একটি আগুনের গোলা

গতির সাথে নিখুঁত ইয়র্কার, সুইং আর সহজাত উইকেট টেকিং অ্যাবিলিটির কারণে অনেকের কাছেই তিনি বর্তমান বিশ্বের সেরা ফাস্ট বোলার। বল নতুন হোক বা পুরনো; প্রয়োজনের মুহূর্তে দলকে ‘ব্রেকথ্রু’ এনে দেয়াটা তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। সঙ্গত কারণেই দলের মূল স্ট্রাইক বোলারও তিনি। বলছি সাম্প্রতিককালের বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভয়ংকরতম উইকেটশিকারী বোলারদের একজন, তরুণ বাঁহাতি পেস সেনসেশন, অস্ট্রেলিয়ার মিশেল স্টার্কের কথা।

ছয় ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা, সুদর্শন এই ফাস্ট বোলারের প্রধান সম্পদ গতি। নতুন বলে ‘কনভেনশনাল’, পুরনো বলে ‘রিভার্স’ – দুই ধরনের সুইংই করাতে পারেন তিনি। ক্ল্যাসিক হাই আর্ম অ্যাকশনের কারণে বাউন্সটাও ন্যাচারাল।

স্টার্কের আর্মারিতে থাকা ভয়ংকরতম অস্ত্রটি হল ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের ভেতরে ঢোকা দ্রুতগতির ‘লেট ইনডিপার’। স্টার্কের ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ উইকেটই এসেছে এই ‘ট্রেডমার্ক’ ডেলিভারিতেই।

২০১০ সালের ২০ অক্টোবর বিশাখাপত্মমে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। অভিষেকটা অবশ্য মনে রাখার মত কিছু ছিল না। ৫১ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকায় পরের ম্যাচেই বাদ পড়েছিলেন একাদশ থেকে!

তার মাসখানেক পরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের দলে আবারও ডাক পান তিনি। প্রথম দুই ম্যাচ বাইরে থাকলেও সুযোগ পান সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে, পিটার সিডলের বদলি হিসেবে। ব্রিসবেনের গ্যাবায় ক্যারিয়ারের মাত্র ‘দ্বিতীয়’ ওয়ানডেতেই করলেন এক আগুনঝরা স্পেল! মাত্র ২৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে তছনছ করে দিলেন লংকান মিডল অর্ডার। অবশ্য ৩৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন ক্লিন্ট ম্যাকাই।

২০১০ সালের সেই ওয়ানডে সিরিজের পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে আবারও দল থেকে বাদ পড়েন স্টার্ক। কারণটা হয়ত সমসাময়িক অন্যান্য পেসারদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা!

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই দলে জায়গা নিয়ে বেশ কজন উঠতি প্রতিভাবান ফাস্ট বোলারের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে স্টার্ককে। মোটামুটি ভাল পারফরমেন্সের পরও তাই দলে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে পারেননি। সঙ্গে ছিল চোট সমস্যাও। তবে এত কিছুর পরও হতাশা গ্রাস করতে পারেনি তাকে। ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বারবার।

২০১২ সালে তিনি চলে যান কাউন্টি খেলতে ইংল্যান্ডে। ইয়র্কশায়ারের হয়ে পুরো এক সিজন কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে রপ্ত করেন সিম ও সুইং বোলিংয়ের বিভিন্ন কলাকৌশল।

কাউন্টি দলের হয়ে দারুণ পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে প্রায় দেড় বছর পর আবারও জাতীয় দলে ডাক পান তিনি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই জাতীয় দলে নিজের জায়গাটা পাকা করে ফেলেন।

২০১২ সালের আগস্টে, পাকিস্তানের বিপক্ষে শারজার ‘ফ্ল্যাট’ উইকেটে ৪২ রানের বিনিময়ে তুলে নেন ৫ উইকেট। যা তার ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য টার্নিং পয়েন্ট। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টানা দুই ওয়ানডেতে শিকার করেন ৫ উইকেট।

২০১৫ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে জানুয়ারিতে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আয়োজন করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আরও একবার বল হাতে জ্বলে উঠলেন স্টার্ক। ৪৩ রানে ৬ উইকেটের এক বিধ্বংসী স্পেলে একাই গুঁড়িয়ে দিলেন ভারতের ‘তথাকথিত’ শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ। তখনো অজিদের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা হয় নি; তবে স্টার্ক যে সেখানে ‘অটোমেটিক চয়েজ’ হিসেবেই থাকছেন, সেটা একরকম নিশ্চিত ছিল।

প্রতিটি ক্রিকেটারেরই স্বপ্ন থাকে দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা। কিন্তু দেশের হয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতা কিংবা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নটা বোধ হয় একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যায়। ২০১৫ বিশ্বকাপে পাওয়া প্রথম সুযোগেই সেই স্বপ্নটাকে সত্যি করে দেখিয়েছিলেন স্টার্ক। মাত্র ১০.১৮ গড়ে ২২ উইকেট নিয়ে আরেক বাঁহাতি ট্রেন্ট বোল্টের সাথে যৌথভাবে হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী। ফ্ল্যাট উইকেটে বোলার নিধন আর রান উৎসবের মাঝেও স্টার্কের ইকোনমি রেটটা ছিল চোখে পড়ার মতন! মাত্র ৩.৫! যা এককথায় অবিশ্বাস্য!

