এইডা কিছু হইলো!

রাহাত ছেলেটা স্বভাবগত দিক দিয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস টাইপের ব্যক্তিত্ব। সে একদিন ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ মুভিটা দেখার পর দিপীকা পাড়ুকোনের প্রেমে পড়ে গেলো এবং সিদ্ধান্ত নিলো যে করেই হোক দিপীকাকে বিয়ে করবে। এটা খুব বেশি চিন্তার বিষয় না। এমন ডিসিশন আমরা প্রতিটা মুভি শেষ করার পরেই নিয়ে থাকি। এমনকি সুচিত্রা সেনের মৃত্যুর প্রায় ৩ বছর পর আমি তার একটা সিনেমা দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বড় হয়ে অবশ্যই সুচিত্রা সেনকে বিয়ে করবো। এগুলো আমাদের কাছে খুব সিম্পিল। কিন্তু ঐ যে শুরুতেই বলেছি, রাহাত ছেলে হিসাবে খুব সিরিয়াস!

এটাই চিন্তার বিষয়। আর তাইতো আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে একদিন সকালে রাহাত ব্যাগ বোচকা গুছিয়ে ইন্ডিয়ার পথে রওনা দিয়ে দিলো। উদ্দেশ্য, দিপীকা পাড়ুকোনকে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে আসা।

আমরা ওকে থামানোর চেষ্টা করলাম, ‘দেখ, দিপীকা হিন্দু আর তুই মুসলমান।’

‘তাতে কি? ও মুচকি হাসি দিয়ে বললো, বিয়ের আগে নিশ্চয় দিপীকা ধর্ম চেঞ্জ করে মুসলমান হবে।’

‘কিন্তু তুই ইন্ডিয়া কিছুই চিনিস না। কই যাবি, কি করবি? আর অতো বড় সেলিব্রেটি নায়িকাকে পটাবিই বা কিভাবে।’

‘সেটা পরে দেখা যাবে। আগে যাই তো।’

‘আচ্ছা যা, কিন্তু এটা কি জানিস যে দিপীকার বয়ফ্রেন্ড আছে। রনবীর সিং।’

‘হ্যা জানি, রাহাত বললো। আর এটাও জানি যে এর আগে দিপীকার প্রেম ছিলো রনবীর কাপুরের সাথে। তো সে সিং এর জন্য যেহেতু কাপুরকে ছাড়তে পেরেছে, তাইলে আমার জন্য সিংকে কেন নয়?’

মোক্ষম যুক্তি। এর পরে আর বলার কিছু থাকে না। তারপরও আমরা শেষ চেষ্টা করলাম, ‘তোর কোনো ধারনা আছে দিপীকার বয়স কত? তোর থেকে প্রায় ছয়- সাত বছরের বড় ও।’

‘ধুরর, এইটা কোনো ব্যাপারই না আজকাল। রাহাত মুখ বাঁকালো। শচীন টেন্ডুলকারের বউ অঞ্জলি তার থেকে তিন বছরের বড় এমনকি হলিউডের হিরো হিউ জ্যাকম্যানের বউ লি ফারনেস তার থেকে তের বছরের বড়।’

কি আর করা! শেষমেশ হাল ছেড়ে দিলাম আমরা। আমাদের সামনে দিয়ে হাসতে হাসতে ইন্ডিয়ার ট্রেনে গিয়ে উঠলো রাহাত।

সবাই রাহাতকে বোকা ভাবলেও সে কিন্তু বোকা না। সে ইন্ডিয়া যাওয়ার আগে ভালোমত প্লান করেই গেছে। প্লানের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মন্ত্র পড়া মিষ্টি। যেটা ওদের গ্রামের মুন্সি ফকির দেয়। এই মিষ্টির স্পেশালিটি হলো আপনি যার প্রেমে পড়বেন তাকে শুধু এক পিস খাইয়ে দিতে হবে যেকোনোভাবে। বাকি কাজ করার দায়িত্ব মিষ্টির ভেতরে থাকা মন্ত্রের।

