একটি আত্মহত্যার ইতিবৃত্ত || ছোটগল্প

ঘটনার শুরু গত শুক্রবার সকালে। আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলাম অফিসের এক কলিগের সাথে। কথা প্রসঙ্গে সে একসময় জানালো এই মাসেও আমাদের বেতন দিতে দেরি হবে।

এটা শুনে এপাশ থেকে আমি বললাম, ‘ধুর, এইভাবে কি বেচে থাকা যায়, বলেন?’

সেও একমত হলো আমার সাথে। আরো কিছুক্ষণ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে বলতে একসময় বললো, ‘অফিসের বয়স্ক ক্যাশিয়ার রহমত ভাই নাকি তৃতীয় বিয়ে করতেছেন।’

হাইরে কপাল! কেউ একটার পর একটা বিয়ে করতেই থাকে আর আমাদের ভাগ্যে একটা বউও জোটে না। আমি মজা করেই বললাম, ‘এই জীবন আর রেখে কি লাভ!’

তারপর আরো দুই একটা কথা শেষে আল্লাহ হাফেজ বলে ফোন রেখে দিলাম। আমি তখনো ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাইনি যে আমাদের বাসার মুখরা কাজের বুয়া শরীফার মা ব্যালকনির পাশের ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে আমার বলা যাবতীয় কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। আমি তখনো টের পাইনি একটু পরেই আমার জীবনে কি মহা দূর্যোগ নেমে আসতে যাচ্ছে।

আমি ফোন রেখে দিয়ে বেডরুমে গেলাম। ভাবলাম আজ ছুটির দিন বাসায় বসে না থেকে একটু ঘরটা পরিস্কার করে ফেলি। পাশের রুমে উকি দিয়ে দেখি আম্মা ঘুমাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে আমি ঘর পরিস্কার করেছি দেখলে অনেক অবাক হবে। খুশিও হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। একটা পুরাতন গামছা নিয়ে বিছানার উপর উঠে সিলিঙ ফ্যান পরিস্কার করার জন্য হাত লাগালাম। ফ্যানে প্রচুর ধুলা জমেছে। গরম পড়া শুরু হয়ে গেছে, ফ্যানটা পরিস্কার করার এখনই সময়। আমি কাজ শুরু করলাম।

পেছনে বিকট চিৎকার শুনে আরেকটু হলেই আমি খাট থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যাওয়ার যোগার। চিৎকার দিচ্ছে আর কেউ না, আমাদের বুয়া শরীফার মা।

গায়ের সমস্ত শক্তি এক করে প্রচন্ড চিৎকার দিচ্ছে, ‘হায় আল্লাহ, ছুটোভাই তো নিজেরে খতম কইরা দিতে চাচ্ছে। ও আম্মা এদিকে আসেন। আপনি কই। এই কে কুথায় আছেন আমার ছুটোভাইরে বাচান। আপনারা কই? আপনাদের আল্লাহর দোহাই লাগে আপনারা সবাই আসেন।’

আমি ঠিকমতো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম আশেপাশের বাসার সমস্ত লোক আমার ঘরে। দৌড়ে আসার জন্য হাফাচ্ছেন অনেকেই। কয়েকজন বলশালী পুরুষের হাতে কাঠ এবং বাশের লাঠি। একজনের হাতে রড। আমি খাটের উপর দাঁড়ানো। আমার হাত ফ্যানের সাথে। আমার হাতে রশির সমান লম্বা একটা গামছা।

তারা যা বুঝার বুঝে ফেললো। একজন দৌড়ে এসে আমার হাত থেকে গামছা কেড়ে নিলো। সাথে আরো দুইজন খাটের উপর উঠে আমাকে চ্যাংদোলা করে মোটামুটি খাট থেকে ছুড়ে ফেললো। আমি কি করেছি এখনো সেটা বুঝতে পারছি না। ঘটনার আকস্মিকতায় আমার মাথা কাজ করছে না।

আমার আম্মা এমনিতে ছিঁচকাঁদুনে মহিলা। তিনি ইতিমধ্যে তার কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

‘আল্লারে, এ আমার কি হলো! আমার একটা মাত্র ছেলে আল্লাহ তারে তুমি নিয়ে যাইয়ো না। আমার কোল খালি করে দিও না গো আল্লাহ।’

আমি যে কিছু বলবো সেই সুযোগ পাচ্ছি না।

চশমা পরা এক লোক যাকে আমি এর আগে কখনো দেখিনাই বলে মনে হচ্ছে, সে আমার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললো, ‘তুমি জানো সুইসাইড করে কাপুরুষরা? তুমি কাপুরুষ? তুমি লুজার? একটা মেয়ে তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে বলে তুমি নিজেকে শেষ করে দিতে চাচ্ছ? একবারও তোমার মায়ের কথা ভাবলে না? দেখ একটু তোমার মায়ের দিকে তাকিয়ে, কেমন কান্না করতেছে। আর কোথাকার কোন মেয়ে তোমার কাছে বড় হয়ে গেল। ইউ নো তোমাদের এই জেনারেশনেরই প্রবলেম এটা। তোমরা একটা লুজার জেনারেশন। প্রেম ভালোবাসা ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝো না লাইফে।’

আশ্চর্য! এই লোক আবার প্রেম, ছ্যাকা, মেয়ে এইসব কই পাইলো? কি সর্বনাশ!

