এই নন ভাইরাল ছবিটি আপনারও হতে পারতো

দুই কিশোর কিশোরীর ভ্রুর ইশারার ভিডিওটি নিশ্চয়ই দেখেছেন। কিশোরীর চোখ টেপা আর সেটা দেখে কিশোরের এক্সপ্রেশনে নিশ্চয়ই আপনারও মনে হয়েছে স্কুল জীবনে ফেলে আসা প্রথম প্রেমের কথা। নিজের অজান্তেই হেসে ফেলেছেন , লাইক দিয়েছেন, শেয়ার করেছেন।

মাত্র একদিনে কেরালার এই কিশোরীর ইন্সটাগ্রামে ৬ লাখ ফলোয়ার। এখন, একটি নন ভাইরাল ছবির দিকে আপনাদের একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগ্য একজন পিতা, তাঁর সাত বছর বয়সী স্কুলের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে সংবাদ সম্মেলনে ভাঙা গলায় কিছু একটা পড়ছেন।

এই সাত বছর বয়সী শিশুটিকে চকলেট খেতে দেবার নাম করে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষিতার পিতা আশঙ্কা করছেন, তিনি সুবিচার পাবেন না।

এই নন ভাইরাল ছবিটি আপনারও হতে পারতো। আপনার শিশুকণ্যা, আপনার বোন হতে পারতো । ঐ পিতার জায়গায় হয়তো একদিন আপনিও দাড়িয়ে থাকবেন। প্রথম আলোর বিনোদন পাতার প্রথমে নয়, আপনারও স্থান হবে দেশের খবর পাতার শেষ কলামের দুই ইঞ্চির মাঝে।

এবং সবাই একসময় ভুলে যাবে আপনার কথা।

শুধু সেই মেয়েটি ভুলবে না, যাকে খুব অল্প বয়সেই সবচেয়ে ভয়ংকর এবং ঘৃণ্য একটা অভিজ্ঞতার মাঝে দিয়ে পার হতে হয়েছে । সে বেড়ে উঠবে একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ হিসেবে । ক্লাসের ছেলেরা তাকে নিয়ে সারাজীবন হাসাহাসি করবে । আগামী জীবনটা তাকে কাটাতে হবে ‘সহজলভ্য’ এবং ‘ব্যবহৃত’ টাইটেল নিয়ে । তার দিকে তাকিয়ে হয়তো কেউ কখনো চোখ টিপবেনা, তাকে প্রেম নিবেদন করবেনা, তাকে হয়তো কেউ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেনা এই সমাজে ।

আজকে হতভাগ্য পিতা সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তাই আমরা জানতে পারছি। এরকম লক্ষ লক্ষ লাঞ্ছিত, ধর্ষিতা শিশু আমাদের চারপাশে। ‘সমাজের চাপে’ ধামাচাপা দেয়া এই শিশুগুলো সারাজীবন মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে থাকে। এই ঘটনা তাঁরা ভুলতে পারে না, তাদের একান্ত প্রিয়জনের কাছেও কখনো বলতে পারে না। প্রেমিকের হাতকে তাদের কাছে ধর্ষকের হাত বলে ভ্রম হয়।

কিছুদিন আগে #metoo হ্যাশট্যাগটি অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল। বিদেশের অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছিলেন তাদের যৌণ হয়রানির কথা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশে কিন্তু খুব কম লোকই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে তাঁরা ছেলেবেলায় এমন অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন।

কারণটা সহজেই অনুমেয়, সমাজ তাদের জাজ করবে। তাদের অবশ্যই কাপড় ঠিক ছিলো না, তারা সাত বছর বয়সে পর্দা কেন করলোনা – এমন হাইপোথিসিস প্রসব করবে। তাদের কাছে আকারে ইঙ্গিতে কি হয়েছিলো, কিভাবে হয়েছিল – সেটা জিজ্ঞাসা করবে। তারপর তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে । এটার জন্যই কেউ স্বীকার করেনি।

একটা ছোট পরিসংখ্যান দেই। আপনার আশেপাশের প্রতি ১০ জন মানুষের সাতজন তাদের শৈশবের কোন না কোন পর্যায়ে যৌণ হয়রানির শিকার। আপনি যদি আপনার শিশুর প্রতি পর্যাপ্ত সময় এবং তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গীদের প্রতি, তার প্রতি অন্যদের আচরণের প্রতি সম্যক মনোযোগ না দেন, এই সংখ্যাটি শুধু বাড়বে।

আমাদের বর্তমান কলুষিত হতে পারে, আমাদের অতীত কলঙ্কিত হতে পারে কিন্তু আমাদের ভবিষ্যত যেন আমাদের চেয়ে ভালো বর্তমান নিয়ে গড়ে ওঠে।

– শামীম শরীফ সুষম-এর ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।