ভালোবাসার মানুষ চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আপনার প্রেমে পাগল হয়ে ছুটতে ছুটতে আপনার কাছে চলে আসবে। আপনি তাকে যা বলবেন তাই-ই শুনবে। তারপর আরো চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তাকে বিয়ে করে ফেলতে পারলেই ঝামেলা শেষ। বাকি জীবন সেই মেয়ে আপনার পোষ মানা লক্ষী স্ত্রী হয়ে থাকবে। সাত চড়েও রা করবে না। এমনই ক্ষমতা এই মিষ্টি পড়ার।

রাহাত এই মিষ্টি একটা ব্যাটারি চালিত বক্স রেফ্রিজারেটরে করে নিয়ে গেছে গুণে গুণে পুরো এক ডজন। উদ্দেশ্য দিপীকাকে যেকোনোভাবে শুধু একটা মিষ্টি খাইয়ে দিতে পারলেই হয়।

কোলকাতা থেকে ট্রেনে করে মুম্বাই। মুম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা বান্দ্রা। রাহাত যখন দিপীকার বাসার সামনে ট্যাক্সি থেকে নামলো তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দীর্ঘ জার্নিতে ক্লান্ত ও। প্রথমেই একটা রেস্টুরেন্ট থেকে নাস্তা করে নিলো। নাস্তা করতে করতেই খবর পেলো দিপীকা এখন বাসাতেই আছে। পদ্মাবতী সিনেমার পর নতুন সিনেমা শুরু করার আগে রেস্ট নিচ্ছে। এবং আরো জানতে পারলো আজ রাতেই দিপীকার বাসায় বিশাল পার্টি।

পদ্মাবতী সিনেমার সাকসেস উপলক্ষে। আর পার্টির সমস্ত খাবারের অর্ডার পেয়েছে ও যে রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছে সেই রেস্টুরেন্ট। হঠ্যাৎ ওর মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। রেস্টুরেন্টের ওয়েটারদের হেড লোকটার কাছে গিয়ে বললো, ‘আমি দিপীকার বিশাল বড় ফ্যান। এই রেস্টুরেন্টের ক্যাটারার হিসাবে আজ রাতের জন্য দিপীকার বাসায় গিয়ে ওকে সামনাসামনি দেখার একটা সুযোগ চাই প্লিজ।’

লোকটা প্রথমে একবারেই না করে দিলো। বললো, ‘আমাদের রেস্টুরেন্টের কিছু রুলস আছে। আমরা কোনো উটকো ঝামেলা চাইনা।’

পরে রাহাত ওর নিয়ে যাওয়া মোটামুটি অঙ্কের টাকার বড় একটা অংশ লোকটার পকেটে গুজে দিতেই সে রাজি হয়ে গেলো। কথা হলো, অন্য একজন ওয়েটারের জামা পরে সবার সাথে দিপীকার বাসায় ঢুকবে রাহাত।

রাহাতের খুশি আর দেখে কে। সে গোপনে নিজের পড়া মিষ্টিগুলো সাথে নিয়ে নিলো। তারপর প্রবেশ করলো দিপীকার বাসার আলিশান বলরুমে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্টি শুরু হয়ে গেলো। বলিউডের অনেক স্টার এসেছে পার্টিতে। শাহরুখ খান, অর্জুন কাপুর, শাহেদ কাপুর, রনবির সিং সহ আরো কয়েকজনকে চিনতে পারলো রাহাত। সাথে দিপীকা তো আছেই। টকটকে লাল রঙের অদ্ভুত টাইপের একটা ড্রেসে দিপীকাকে পুরোপুরি স্বর্গের অপ্সরীর মতো লাগছে। রাহাত ক্রাশ খেলো আবারো। সুযোগ খুজতে লাগলো কিভাবে দিপীকাকে একপিস মিষ্টি খাওয়ানো যায়।

কিছুক্ষণ পর পার্টিতে খাওয়াদাওয়া শুরু হলো। রুমের একপাশে খাবার সাজানো। মেহমানরা নিজেদের প্লেটে তুলে নিচ্ছেন ইচ্ছামতো। তদারকির দায়িত্বে আছে রাহাত আর তার কয়েকজন সহকারী। রাহাত আগে থেকেই ডেজার্টের দায়িত্ব নিয়েছে। হরেক রকম মিষ্টির সাথে একপাশে ও সাবধানে নিজের পড়া মিষ্টিগুলোও রেখে দিয়েছে। কেউ টেরই পাইনি যে এগুলা ও সুদূর বাংলাদেশ থেকে বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছে।

