এই জীর্ণ কুটিরেই থাকেন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফুটবলার

বেলা তখন তিনটা। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেরার পৌরসদর। পাড়কোলা গ্রামে এসে পৌঁছালেন সোনার মেয়ে। বাসস্ট্যান্ডে নেমেই গ্রামবাসির ভালবাসায় সিক্ত হলেন। সবার সাথে হাত মেলালেন। শ্রমিক বাবা আক্তার হোসেন ও মা নাসিমা বেগমের চোখে তখন পানি। মেয়েকে নিয়ে যে এখন ঠাঁই দিতে হবে সেই জীর্ণ কুটিরেই।

মেয়েটির নাম আঁখি আক্তার। হ্যা, এই আঁখিই ক’দিন আগেই ঢাকার মাঠে ফিরিয়ে এনেছিলেন কায়সার হামিদের স্মৃতি। সাফ অনূর্ধ্ব ১৫ ফুটবলে ভারতকে হারিয়ে যে বাংলাদেশের ক্ষুদে মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হল তাতে তিনিই নির্বাচিত হয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার।

সেই কুটিরেই আজ চাঁদের হাঁট। বিলাসীতার বিন্দু মাত্র কোনো সামগ্রী না থাকলেও তাতে আনন্দের কোনো কমতি নেই। গাঁয়ের মেঠো পথ ধরে আঁখি পৌঁছে যান বাড়িতে।

বাড়ি ফিরে স্থানীয়দের ভালবাসায় সিক্ত আঁখি।

ঢাকা থেকে চার-পাঁ ঘণ্টার পথ। তারপরও আঁখির চোখে নেই এক বিন্দুও ক্লান্তির ছাপ। বললেন, ‘ঢাকা থেকে ৪-৫ ঘন্টায় বাড়িতে আসলেও আমি মোটেও ক্লান্ত নয়। আমার খুব ভাল লাগছে। আমাকে দেখার জন্য যে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন তাতে আমি খুশি। আমি সেরা খেলোয়াড় হওয়ায় আমি দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ, গ্রামবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ, ছোটবেলা থেকেই আমি এই খেলায় আপনারা যে আমাকে উৎসাহ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন আমি কৃতজ্ঞ। আমার জন্য আপনারা আরও দোয়া করবেন আমি যেন আরও ভাল খেলতে পারি, আরও সুনাম অর্জন করতে পারি। এটাই আপানাদের কাছে দোয়া চাই।’

বাড়িতে আঁখি থাকবেন আগামী ১০ জানুয়ারি অবধি। মানে গুনে গুনে ১৪ দিন। মেয়েদের ফুটবলের দেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার অজপাড়াগায়েই থাকবেন, এই বাড়িতেই। এটাই যেন তার নিয়তি। এই অভাবনীয় সাফল্যের পরও কি কিছুই করার নেই!

আঁখির বাড়িতে তাঁর সব অর্জনের ট্রফি ও সার্টিফিকেট নিয়ে বাবা-মা ও বড় ভাই।

পরিবারটির সহায় বলতে এই দেড় শতক জায়গার ওপরে ক্ষয়ে যাওয়া টিনের বাড়ি। ফ্যাক্টরিতে তাঁত শ্রমিকের কাজ করে বাবা যে আয় করেন তা দিয়েই চলে তাদের ৪ জনের সংসার।

মা নাছিমা বেগমও চরকায় দিনরাত সূতা ভরার কাজ করে। এতে তাদের দু’বেলা খাবার কোনো মতে জুটলেও, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ যোগার করা কোনো ভাবেই সম্ভব হয়না।

তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালে স্কুল শিক্ষক মনসুর রহমানের অনুপ্রেরণায় শাহজাদপুরে বঙ্গমাতা স্কুল দলে নাম লেখায় আঁখি। সেই থেকে তার ফুটবল খেলা শুরু। এরপর সে ২০১২ ও ২০১৩ সালে ফুটবল খেলায় রাজশাহী বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ২০১৬ সালে আঁখি বিকেএসপিতে চান্স পেয়ে অনুর্ধ-১৪ দলের হয়ে ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, ভূটান, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, তাজাকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন।

ফাইনাল জিতে বাফুফে সভাপতি ও মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করছেন আঁখি।

অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তান আঁখির একমাত্র বড় ভাই নাজমূল ইসলাম উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী ডিগ্রি কলেজের দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। অর্থাভাবে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম। গত জেএসসি পরীক্ষায় ৪.৬৩ জিপিএ পেয়ে নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছেন আঁখি।

তাদের ভাঙা ঘরে বৃষ্টি এলে পানি পড়ে ঘরের ভেতর। এই শীতে ঘরে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে। ভাল একটি লেপ কিংবা কম্বলও তাঁদের নেই। ভাল কোনো বিছানা নেই। হ্যা, এই ঘরেই আগামী ১৪ টা দিন থাকবেন আঁখি। সাফল্য স্মৃতি বুকে নিয়ে আগামী দিনে আরো বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখবেন এই বাড়িটিতেই!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।