একজন বৈমানিকের নায়ক হওয়ার গল্প

২০০১ সালের কথা। মেরিল প্রথম আলো পুরস্কারের মঞ্চ। কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা সেরা অভিনেতার পুরস্কার দিতে এসে বললেন ‘এখন যে পুরস্কার পাচ্ছে,তাকে আমি হাত ধরে চলচ্চিত্রে এনেছি, আমার খুব ভালো লাগছে তাকে পুরস্কার দিতে পেরে। তোমাকে অভিনন্দন, চলচ্চিত্রের এই দু:সময়ে তুমি এগিয়ে যাও।’

কিংবদন্তির মুখে এই অভিব্যক্তি শুনে আনন্দ চিত্তে গর্বিত হয়ে ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’এর জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার গ্রহণ করলেন সেই নায়ক । পড়েনা চোখের পলক, প্রেমী ও প্রেমী কিংবা ভালোবাসবো ভালোবাসবোরে গানে প্রেমিক পুরুষ হয়ে যেমন মুগ্ধ করেছেন, তেমন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান হয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছেন।

হুমায়ূন আহমেদের মাথায় সাদা ক্যাপ পড়া ‘রহস্য মানব’ হয়েছেন, শুদ্ধতম মানুষ ‘শুভ্র’ও হয়েছেন। হাজার বছর ধরে সিনেমায় ‘মন্তু’ হয়ে তিনি নিজেকে করেছেন পরিক্ষীত। ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রে অর্জন করে নিয়েছেন বিশেষ স্থান,তিনি অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক ‘রিয়াজ’।

আকাশে ওড়ার স্বপ্ন নিয়ে হয়েছিলেন পাইলট, সেখান থেকে এসে উড়লেন রুপালি জগতের আকাশে। ‘প্রিয়জন’ হবার বাসনায় শুরুটা করেছিলেন ‘বাংলার নায়ক’ ছবি দিয়ে, তবে ‘অজান্তে’ই দর্শকদের ‘হৃদয়ের আয়না’য় হয়ে উঠেন ‘প্রানের চেয়ে প্রিয়’। বাংলা চলচ্চিত্র পায় একজন প্রতিশ্রুতিশীল নায়ক।

রিয়াজ হলেন ববিতা, সুচন্দা, চম্পাদের চাচাতো ভাই। ১৯৯৪ সালে একবার ববিতার সাথে এসেছিলেন এফডিসিতে। তখন প্রয়াত নায়ক জসিমের নজরে পড়ে যান। ব্যস, ১৯৯৫ সালে বাংলার নায়ক সিনেমায় হয়ে তার অভিষেক।

এরপর পৃথিবী তোমার আমার, বিয়ের ফুল, ভালোবাসি তোমাকে, বুক ভরা ভালোবাসার মত সাড়া জাগানো সিনেমা। নব্বইর দশকেই আস্থাভাজন নায়ক হিসেবে নিজেকে করলেন প্রতিষ্টিত। এর পরের দশক শুধু নিজেকে এগিয়ে চলা, বাণিজ্যিক ছবিতে তিনি হয়ে উঠেন শীর্ষ নায়ক।

এ বাধন যাবে না ছিঁড়ে, শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ, প্রেমের তাজমহল, ভালোবাসা কারে কয়- এর পর মনের মাঝে তুমি’র মত তুমুল সাড়া জাগানো সিনেমা দিয়ে যখন বাণিজ্যিক ক্যারিয়ারের জয়রথ এগিয়ে চলছে,ঠিক তখন পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদের দুই দুয়ারী, শ্যামল ছায়া, চাষী নজরুল ইসলামের ‘মেঘের পরে মেঘ’র মত প্রশংসিত ছবিতে অভিনয় করে নিজেকে করেছেন নন্দিত। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই অশ্লীলতার কালো ছায়ায় হয়ে ওঠেন আলোর দিশারী।

বাংলা চলচ্চিত্রে সর্বমহলে জায়গা করে নিয়ে পার করছেন সুবর্ণ সময়। সেই সময় একই বছরেই ‘মোল্লা বাড়ির বউ’- এর  মত বাণিজ্যিক সফল সিনেমা থেকে হাজার বছর ধরে,শাস্তির মত প্রশংসিত ছবিতে অভিনয় করে নিজেকে নিয়ে যান অনন্য স্থানে।