খাওয়াদাওয়া শেষে অনেকেই একে একে রাহাতের সামনে থেকে মিষ্টি তুলে নিতে লাগলো। রাহাত ওর আনা মিষ্টির বাক্সটা একটা প্লেট দিয়ে ঢেকে একদম আড়ালে রেখে দিয়েছে। যাতে অন্য কেউ এই মিষ্টি তুলে না নেয়। ও অপেক্ষায় আছে কখন দিপীকা পাড়ুকোন স্বয়ং আসবে মিষ্টি নিতে।

হ্যা ঐ তো, দিপীকা আসছে ওর দিকেই। হাতে প্লেট। রাহাত দ্রুত ওর বাক্সের উপর থেকে প্লেট সরিয়ে সবার সামনে নিয়ে রাখলো। তারপর যা দেখলো তা ও নিজের চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারলো না। দিপীকা এসে সবার আগে ওর বাক্স থেকে একটা মিষ্টি তুলে গালে দিলো। ওহ গড, ইয়েস! অপারেশন সাকসেসফুল। রাহাত ভাবতে পারেনি এতো সহজে ওর স্বপ্ন সত্যি হবে। এখন শুধু অপেক্ষা। মন্ত্র খুব দ্রুতই কাজ শুরু করবে।

রাত দেড়টা। দিপীকাত বাড়ির সামনের রাস্তায় গত একঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছে রাহাত। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা লেগে গেছে ওর। কিন্তু দেখা নেই দিপীকার। তাহলে কি মিষ্টি কাজ করলো না? মুন্সি ফকির এভাবে ওকে ধোকা দিলো? আরো একঘন্টা পর হাল ছেড়ে দিয়ে এটাই ভাবছিলো রাহাত। এমনসময় দেখলো দিপীকার বাসার গেট আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। রাহাতের বিস্মিত চোখের সামনে দিপীকা বের হলো গেট দিয়ে। রাস্তা পার হয়ে এসে রাহাতের হাত ধরলো। গেটের দারোয়ান তখন তার ডিউটি ভুলে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত।

এক মাস পর।

সত্যি বলতে আমরা কখনোই বিশ্বাস করতে পারিনি যে রাহাত দিপীকাকে আসলেই বিয়ে করে গ্রামে নিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু এখন রেজাল্ট আমাদের চোখের সামনে। অবিশ্বাস করি কিভাবে! তবে এটা যে বলিউড সুপারস্টার দিপীকা পাড়ুকোন সেটা আমরা কয়েকজন বাদে কেউই জানেনা। পুরো পৃথিবী জানে দিপীকা হঠ্যাৎ করে গায়েব হয়ে গেছে।

প্রথম দুই তিন সপ্তাহ এটা নিয়ে মিডিয়ায় অনেক হইচই হয়েছিলো। সাংবাদিকরা প্রচুর নিউজ করেছিলো। দিপীকা খুন হয়েছে, নাকি গুম হয়েছে, নাকি অভিমান করে সিনেমাজগৎ থেকে নিয়েছে স্বেচ্ছা নির্বাসন; এগুলো ছিলো সারা পৃথিবীর আলোচনার বিষয়। কিন্তু আস্তে আস্তে এই সংবাদও আর দশটা সংবাদের মতো ফিকে হয়ে এসেছে একসময়।

বাংলাদেশের একটা অজপাড়াগায়ে এক এনজিও কর্মীর বউ দেখতে অনেকটা বলিউডের এক সুপারস্টার নায়িকার মতন, এটা কেউ জানতেই পারেনি। কারণ, দিপীকা রাহাতের ঘর সংসার নিয়েই ব্যস্ত। বাড়ির বাইরে পা রাখেনা বলতে গেলে। কখনো বাইরে গেলেও তার পরনে থাকে ঢোলা বোরকা। মুখে কালো হিজাব। সবাই বলে রাহাতের বউটা ভীষণ পর্দানশীন। কেউ তার মুখ পর্যন্ত দেখেনি আজ অব্দি।

