এইচএসসির ফলাফল ও দুই বস্তা চাল

আমার এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলআপের টাকা জোগাড় করতে আব্বাকে দুই বস্তা চাল বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। এর এক বস্তা আমি নিজে সাইকেলে করে ঠেলে নিয়ে গেছি। আমার জন্য সেটা ছিল একটা ট্রাক ঠেলে নিয়ে যাওয়ার সমান। কারণ আমি জানতাম, এই চাল আমাদের পুরো পরিবারের তিন মাসের খাবার।

এইচএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলআপের সময় আমাকে নিয়ে আমার বড় বোন বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করছিল। একটা টিউশনি করাতাম। এক বছরের টাকা তারা একসঙ্গে দেবে বলেছিল। ফরম ফিলআপের শেষ সময় পেরিয়ে যায়-যায়। কিন্তু সেই লোকও আজ নয় কাল, পরশু আসো করছিল। ‘কেন টাকা দিবে না, চল তো’, বলে রেগে আমার বোন আমার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে যাচ্ছিল, আজও টাকাটা পাওয়া যাবে কি না এই টেনশনের চেয়ে আমার বেশি ভয় হচ্ছিল পায়ের স্যান্ডেল জোড়া নিয়ে। যেকোনো অবস্থায় সেটার ফিতে যে ছিঁড়ে যাবে!

আমার এসএসসি আর এইচএসসির ফল মোটামুটি ভালো ছিল। কিন্তু তেমন ভালো নয়, যার জন্য সাংবাদিকেরা সাক্ষাৎকার নেবে। যদি নিত, যদি জিজ্ঞেস করত আমার ভালো ফলের রহস্য কী? আমি ওই দুই বস্তা চালের কথা বলতাম। আমার মর মর ছেঁড়া স্যান্ডেলের কথা বলতাম।

——

মার্ক জাকারবার্গ, স্টিভ জবস, বিল গেটসরা আবারও উঁকি দিতে শুরু করেছেন। তাদের ফেলটুস জীবনের গল্প আরও একবার রিভাইজ দিচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলও বাদ যাচ্ছেন না। একাডেমিক জীবনে ব্যর্থ হওয়া যে কত মহৎ কাজ, নতুন করে শিখছি। মোটিভেশনাল স্পিকার আর মোটিভেশন স্পিচ নামের নতুন আরেক যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।

আগে আমাদের পরীক্ষার্থীদের তিরস্কার করার ধরন ঠিক ছিল না। এখন আমরা যেভাবে উজ্জীবিত করতে চাই, আমার মনে হয়, এই পদ্ধতিও ঠিক নয়।

এতে দুই ধরনের বিপদ দেখতে পাচ্ছি। আশপাশে এমন অনেক তরুণ দেখতে পাই, যারা মনে করে, জিপিএ ৫ পেলে আর জাকারবার্গ-জবস হওয়া যাবে না। আরেকটা বড় সমস্যা, যারা জিপিএ ৫ পায়, তাদের কারও কারও মনে হতে শুরু করে, ভালো ফল করে যেন অপরাধ করে ফেলেছে!

কিন্তু আমাদের মহামান্য উজ্জীবনী ভাষকেরা তোমাদের বলবে না, স্কুল পালালেই রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না। লাখ-লাখ কি কোটি-কোটি ড্রপ আউটের মধ্যে জাকারবার্গ, জবস পাওয়া যায় দুটো কি তিনটা। আমরা বেশির ভাগ গড়পড়তা মানের। আমাদের জন্য একাডেমিক শিক্ষা আর তাতে ভালো ফল জরুরি।

আমরা বেশির ভাগই এমন পরিবার থেকে উঠে আসি, যেখানে ফল ঘোষণার দিনটায় পরীক্ষার্থীর চেয়ে কেন তার বাবা বেশি টেনশন করে, একটা দুটো সিগারেট বেশি খেয়ে ফেলেন; মা কেন ভোর থেকে নামাজে বসে যান; বড় ভাই বা বোনটা কেন শুকনো মুখ করে ঘোরাফেরা করে…এই প্রশ্নগুলোর উত্তরটা মন দিয়ে ভাবলে বুঝতে পারবে, কেন আমাদের জন্য ভালো ফল করা আরও বেশি জরুরি।

——

আমার জীবনের গল্পের সঙ্গে আমি অনেকের মিল পাই। কম বেশি আমাদের সবার পরিবারের গল্পটা একই রকম। পার্থক্য হলো, কারও গায়ে সরাসরি আঁচটা লাগে, কারও গায়ে তার বাবা-মা লাগতে দেন না।

তোমার স্কুল-কলেজের বেতন, কোচিং ফি, টিউশনি খরচ, তোমার হাতের দামি স্মার্টফোন, তোমার ল্যাপটপ এর পেছনে তোমার বাবা কিংবা মায়ের স্যাক্রিফাইসের গল্পটা তুমি জানো না। মা হয়েতো ভেবেছিল, একটা ভালো শাড়ি কেনার দরকার, আত্মীয়স্বজনের দাওয়াতে যেতে হয়; কেনেনি। বাবা হয়তো ভেবেছিল, এই ভাঙা মোবাইলটা নিয়ে অফিসে হাসাহাসি হয় খুব, এবার বদলাব। বদলানো হয়নি।

——

তোমরা যারা ভালো ফল করতে পারনি, তোমাদের জন্য আমার ভালোবাসা।

আমি জানি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের খাতা দেখা বা মার্কিংয়ের স্ট্যান্ডার্ডের বারবার পরিবর্তন, আমাদের প্রশ্নফাঁস সংস্কৃতি…তোমাদের সঙ্গে কী পরিমাণ অন্যায় করা হয়। কিন্তু তবু চেষ্টা করো।

একাডেমিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া হয়তো তোমার হাতে নেই। কিন্তু পরিশ্রমের জায়গায়, তোমার যেটা দায়িত্ব, কাজ; সেই জায়গায় নিজেই নিজেকে জিপিএ ৫ দিতে পারছ কি? বারবার এই প্রশ্নটা করো।

– ফেসবুক থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।