এরপর নিজ প্রযোজনায় ‘হৃদয়ের কথা’ ছবিটি সেই জয়যাত্রায় যুক্ত হয় আরেকটি সফল পালক। রং নাম্বার, না বোল না, খেলাঘর, বিদ্রোহী পদ্মা ,দারুচিনি দ্বীপ, চন্দ্রগ্রহণ, মেঘের কোলে রোদ, কি যাদু করিলা, আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসার মত আলোচিত, প্রশংসিত ছবি নিজের ক্যারিয়ারে যুক্ত করলেন।

বর্ণিল ক্যারিয়ারে হঠাৎই নেমে অমাবস্যার ছায়া। ছবি করেছেন ঠিকই,কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না কোনভাবেই। ছবি নির্বাচনে অমনোযোগ, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, অসুস্থ রাজনীতির শিকার সব মিলিয়ে হারালেন তাঁর ক্যারিয়ারের জয়রথ। চলচ্চিত্রে হয়ে গেলেন অনিয়মিত, ব্যবসায় মনোযোগ দিলেন, মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসলেন। অবশেষে হুমায়ূন আহমেদের ‘কৃষ্ণপক্ষ’ ছবি দিয়ে এলেন আবার প্রিয় জগতে, কিন্তু প্রত্যাশামাফিক আলো ছড়ালো না। এখন শিল্পী সমিতির সহ সভাপতি, দায়িত্ব বেশ। আবার তিনি তাঁর প্রিয় রুপালী জগতে সফল প্রত্যাবর্তন হবে এটাই প্রত্যাশা।

সুপারস্টার শাবনূর নিজেকে শীর্ষে নিয়ে গেছেন রিয়াজের সাথে জুঁটি বেঁধেই, অপ্সরী পূর্ণিমা ক্যারিয়ারে ষোলকলা পূর্ণ করেছেন রিয়াজের সাথে ছবি করেই। টিভি তারকা শ্রাবন্তী চলচ্চিত্রে এসেছিলেন রিয়াজের নায়িকা হবেন বলে। বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি সাহিত্যধর্মী ছবিতে কাজ করেছেন রিয়াজই,রয়েছে মুগ্ধ করা ভালোবাসার কিছু সিনেমা। অত্যন্ত সুদক্ষ অভিনেতা তিনি হয়তো নন কিংবা সুঠাম নায়কোচিত ও নন। কিন্তু ছিল ভালো কিছু করার প্রয়াস, সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে, নিজেকে ভেঙেছেন বারবার।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টিভি নাটকেও বেশ সফল। হুমায়ূন আহমেদের ‘হাবলঙ্গের বাজারে’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন, এরপর মতিউর রহমানের জীবনী নিয়ে নির্মিত নাটক ‘অগ্নিবলাকা’য় অভিনয় করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের আস্থাভাজন অভিনেতা হওয়ায় অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন, এখনো নাট্যঙ্গনে তিনি নিয়মিত। সম্প্রতি তার করা ‘কলুর বলদ’ নাটকটি বেশি দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।

উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে জোছনার ফুল, উড়ে যায় বকপক্ষী, যমুনার জল দেখতে কালো, চৈত্র দিনের গান, ওগো বধূ সুন্দরী, কুড়িয়ে পাওয়া সুখ, বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, এই বর্ষায় অন্যতম। বিজ্ঞাপনে নিজেকে সরব রেখেছিলেন, ইউরো কোলা, ইউরো লেমন, ঝিলিক পেইন্টস, রবি, ড্যানিশসহ বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছিলেন।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছেন সাতবার। এছাড়া বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন মডেল ও নৃত্যশিল্পী তিনাকে, রয়েছে একটি সন্তান। নানান সামাজিক সচেতনতা মূলক কাজেও যুক্ত হয়েছেন। ব্যক্তিজীবন ও চলচ্চিত্র জীবনে নিজেকে আরো বর্ণিলতর করুন, এটাই প্রত্যাশা।

রিয়াজের জন্ম ১৯৭২ সালের ২৬ অক্টোবর। আশা রইলো, দু:সময় কাটিয়ে তিনি ফিরবেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।