আরো পাঁচ বছর পর। দিপীকার কোল জুড়ে রাহাতের দুটো মেয়ে হয়েছে। কিন্তু সংসারে সুখ নেই। খবর পাই রাহাত প্রায় প্রায়ই তার বউকে ধরে মারে। পাঁচ বছর সংসার করেও সে নাকি এখনো ডালে কতটুকু লবন দিতে হবে তা-ই শিখতে পারেনি। অবশ্য এতো বড় নায়িকা, নিজে কখনো রান্না করে খেয়েছে নাকি সন্দেহ। এখন তাও রাহাতের সংসারে এসে ভালোই শিখেছে। কিন্তু রাহাত বড্ড নিষ্ঠুর। পান থেকে চুন খসলেই দিপীকাকে প্রচন্ড মাইর দেয়। আমি একদিন বোঝাতে গেলাম।

– তোর কি হইছে বলবি?

– দোস্ত, আসলে আমার এখন আর দিপীকারে ভাল্লাগেনা।

– কি বলিস, এককালে তুই ওর জন্য কতো পাগল ছিলি। আর আজ এই অবস্থা ক্যান?

রাহাত হাসে, ‘আরেহ মেয়ে যতো বিশাল কেউই হোক না কেন, পুরোপুরি পাওয়া হয়ে গেলে তার উপর আর ছেলে জাতীর কোনো আকর্ষণ থাকেনা।’

আমরা আফসোস করি।

তারপর একদিন শুনি সে দিপীকাকে তিন তালাক দিয়েছে।

তারও আর কয়দিন পর শুনি রাহাত মিয়া খলিফা নামে এক রমনীর একটা বিশেষ ভিডিও দেখে ক্রাশ খেয়েছে। টাকা জোগাড় করতেছে, শীঘ্রই মিয়া খলিফাকে বিয়ে করে আনতে আমেরিকা যাবে। আমরা আর কিছু বলিনা ওকে। বড় একরোখা ছেলে রাহাত। যা খুশি করুক।

আরো দুই বছর পর।

বিটিভির ‘স্বাবলম্বী নারী’ নামের একটা অনুষ্ঠানে একদিন জয়পুরহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের এক নারীর জীবনকাহিনী সম্প্রচারিত হলো। স্বামী পরিত্যক্তা এই নারীর নাম দিপিকা বেগম। তার দুই কন্যা। স্বামী তাকে দুই বছর আগে তালাক দিলেও সে থেমে থাকেনি। নিজে হাসমুরগির চাষ করে আর সেলাই মেশিনের কাপড় সেলাই করে মেয়েদুটোকে মানুষ করছে। আজ দিপিকা বেগম স্বাবলম্বী।

টিভিতে অনুষ্ঠানটা সম্প্রচারিত হওয়ার পর অনেক দর্শকের চোখেই সূক্ষ্ম একটা জিনিস ধরা পড়লো। গ্রাম্য ঐ গৃহবধু দেখতে অনেকটা বলিউডের হারিয়ে যাওয়া নায়িকা দিপীকা পাড়ুকোনের মতন।

কয়েকটা অনলাইন পত্রিকা নিউজও করলো।

‘দ্বিতীয় দিপীকা’ ‘দিপীকা ফিরে এলো’ এরকম টাইপের শিরোনামে করা সেইসব নিউজে বলা হলো, ‘জয়পুরহাটের এক গ্রাম্য গৃহবধূর চেহারার সাথে আছে সাত বছর আগে নিজের বাসা থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বলিউড সুপারস্টার দিপীকা পাড়ুকোনের অদ্ভুত মিল।’

কিন্তু কেউই এইসব নিউজ পাত্তা দিলোনা। অধিকাংশই না পড়ে স্কিপ করলো। যারা পড়লো তারাও একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে ভাবলো, ‘অনলাইন নিউজপেপারে আজকাল কিসব আজগুবি নিউজ যে দেয়। ধুর!’

সবার দৃষ্টি সেদিন ছিলো অন্য একটা সিরিয়াস খবরে। সারা দুনিয়ার সব মিডিয়ায় একযোগে প্রচারিত হচ্ছিলো, ‘নিজ বাসা থেকে হঠ্যাৎ উধাও বিখ্যাত জন্মতারকা বা বর্ণস্টার, মিয়া খলিফা!’

__________

নিছক রম্য এক রচনা। এর সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।