একজন পতিতা এবং একটি পূর্ণিমা রাত || গল্প

এ পর্যন্ত ৫৭ জন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে অনিলের! যার মধ্যে ২ জন তার প্রেমিকা এবং ৫৫ জন পতিতা!

মদ, সিগারেট এর পাশাপাশি অনিল নারীর নেশাতেও আসক্ত!

হাতে কিছু টাকা পয়সা আসলেই সে পতিতার অনুসন্ধান করে!

ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হল, জিয়া উদ্যান অথবা সংসদ ভবনের সামনে সন্ধ্যার পর পতিতাদের ভিড় দেখা যায়!

কালো বোরখা, মাথায় হিজাব, সমস্ত মুখমন্ডল ঢাকা থাকে শুধু চোখ দুটো দেখা যায়, কপালে কালো রংয়ের টিপ , হাতে একটা সাদা রংয়ের রুমাল নিয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকা পতিতাদের সাথে অনিলকে প্রায়ই কথা বলতে দেখা যায়!

অনিলের অভিজ্ঞতা এতটাই যে, সে শরীর দেখে বলে দিতে পারে বোরখার ভেতরের নারী কত’টা সুন্দর হবে!

সেদিন পূর্নিমা রাত!

স্বর্ণা নামের যে মেয়েটার সাথে অনীল রাত কাটাবে তার চোখের দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকলে মায়া লেগে যায়!

অনীলের বয়স যখন ২১ তখন তার যে প্রেমিকা ছিল, তার চেহারার সাথে স্বর্ণার অনেকটাই মিল আছে!

ওই বয়সটাতে অতসব শরীর-টরির মাথায় আসেনি কখনো, প্রেম মানে প্রেম! দূর থেকে মানুষটার হেটে যাওয়া দেখলেও বুকের ভেতর মোচর দেয়!

শরীরের বিনিময় তো দূরের কথা, একবার মানুষটার হাত ধরলেই আরেক জীবন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়!

স্বর্ণাকে আজ আর পতিতা মনে হচ্ছে না! আজ স্বর্ণাকে প্রেমিকা প্রেমিকা লাগছে!

বারান্দা থেকে মস্ত বড় একটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে! চাঁদের কিছুটা আলো জানালা গলে রুমের ভেতর প্রবেশ করছে!

স্বর্ণা তার কাপর অনাবৃত করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে! অনিলের কোন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না!

স্বর্ণা অনিলের দিকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলো,

– স্যার, আর কতক্ষন বসে থাকবেন! কিছু করবেন না?

অনীল চুপ করে বসে আছে! অনিলের কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না!

স্বর্ণার কন্ঠস্বরটা এত পরিচিত লাগছে কেন?

কে এই মেয়েটা?

আমি কি তাকে আগে থেকেই চিনি?

তবে, স্বর্ণা কি আমার পূর্ব পরিচিত?

এরকম হাজারটা প্রশ্ন অনিলের মাথায় আসতে শুরু করলো!

স্বর্ণাকে ঘরের ভেতর রেখে অনিল বারান্দায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে!

এই ৪৭ বছর বয়সে এসে অনিল আরেকবার নতুন করে ভালোবাসার অভাববোধ করছে!

এই প্রথমবার আকাশের চাঁদটাকে রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে!

গুনগুন করে গান গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে! কারো সাথে একটু অপ্রাপ্তির গল্প করতে ইচ্ছে হচ্ছে! কারো হাতের আঙুল ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে!

শরীর তো অনেক হলো, মনের ও তো একটা চাহিদা আছে!

একটা পরিচিত শরীর ভোগ করাতে যে ক্ষনস্থায়ী আনন্দ পাওয়া যায়, এটা বোধয় আরো বহুগুণ বেড়ে যেত, শুধু একটু ভালোবাসার মিশ্রণ থাকলে!

স্বর্ণা রুম থেকে বের হয়ে বারান্দাতে অনিলের পাশের চেয়ারটাতে বসেছে!

অনিল অবাক হয়ে স্বর্ণার দিকে তাকালো, এত সুন্দর চোখ, নাক, মুখ অনিল এর আগে কখনো দেখেনি!

হয়তো এর আগে কখনো কোন পতিতার দিকে প্রেম নিয়ে তাকায়নি!

অনিল স্বর্ণার হাত ধরার আগে তার বুকটা কেপে উঠলো! তার মনে নেই এই মেয়েটাকে সে টাকা দিয়ে আজ রাতের জন্য ভাড়া করে এনেছে!

