একজন বাবা কিংবা কুহক পাখি || ছোটগল্প

– বাবা পাখিটার নাম কি?

-‎ কুহক পাখি

-‎ কুহক পাখিটা এই গাছের ডালে সবসময় বসে থাকে কেনো?

-‎ আমাদের দেখে

-‎ তোমাকে আর আমাকে?

-‎ হ্যা মা, তোমাকে আর আমাকে।

-‎ কেনো দেখে, ও আমাদের?

-‎ আমাদের বাবা মেয়েকে ওর খুব পছন্দ। প্রতিদিন ও আমার আর তোমার খুনশুটি দেখে, আমার সুন্দর মুনিয়া মাকে দেখে।ওর মেয়েটা হারিয়ে গেছে তো, সেজন্য আমাদেরকে দেখে।

-‎ কোথায় গেছে ওর মেয়ে বাবা?

-‎ বড় হয়ে গেছে তো মা,পাখিরা যখন বড় হয় তখন তারা, মা বাবার কাছে থাকে না, উড়ে চলে যায়।

মুনিয়া অবাক চোখে তাঁকিয়ে থাকে কুহক পাখিটার দিকে,আর আনিসুল করিম তাঁকিয়ে থাকেন তাঁর মেয়ের দিকে। কি সুন্দর হয়েছে মেয়েটা একেববারে মায়ের মত! একই রকম চোখ, নাকের ডঙাটা একই রকম তীক্ষ্ণ।মুনিয়ার মায়ের কি হয়েছিলো সেটা আনিস সাহেব কাউকে বলতে চান না ,তাই লেখকও এই ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। তিনি মাথা ঘামাবেন বাবা-মেয়েকে নিয়ে।

আনিস সাহেবের দিন কাটে মেয়েকে নিয়ে, সারাদিন খুনশুটি, রান্না বান্না খেলা, মাঝেমধ্যে ঘোড়া খেলা,কিংবা সারা ঘরের দেয়ালে আঁকাবুকি খেলার মধ্যে দিন কাটে আনিস সাহেব এবং মুনিয়ার। আনিস সাহেবের বাসার দেয়ালে বড় করে একটি সুখী পরিবারের ছবি আঁকা আছে, যেই সুখী পরিবারে আছে শুধু বাবা-মেয়ে।

মেয়েটার সামান্য কষ্টে আনিস সাহেব অস্থির হয়ে যান। কবে যেনো হাতটা কেটে গিয়েছিলো মুনিয়ার। তিনদিন বুক থেকেই নামান নি মুনিয়াকে। আনিস সাহেবের ভেতরটা ছাড়খার হয়ে যায়। ‘ইশ রে, মেয়েটার বুঝি অনেক কষ্ট পাচ্ছে! বাচ্চা মেয়ে কিছুই বলতে পারে না।’

বয়স বাড়ে, মুনিয়ার বয়স দাঁড়ায় ১৪। আনিস সাহেব মুনিয়ার মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। এতোটা পরিবর্তন, যা মুনিয়াকে নিয়ে গেছে আনিস সাহেব তো লক্ষ যোজন দূরে। মুনিয়ার শারিরীক এবং মানসিক যন্ত্রণার ভাগটা আনিস সাহেব নিতে পারেন না। যেমনটা পারতেন না, ছ’বছর বয়সে যখন মুনিয়ার হাত কেটে যেতো।

আমাদের সমাজ, বাবাদের তাঁর মেয়ের ‘হাত  কেটে যাওয়া কষ্টের’ অংশীদার হওয়ার অনুমোদন দেয়। কিন্তু বয়স্বঃন্ধিকালে একটা ছোট্ট মেয়ের ওপর বয়ে যাওয়া পাহাড়সম কষ্টের অংশীদার হওয়ার অনুমোদন বাবাদের দেয় না।