ওয়ানডেতে বল হাতে স্টার্কের ক্যারিয়ার সেরা স্পেলটাও এসেছিল (৬/২৮) এই বিশ্বকাপেই, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ‘রুদ্ধশ্বাস’ এক লো স্কোরিং থ্রিলারে। ফাইনালে কিউই ওপেনার ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে যে দুর্দান্ত ইনসুইঙ্গিং ইয়র্কারটাতে বোল্ড করেছিলেন, মূলত সেটাই গড়ে দিয়েছিল ম্যাচের ভাগ্য।

২০১৫ ওয়ার্ল্ড কাপের ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের’ পুরস্কার জেতার পাশাপাশি প্রথমবারের মত আইসিসি র‍্যাংকিংয়ে বোলারদের শীর্ষস্থানটাও এককভাবে নিজের করে নিয়েছিলেন স্টার্ক।

ওয়ানডের পর এবার আসি টেস্ট প্রসঙ্গে। স্টার্কের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ২০১১ সালের ডিসেম্বরে, ব্রিসবেনের গ্যাবায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ওয়ানডের মত টেস্টের অভিষেক ম্যাচেও তেমন সুবিধা করতে পারেন নি তিনি। ১২৩ রান দিয়ে পেয়েছিলেন মাত্র ২ উইকেট!

২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পার্থ টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেটসহ দুই ইনিংস মিলিয়ে স্টার্কের শিকার ছিল ৮ উইকেট। পাশাপাশি ব্যাট হাতেও খেলেন ৪৩ বলে ৬৮ রানের দারুণ একটি ইনিংস। দুর্দান্ত এক লেট ইনসুইঙ্গারে জ্যাক ক্যালিসের অফ স্টাম্প উপড়ে ফেলার দৃশ্যটা হয়ত অনেকের মনেই গেঁথে রয়েছে আজও!

২০১৩ সালে হোবার্টে শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছিল স্টার্কের ৬৩ রানে ৫ উইকেটের দুর্দান্ত এক স্পেল। নামের পাশে ওয়ানডে বোলারের তকমা লেগে যাওয়া স্টার্কের স্বল্পস্থায়ী টেস্ট ক্যারিয়ারের জন্য এই পারফরম্যান্সটা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৫-১৬ সালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ট্রান্স তাসমান ট্রফির এক ম্যাচে গতির নেশায় মত্ত হয়ে ওঠেন স্টার্ক। ওয়াকার গতিময়, বাউন্সি উইকেটে ইনিংসের ২১তম ওভারে স্টার্কের করা একটি বলের গতি ছিল ঘন্টায় ১৬০.৪ কিলোমিটার বা ৯৯.৭ মাইল! যা এ পর্যন্ত স্পিডগানে রেকর্ডকৃত টেস্ট ইতিহাসের দ্রুততম ডেলিভারি!

ওয়াকার পিচে গতি থাকলেও তা ছিল একদম ফ্লাট ও ঘাসবিহীন। ফলে সেখানে রীতিমতো রানের ফোয়ারা ছুটিয়ে দিয়েছিল কিউই ব্যাটসম্যানরা। একমাত্র স্টার্কের গতিই যা একটু সমস্যায় ফেলেছিল তাদের! একবার তো স্টার্কের করা ১৫৪.৮ কিমি গতির একটা ইয়র্কার সামলাতে গিয়ে ব্যাটটাই ভেঙে গিয়েছিল কিউই অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালামের!

২০১৬ সালের শ্রীলংকা সফরটা ছিল সাম্প্রতিকতম সময়ে অস্ট্রেলিয়ার জন্য সবচেয়ে কঠিন এ্যাওয়ে সিরিজ। প্রায় ৭ মাসের দীর্ঘ বিরতির পর ওই সিরিজ দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কামব্যাক করেছিলেন স্টার্ক। গোড়ালির চোট কাটিয়ে ফিরে এসেই স্টার্ক বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তার মত ফাস্ট বোলারের জন্য পিচ, কন্ডিশন এসব বড় কোন ব্যাপার নয়। টেস্ট সিরিজে অজিরা ৩-০ ব্যবধানে ‘হোয়াইটওয়াশ’ হলেও বিরুদ্ধ কন্ডিশনে বল হাতে স্টার্কের ধারাবাহিক সাফল্য সিরিজ হারের লজ্জাটা কিছুটা হলেও ভুলিয়ে দিতে পেরেছিল।

