উধাও: একটি অনন্য নির্মান

২০১৩ এর শেষের দিকে অথবা ২০১৪ এর শুরুর দিকের কথা। ইউটিউবে একটা নতুন বাংলা সিনেমার ট্রেলার বের হয়েছে। সেই ট্রেলার নিয়ে চারপাশে মাতামাতি। আমাদের চারপাশ বলতে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, ক্লাস আর আড্ডাই ছিল মূলত। এর মাঝে এক বন্ধু কোত্থেকে যেন উধাও লেখা টিশার্ট নিয়ে আসলো। আগ্রহ গেলো আরো বেড়ে। তার সাথে পত্রিকার বিনোদন পাতায় উধাওয়ের প্রশংসা করে প্রতিবেদন ছাপা হয়। পড়ি আর আফসোস বাড়ে।

না, বাড়িয়ে বলছি না – যে কোনো বাংলা সিনেমার জন্য এত হাহাকার করেছি। কিন্তু তখন উধাও এর ট্রেলার, এর ডায়লগ আর এর চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি দেখে সব বন্ধুরা মিলে একসাথে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। একা থাকলে হয়ত অত আগ্রহ হতো না। তাছাড়া এটাই তো মুক্তির অপেক্ষমান কোন বই প্রচারণার ব্যবসায়িক কৌশল, তরুণদের মাঝে একটা আগ্রহ তৈরি করে দেওয়া। এখানে তরুণরা যেন অনেকটা হাওয়া সমেত নৌকার পালের মতন।

আপনি আগ্রহ তৈরি করে দিয়ে তরুণদের মাঝে ছেড়ে দিবেন আর তারা তরতর করে আপনার সিনেমা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তরুণদের এমন উৎসাহ দেখে এমনকি শিশু আর বয়স্করাও উৎসাহিত হয়, ভরসা করে। কিন্তু সিনেমাটা তখন ঢাকার গুটিকয়েক হলে মুক্তি পেয়েছিল এবং সিলেটেও আসেনি বলে এক সময় বইটার কথা তার প্রধান চরিত্র আকবরের মত করেই ভুলে গেলাম।

তরুণ নির্মাতা অমিত আশরাফের প্রথম সিনেমা উধাও (২০১৩) নিয়ে এত কথা বললাম। অমিত নিউইয়র্ক থেকে একই বিষয়ে পড়াশোনা করে আসা নির্মাতা তাই তার বই বানানোর কৌশল আর সবার চেয়ে খানিকটা উন্নত, আলাদা আর গ্রহণযোগ্য হবে ভেবেই হয়ত তরুণরা আগ্রহ দেখিয়েছে তার কাজের প্রতি। বইয়ের শুরুটা সেই আগ্রহকে যেন পূর্ণ করতে পেরেছে। পায়ে শেকল দিয়ে বেঁধে আর গলায় সিমেন্টের ভার ঝুলিয়ে দিয়ে একজন রিকশাচালক কিংবা এরকম কাউকে ফেলে রাখা হয়েছে।

জ্ঞান ফিরতেই সে পালানোর চেষ্টা করে কিন্তু পালাতে পারেনা। গ্রামে নিজের স্ত্রী সন্তানকে রেখে সে শহরে যায় কিন্তু আর ফিরে আসেনা। তাই সবার কাছে রবিনহুড নামে পরিচিত বাবু তাকে ধরে এনে তার পরিবারের হাতে তুলে দেয়। ভ্যান চালক বাবু আড়ালে এইসব লোকদের ধরে আনে। এটি যেন তার কাজ! সে তার বাবাকে খুঁজছে, যে অনেক বছর আগে তার মা, বোন আর তাকে গ্রামে রেখে উধাও হয়ে যায়।

আকবর এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। সামনে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে সে। আড়ালে বিরাট অপরাধ কারবারের সাথে জড়িত আকবর নির্বাচনের জন্য আপাতত সকল অপরাধ কর্ম থেকে দূরে থাকছে। কোনভাবে নির্বাচনে জিততে পারলেই আবার সবকিছু শুরু করবে সে। এরই মাঝে একদিন নিজের বাড়ির ভেতর থেকে আকবর অপহৃত হয়।

