ছেলে নার্সারিতে পড়ে। তাকে একদিন পাঁচ টা প্রাণীর নাম বলতে বললাম। সে দেখি চোখ বন্ধ করে নাম মনে করার চেষ্টা করছে। আমি তাকে চোখ খুলে মুখস্ত করা প্রাণীর নাম বলতে না করে প্রাণী কি সেটা বোঝালাম। এর পর সে নিজে থেকেই পাঁচটা বলে ফেলতে পারলো।

বিড়াল, কুকুর, গরু, ছাগল আর ইদুর এই পাচটি প্রাণীর কয়েকটি তার বই-এর সাথে মেলেনা। তবে এটা সমস্যা নয়, বুঝে বলতে পারাটাই ব্যাপার। কি জানতে হবে সেটার চেয়ে কিভাবে জানতে হবে সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্টারভিউ নিয়ে শুরু করে আই.কিউতে থেমেছি। এখন ইন্টারভিউতে আই.কিউ-এর একটা গল্প দিয়ে লেখাটা শেষ করছি।

একটা ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রতিটা প্রার্থীকে শেষে বলা হয়েছে , ‘Write something on the board’.

কেউ কেউ নিজের নাম লিখলো, কেউ সেদিনের তারিখ লিখলো, কেউ প্রধান মন্ত্রীর নাম লিখলো আবার কেউবা অন্য কিছু। একজন শুধু লিখলো ‘something’! চাকরীটা তারই হলো।

আমাদের গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া ছেলেমেয়ের মাঝেও নিশ্চয়ই এমন আই.কিউ সম্পন্ন ছেলেমেয়ে আছে। তাদের খুজে বের করার দায়িত্বও কিন্তু আমাদেরই। তবে তাদের খুজে বের করার প্রসেসটা হয়তো আমরা নিজেরাই নষ্ট করে ফেলছি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।