শ্রীলঙ্কায় তিন টেস্টের সিরিজে স্টার্ক নিয়েছিলেন ২৪ উইকেট যা তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের কোন অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলারের সেরা সাফল্য! শুধু তাই নয়, স্টার্কের বোলিং গড় ছিল মাত্র ১৫.১৬ যা এশিয়ার মাটিতে যেকোন পেসারের সেরা এভারেজ।

টেস্ট সিরিজ শেষে ওয়ানডেতে সেই শ্রীলঙ্কাতেই ধরা দিল স্টার্কের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অনন্য এক অর্জন। ৯৮ উইকেট নিয়ে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাঠে নেমেছিলেন স্টার্ক। ১০০ উইকেটের মাইলফলক অর্জনের লক্ষ্যে এক ধাপ এগিয়ে যান দিনের প্রথম ওভারেই। উপড়ে ফেলেন ওপেনার কুশল পেরেরার অফ স্টাম্প। দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে এসেই ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে স্লোয়ারে বিভ্রান্ত করে, ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন জর্জ বেইলির হাতে। ওয়ানডের দ্রুততম ১০০ উইকেটের কীর্তিটি চলে যায় স্টার্কের দখলে!

মাত্র ৫২ ম্যাচে উইকেটের ‘সেঞ্চুরি’ পূরণ করে স্টার্ক ভেঙে দিয়েছিলেন প্রায় ১৯ বছর পুরোনো একটি রেকর্ড। ওয়ানডের ‘দ্রুততম’ ১০০ উইকেটের আগের রেকর্ডটি ছিল ৫৩ ম্যাচে; পাকিস্তানি অফ স্পিনার সাকলায়েন মুশতাক রেকর্ডটি গড়েছিলেন ১৯৯৭ সালে।

ক্যারিয়ারের প্রথম ১৭ ওয়ানডেতেই তিনবার ৫ উইকেট আর তিনবার ৪ উইকেট! ৫০ উইকেট নিতে তবু লেগে যায় ২৯ ম্যাচ। বিশ্বরেকর্ড থেকে অনেক পেছনে। ১৯ ম্যাচে ৫০ উইকেট ছুঁয়ে রেকর্ডটি শ্রীলঙ্কার অজান্তা মেন্ডিসের। তবে পঞ্চাশের পর স্টার্ক এগিয়েছেন রকেটের গতিতে। দুই দফায় নিয়েছেন ৬ উইকেট। তারই ধারাবাহিকতায় ধরা দিয়েছিল অনন্য এই রেকর্ড।

এখন পর্যন্ত ৭২ ওয়ানডেতে মাত্র ২০ গড়ে স্টার্কের অর্জন ১৪২ উইকেট। ইকোনমি পাঁচের নিচে আর স্ট্রাইক রেটটাও দারুণ। মাত্র ২৪! ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন পাঁচবার আর ৪ উইকেট নয়বার।

টেস্টে এখন পর্যন্ত ৪০ ম্যাচে ২৭ গড়ে স্টার্ক উইকেট নিয়েছেন ১৭০টি। একবার ম্যাচে ১০ উইকেটসহ ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ৮ বার। সাম্প্রতিক সময়ে তার টেস্ট পারফরম্যান্সও ওয়ানডের মতই ইম্প্রেসিভ। বিগত দুই বছরে ১৪ টেস্টে ২৪ গড়ে তিনি উইকেট নিয়েছেন ৭৬টি।

কেবল বল হাতেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঝেমধ্যেই ব্যাট হাতেও নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন স্টার্ক। টেস্টে ৬০ ইনিংসে ব্যাট করে নয় টি ফিফটিও করে ফেলেছেন এই বাঁহাতি আক্রমণাত্মক ‘ব্যাটসম্যান’।

২০১৩ সালে মোহালি টেস্টে ভারতের বিপক্ষে মাত্র ১ রানের জন্য সেঞ্চুরিবঞ্চিত হয়েছিলেন স্টার্ক। কাটা পড়েছিলেন ‘নার্ভাস নাইন্টি নাইনে’! একই বছর ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টে ৭১ বলে ৬৬* আর আগের বছর পার্থের ওয়াকায় প্রোটিয়াদের বিপক্ষে খেলেছিলেন ৪৩ বলে ৬৮ রানের দারুণ দুটি ইনিংস। ২০১৬ সালে মেলবোর্নে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৭ ছক্কায় খেলেন ৯১ বলে ৮৪ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংস! উল্লেখ্য, এমসিজিতে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডও এটাই।

বেশ কিছুদিন ধরেই অস্ট্রেলিয়ার পেস অাক্রমণের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন এই বাঁহাতি স্পিডস্টার। জশ হ্যাজেলউড, প্যাট কামিন্স আর জেমস প্যাটিনসনকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘পেস কোয়ার্টেট’! তবে ‘ইনজুরিপ্রবণ’ স্টার্কের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেকে ফিট রাখা। চোটের খাড়ায় ইতোমধ্যেই বেশ কবার ছন্দপতনের শিকার হয়েছে তার ক্যারিয়ার।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।