অপহরণকারী তাকে ধরে নেবার সময় তার টেবিলে পুরনো কিছু কাগজ পত্র রেখে যায়। আকবরের পালিত গুন্ডা রাজ তাকে খুঁজতে বের হয়। রাস্তায় সে কিছু ক্লু পায় যেটি ধরে সে আগাতে থাকে। এবং আগাতে আগাতে একসময় সে আকবরকে পেয়েও যায়। কিন্তু অপহরণকারী তাকে আঘাত করে রাস্তায় বেঁধে রেখে আকবরকে নিয়ে আবার পালিয়ে যায়। আকবর বুঝতে পারে তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

কিন্তু, সেখানে সে যেতে চায়না। একবার যেখান থেকে পালিয়ে এসেছে সেখানে সে আর কখনোই যেতে চায়না। তার কাছে শহরের চাকচিক্য আর নিজের ব্যবসাই এখন সবকিছু। আকবরকে নিয়ে একটা চিরপরিচিত গন্তব্যের দিকে যেতে থাকে তার অপহরণকারী। কিন্তু কেন? কি চায় সে আকবরের কাছে? তার উদ্দেশ্য কি? এসব কিছুই আকবর বুঝতে পারেনা। আকবর তাকে শাসায়, পরিণামে তোকে অনেক ভুগতে হবে একদিন!

এভাবেই তৈরি হয়েছে উধাও-এর গল্পটি। পরিচালক অমিত আশরাফ নিজে এর গল্প লিখেছেন আর শব্দ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন কেনেথ এল জনসনকে যার থলেতে আছে দা লাস্ট সামুরাই, রোড টু প্রেডিশন, দা ইতালিয়ান জব, মিশন ইম্পসিবল থ্রি এর মত বিশ্ববিখ্যাত বইয়ের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা। উধাওয়ে প্রতিটি দৃশ্যের সাথে তিনি চমৎকার ভাবে শব্দ গেঁথেছেন। উধাওয়ের সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন জেকব জোফি আর ভিডিও সম্পাদনা করেছেন ডেভিড ডাইপারস্টেইন। বাংলা ভাষা তাদের নেটিভ না হয়েও একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা বইয়ে তারা যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন তার জন্য বাহবা দেই।

আর ভাল অভিনয়ের জন্য বাবু চরিত্রে শাহেদ আলী এবং আকবর চরিত্রে মনির আহমেদের কথা বিশেষ ভাবে বলতে চাই। তারা দুইজনে একসাথে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু উধাও বই এর বাকী চরিত্রদের নিয়ে অমিত সফল হতে পারেন নি। বাবুর বোন নওশাবার চরিত্রটি হাস্যকর লেগেছে। তাকে দেখা যায় রাজের সাথে একবার, রাস্তায় আরেকবার তারপরে শেষে এসে, হাউ কো ইন্সিডেন্স!

এমনকি আকবরের পালিত গুন্ডা রাজ ওরফে অনিমেষ আইচের এমন অদ্ভুত চরিত্রটিও মনঃপূত হয় নি। এদিকে আকবরের প্রেমিকা চরিত্রটি একেবারে অহেতুক ছিল যেন। এই চরিত্রগুলোকে যেন বলে দেওয়া হয়েছিল তোমরা দুধভাত। দুজনকে সহযোগিতা করার জন্য তোমাদের বানানো হয়েছে। উধাও বই এর চরিত্রগুলোর মুখের ভাষাটিও সাবলিল লাগেনি। জোর করে একটা নির্দিষ্ট ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যেন। অমিতকে ভাষা নিয়ে আরেকটু গবেষণা করার প্রয়োজন ছিল মনে হলো।

কিন্তু, সবমিলিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে উধাও একটি অনন্য নির্মান। প্রথম কাজ দেখেই তার উপর ভরসা করা যায় এমন কিছু একটা বানিয়েছেন অমিত আশরাফ। আমরা দর্শকরা আসলে এটিই চাই।

উধাওয়ের পরে অমিতের আরেকটি কাজ ‘কালি’-এর প্রথম এপিসোড দেখে আমি রীতিমত অবাক হয়ে গেছি। বাংলাদেশের প্রথম সুপারহিরো কালিকে নিয়ে অনেক আলোচনা করার আছে। কালির বাকী এপিসোডগুলো দেখার ভীষণ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।