যখন মুনিয়া এই পাহাড়সমান কষ্ট সহ্য করে, তখন আনিস সাহেব মাথা নিচু করে পত্রিকা পড়েন। তাঁর কিছুই করার নেই, তিনি বড্ড অসহায়। মাঝে মাঝে তিনি মুনিয়ার পাশে গিয়ে বসেন। মুনিয়া বড় বড় অসহায় চোখ করে বাবার দিকে তাঁকিয়ে থাকে, তার চোখের কিনারায় অশ্রু জমা হয়। হয়তো তার অনেক কিছু জানার আছে বাবাকে। অনেক কিছু বলার আছে।

প্রথম বারের মত মুনিয়া মায়ের অভাব বোধ করে, তাদের দেয়ালে আঁকা সুখী পরিবারে একজন ‘মা’ থাকলে মন্দ হতো না। হয়তো এই নিদারুণ কষ্টটা মা চোখের নিমেশে কমিয়ে দিতে পারতেন।

বয়স বাড়ে। বাড়ে আনিস সাহেব আর মুনিয়ার মধ্যকার দূরত্ব। একই ঘরে থেকেও যেনো এক পৃথিবী এপার ওপারে বসবাস।

মুনিয়ার পরিবর্তনের একটা বড় অংশ,আরিফ নামের একটা ছেলেকে ঘিরে। যেটা আনিস সাহেব বুঝতে পারেন। আনিস সাহেব আকার ইঙ্গিতে মুনিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করে। দূরে থাকতে বলেন, তিনি তো বেঁচেই আছেন মুনিয়াকে সম্বল করে।

মুনিয়া কি তা বুঝবে? সে তো এতো বছরে একজন আপন মানুষ পেয়েছে। যা সে বাবাকে বলতে পারে না,তা সে আরিফ নামের ছেলেটাকে অনায়াসে বলছে। সে কেনো আনিস সাহেবের কথা শুনবে?

আনিস সাহেব ভেবে কুল পান না কি করবেন। মেয়েটা বড্ড অবুঝ, তাছাড়া ছেলেটা ভালো না, রাস্তার বখাটে।

একদিন অফিস থেকে  এসে তিনি মুনিয়ার হাত ধরে,মাথা নিচু করে বসে থাকেন। তাঁর অনেক কিছু বলার থাকে। বলার থাকে, তিনি কতটা ভালোবাসেন নিজের মেয়েকে, কতটা একা তিনি মুনিয়াকে ছাড়া।

বাঙালি ‘ভালোবাসি’ শব্দটা ব্যবহার করতে কার্পণ্য করে খুবই। তাঁরা শব্দটা ব্যবহার করে হুট করে মায়া জন্মানো একটা মানুষের জন্য। কিন্তু বছরের পর বছর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মায়ায় জড়িয়ে রাখা মানুষটাকে এরা ভালোবাসি বলতে পারে না। একটি মেয়ে কখনই তাঁর বাবাকে ভালোবাসি বলে না। একজন বাবা কখনই তাঁর মেয়েকে বলে উঠতে পারে না কতটা ভালোবাসে। অথচ আমাদের সকল সমস্যা হয়তো এক নিমেষে থমকে যেতো ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শুনে।

মুনিয়া পালিয়ে যায়, হুট করে মায়ায় পড়া একটা মানুষের সাথে।

আনিস সাহেব এখন একা বসে থাকেন নিজ বাসার বারান্দায়, সেখান থেকে ছাতিম গাছের ডালে বসা কুহক পাখিটাকে এখনো দেখা যায়। পাখিটার একটা ছানা হয়েছে, সে তার ছানা গুলোকে ঠোটে করে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ করে আনিস সাহেবের মনে হলো পাখিগুলো তাঁকে দেখছেন। আনিস সাহেব যদি পাখির ভাষা বুঝতেন তাহলে হয়তো তিনি বুঝতে পারতেন পাখি গুলো তাঁকে নিয়েই কথা বলছে – মা, এই লোকটা আমাদের দেখে কেনো?

-‎ ওর মেয়ে হারিয়ে গেছে তো তাই আমাদের দেখে

-‎ কোথায় গেছে ওর মেয়ে মা?

-‎ বড় হয়ে গেছে তো মা, ছেলে মেয়ে যখন বড় হয় তখন তারা, মা বাবার কাছে থাকে না, উড়ে চলে যায়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।