ব্যাপারটা আসলেই সর্বনাশ, কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই ছড়িয়ে গেলো আমি কোনো একজন মেয়ের জন্য সুইসাইড করতে যাচ্ছিলাম।

আমার আম্মা কান্নার গতি বাড়ালেন।

‘হাইরে এ আমি কি শুনলাম। হায় আল্লাহ এটা শোনার আগে তুমি আমারে উঠায় নিলে না কেন। বল তুই কোন সে রাক্ষসী। কে আমার কোল থেকে আজ আমার ছেলেরে ছিনিয়ে নিতে চাইতেছে। আমি এ মুখ কই দেখাবো। এ আমি কি শুনলাম।’

আমি দুইএকবার বলার চেষ্টা করলাম যে আপনারা যা ভাবছেন ব্যাপারটা আসলে তা নয়। কিন্তু কেউ আমার কথা পাত্তা দিলো না। সবাই মনোযোগ অন্য দিকে। তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আমাদের কাজের বুয়ার কথা শোনায় ব্যাস্ত।

শরীফার মা সিরিয়াস ভঙ্গিতে সবার সামনে বক্তব্য রাখতেছে।

‘আর কইয়েন না, একটু আগের কাহিনী। ভাবলে এহনো আমার শইল্লের লোম খাড়া হয়ে যাইতেছে। দেহেন আপনেরা, পরীক্ষা কইরা দেহেন। আমি তো ঘর ঝাড় দিতেছি, এমন সময় দেহি ছুটোভাই ফোন নিয়ে আস্তে করে বারান্দায় চলে গেলো। আমি তহনই বুঝছি কোনো মাইয়ার ফোন। আমি আছি ধান্দায়। কি কয় শুনি। একটু পরে শুনি ছুটোভাই হাউমাউ করে কানতেছে। কানতে কানতে একবার কইলো এইভাবে বাইচা থাকন যায় না, আরেকবার কইলো এই জীবন রাইখা কি লাভ! মাঝে একবার বিয়ের কথাও কইলো। বুঝলাম ভাইয়ের প্রেমিকার বিবাহ ঠিক হইছে।

পরে ফোন রাইখা চোখ মুছতে মুছতে বারান্দা থেইকা বের হইলো। সোজা এদিক ওদিক তাকায়ে নিজের ঘরে ঢুকলো চোরের মতো। বুঝলাম ঘটনা তো সন্দেহজনক। আম্মা আরেক ঘরে ঘুমাইতেছে। আমি ছাড়া এই বাড়িতে ছুটোভাইরে বাঁচানোর মতন কেউ নাই। দেহি ছুটোভাই রশি খুজতেছে। রশি না পাইয়া একখান পুরান গামছা বের করলো। সেইটা নিয়ে উঠছে খাটের উপরে। ফ্যানের সাথে ফাস বান্ধা শুরু করছে। আমি কি করবো আমার মাথা কাজ করেনা। গাও হাত পা থরথর কইরা কাপে। তারপর আল্লাহর নাম নিয়া দিলাম চিক্কুর। সবার আগে হইলো জানের দাম। আপনারা না আসলে আইজ ছোটভাইয়ের জান বাচানো যাইতো না।’

আমি দেখলাম কয়েকজন মুরব্বী শরীফার মায়ের উপস্থিত বুদ্ধির ব্যাপক প্রশংসা শুরু করলো। আজকাল যে এতো বুদ্ধিমান কাজের বুয়া আছে এটা নাকি তারা জানতো না।

শরীফার মা একগাল হেসে একই গল্প শুরু করলো আবার। দর্শনার্থী বাড়তেছে। নতুন যারা আসছে তারাও ঘটনা শুনতে চায়।

দ্বিতীয় বারের বলা গল্পে বের হলো আমি নাকি শরীফার মাকে বলছি, আমি না থাকলে তুমি আমার আম্মার খেয়াল রাইখো।

পঞ্চম বার বলার সময় গল্পে যোগ হলো আমি চিৎকার করে বলেছি, ‘হে আল্লাহ তুমি আমাকে উঠায় নাও। আমি ঐ মেয়েকে ছাড়া বাচবো না। হে পৃথিবী বিদায়!’