শুধু হাত ধরা না, চাইলে অনিল এখন আরো অনেক কিছুই করতে পারে!

অনিল স্বর্ণার হাত ধরে দু মিনিট চুপ করে বসে রইলো! স্বর্ণা অবাক হয়ে অনিলকে দেখছে! অনিলের দিকে তাকিয়ে স্বর্ণা বললো,

– স্যার, রাইত কিন্তু ফুরায় যাইতেছে! আমাগো কেউ ঘরে আইনা বসায় রাখে না! ঘরে আনার পর কামরায় কামরায় খাইয়া ফেলে! আপনি তো দেখতাছি মহামানব, এহনো চুপ কইরা বইসা আছেন!

– আচ্ছা স্বর্ণা, তোমার রোজ রোজ এরকম কাজ করতে ভালো লাগে? মাঝে মাঝে একটু প্রেম-ভালোবাসার দরকার হয়না?

– আপনে যে কি কন না স্যার, কাম না করলে খামু কি? আর প্রেম-ভালোবাসা আমাগে লিগা না! আমাগো কেডা ভালোবাসবো কন?

– কখনো কেউ বলেনি, তোমার চোখ দুটো খুব সুন্দর?

– আমাগো কাস্টমাররা আমাগো চোক্ষের দিকে কহনো তাকায় না স্যার! তারা আমাগো স্তন আর যোনী ছাড়া আর কিছু ভাবে না!

– তোমার সংসার করতে ইচ্ছে হয়না?

– একবার এক বেডা বিয়া করনের কথা কইয়া আমার সাথে শুইছিলো, তারপর আর বিয়া করে নাই! গ্রামের হগ্গলে এই কথা জাইনা গেছিলো! আমি বাসা থিকা বাইর হইতে পারতাম না! ছোড ছোড পোলাপাইনে ও রাস্তায় দেখলে ‘খানকি’ বইলা গালি দিতো! অথচ, কেউ বুজে নাই, আমি ভালোবাইসা শরীর দিছিলাম!

– তারপর?

– হের পর আর কি, সমাজ থিকা আমারে বাইর কইরা দিলো! আমি ঢাকায় আইয়া যেইহানে কাম করতে গেছি, সবাই খারাপ চোক্ষে চায়! কাম পাইতে হইলে কাম করতে হয়! তাই ভাবছি, কামই যদি করতে হয়, তয় এই কামই করুম! টেকা ও ভালো পাওয়া যায়, এই কামে!

– আচ্ছা স্বর্ণা, তুমি কি আমার কাঁধে মাথা রেখে একটু আকাশ দেখবা? এই যে এত বড় একটা চাঁদ আকাশে, তোমার একটা আপন মানুষের প্রয়োজনবোধ হয়না?

– স্যার জানেন, অনেক ছোডকালে আমি এই রকমের পূর্নিমা চাঁন দেখলে আমার অনেক কৌতুহল হইতো! এত বড় একটা চাঁন কেম্নে আকাশে ভাইসা থাকে!

– কফি খাবে?

– আপনে কইলে খামু!

– আচ্ছা, ব্যবস্থা করছি!

– স্যার শুনেন, আমি কি আপনার বুকের লগে একটু মাথা ঠেকাইয়া আকাশ দেখতে পারি? আকাশ দেখলেই আমার খালি শূন্য শূন্য লাগে! আপনার বুকের ভেতরডা আইজ শূন্য মনে হইতাছে! আমি একটু মাথাডা রাখি?

– আচ্ছা, রাখো! আর শোন, যেকথা কেউ কখনো তোমাকে বলেনি, তা হলো তোমার চোখ দুটো সাংঘাতিক রকমের সুন্দর!

– স্যার, এই কথা আইজ আপনেই প্রথম কইলেন!

– তুমি কি সারাজীবন আমার পাশের চেয়ারে বসে আকাশ দেখবে?

– আকাশ দেহানোর লোভ দেখাইয়া শূন্যতা দিয়া চইলা যাইবেন না তো?

– না, যাবো না!

– তাইলে আমি সারাজীবন আপনের লগে থাকতে চাই!

এরপর প্রেম মিশ্রিত সঙ্গমে অনিল এবং স্বর্ণা একাকার হয়ে গ্যালো!

ভালোবাসার সঙ্গমটাই অন্যরকম হয়!

পরদিন দুপুরে, পুলিশ ওই হোটেলের ২০৩ নাম্বার রুম থেকে, স্বর্ণার গলা কাটা লাশ উদ্ধার করলো!

আর সেই ২০৩ নাম্বার রুমের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, ‘৫৮ তম সফলতা’!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।