বাস্তবিকই আমার কিছু বলার ছিলো না। আমি শুধু শুনে গেলাম। রাত পর্যন্ত বাসায় লোক আসতে লাগলো। দূর দূরান্ত থেকে নাম জানা আত্মীয়রাও একবার করে আমাকে এবং এই জেনারেশনের প্রেম ভালোবাসাকে ভৎসনা করে গেলো। তারপর ফিরে যাওয়ার সময় আম্মাকে বার বার সাবধান করে গেলো যে আমাকে যেন চোখে চোখে রাখা হয়।

বাসা ফাকা হতে হতে গভীর রাত হয়ে গেলো।

আমাকে রাতে আম্মার রুমে ঘুমাইতে হলো এবং আম্মা সারা রাত না ঘুমিয়ে জেগে রইলেন।

আস্তে আস্তে আমার জীবন বিভীষিকায় পরিনত হলো। আমাকে অফিসে যাইতে দেয়া হলো না। রুমে কখনোই একা থাকতে দেয়া হলো না, এবং বাথরুমে গেলেও দরজা লক করার অনুমতি পেলাম না। আম্মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, ‘আমি অন্যদিকে তাকিয়ে আছি তুই ফ্রেশ হ। মায়ের কাছে ছেলের আবার লজ্জা কি।’

এতেই শেষ না, প্রতি দুই মিনিট যেতে না যেতেই আম্মা আওয়াজ দিলেন, ‘কি রে কথা বল। ঠিক আছিস? হচ্ছে ঠিকমতো?’

আমাকে কথা বলে জানিয়ে দিতে হলো আমি ঠিক আছি। হারপিক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছি না।

আমি আম্মাকে অনেক বুঝিয়ে সপ্তাহখানেক পর অল্প সময়ের জন্য বাইরে বের হওয়ার অনুমতি পেলাম। বের হয়ে দেখি আমাদের ড্রাইভার অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে আমাকে সাবধানে ফলো করছে। বুঝলাম আম্মার নির্দেশ। এলাকার প্রতিটা মুরব্বী আমাকে রাস্তার মাঝে দাড় করিয়ে একেকজন পনেরো মিনিট করে, ‘আমার কেন সুইসাইড করা উচিত না’ সে বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান দান করতে লাগলেন।

আমি তাদের থেকে বাঁচতেই একটা মুদিখানার দোকানে ঢুকলাম।

আমার বাসায় তেলাপোকার প্রচুর দৌরাত্ম্য, এবং বাথরুমের হারপিক শেষ হয়ে যাওয় সত্বেও আমার সাহস হলোনা দোকানে গিয়ে তেলাপোকা মারার বিষ বা হারপিকের কথা বলার। আমি জানতে চাইলাম, মশা মারার অ্যরোসল হবে?

দোকানদার সরু চোখে তাকিয়ে থেকে বললো, ‘বাবারে অ্যারোসল খাইলে তো তুমি মরবা না। অসুস্থ্য হয়ে পড়বা শুধু। তাছাড়া তুমি অ্যারোসল খেয়ে মরতে চাও ই বা কেন? এই বয়সে কি এমন কষ্ট তোমার? নিজেকে একটু সময় দাও, ঠিকই মেয়েটারে ভুলতে পারবা। তখন সুইসাইড করতে চাওয়ার জন্য তোমার নিজেরই আফসোস হবে।’

এই সমাজে সারভাইভ করা আমার পক্ষে সম্ভব না আর। আমি বাসায় ফিরে এসেছি। রাতের খাবার খাচ্ছি। শুনলাম পাশের রুমে ড্রাইভার ফিসফিস কইরা আম্মারে বলতেছে, ‘ছোটসাব দোকানে যাইয়া কয় বিষ দ্যান। যে বিষ খাইলে দশ মিনিটেই খেল খতম। দোকানদার দেয়নাই বিষ। ছোটোসাবরে অনেক বুঝাইয়া বাসায় ফিরত পাঠাইছে।’

আম্মা কিছু না বলে ফ্যাচফ্যাচ করে কান্না শুরু করলেন। আমি এপাশের ঘরে ভাত খেতে খেতে ফাইনাল ডিসিশন নিয়ে ফেললাম। আমি সুইসাইডই করবো। এইভাবে আর বেচে থাকা সম্ভব না। শুনলাম আম্মা ড্রাইভাররে বলতেছে, ‘ওর ঘর থেকে ফ্যান খুলে ফেলো। মরে যাওয়া থেকে গরমে একটু কষ্ট পাওয়াও ভালো।’

হ্যা আমাকে সুইসাইড করতেই হবে। বাঁচতে চাইলে মরতে হবে আমার। এইভাবে কারো পক্ষে বেচে থাকা সম্ভব না। কোনোভাবেই সম্ভব না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।