উত্তম-সুচিত্রার অলৌকিক আলাপ এবং পার্থ

অমরাবতীর নন্দনকাননে পারিজাত বৃক্ষের তলায় বসে আছে উত্তম-সুচিত্রা।

উত্তম: আজ বহুদিন পর বায়োস্কোপ স্টাইলে তোমার সঙ্গে বসে রমা। যেন ঠিক নীরেন লাহিড়ীর ‘ইন্দ্রাণী’ ছবির প্লট।

সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক বেশ তো

গোধূলির রঙে হবে এ ধরণী স্বপ্নের দেশ তো।।

তারপরে সারারাত দু’জনেই একা একা ভাববো

হৃদয়ের লিপিকাতে কে যেন লিখেছে এক কাব্য।।

সুচিত্রা: থাক আর এ বয়সে রঙ্গ করতে হবেনা। রাতে মশার কামড় খেও তুমি বসে। মর্ত্যে মশার চটে ডেঙ্গু হয়ে লোকে এখানে ভীড় বাড়াচ্ছে। এখানে হলে কোথায় যাবে নরকে? বহুদিন পর সে আজ অনেকদিন পর একটু বেরোতে ইচ্ছে হল তাই নন্দনকাননে ঘুরতে এলাম। আর দেখলাম তুমি জগিং করছ।

উত্তম: তুমি তো তিরিশ বছর ধরে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে থেকে, সেই অভ্যাস স্বর্গে এসেও ছাড়তে পারলেনা। তাই এখানেও ঘোমটা দিয়ে কি মাথায় স্কার্ফ বেঁধে গোগো পরে কদাচিৎ আসো। বোরখা পরে আসনি ভাগ্যিস মশায় ছেয়ে ফেলত কালো রঙে।

সুচিত্রা: আমার জীবনই আমার সাধনা। কাকে বলে মহানায়িকা, সেটা আমি শুধু সিনেমায় অভিনয় করে বোঝাইনি। আমার প্রতিটি দিন অসাধারণ ভাবে যাপন করে বুঝিয়েছি।আমার দর্শকের কাছে আমার চাহিদা আকাশছোঁয়া, তাই আমার স্যাক্রিফাইসও অতিমানবিক।

উত্তম: থাক থাক আর তক্কে কাজ নেই। তবে আমার মতো নায়ক জুটিও পাওনি সেটাও একটা কারণ।

সুচিত্রা:  সে তো বটেই। বুড়ো (তরুণ কুমার) কে সেকথা বলেও ছিলাম তুমি যাবার পর ও ছবি করবে বলে যখন আমায় অফার দেয়। তবে সঞ্জীব কুমার মোটু, বিকাশদা, দিলীপ মুখার্জ্জী এদের সঙ্গেও ছবি করেছি। হিট হয়েছে।

উত্তম: সেগুলো সুচিত্রা সেন ছিল বলে হিট।

সুচিত্রা: উত্তম তো ছিলনা। তবে ফ্লপ ‘প্রণয় পাশা’ ও করল। পুলু (সৌমিত্র) ভিলেন প্রথম করল। অনেকে ভাবে তুমি চলে যাওয়ায় আমি ছবি ছেড়েছি। কিন্তু আমি তো তুমি যাবার দ ‘বছর আগেই ছবি ছাড়ি। আর আমাদের জুটির ‘প্রিয় বান্ধবী’ চলেনি সেরাম।

উত্তম: আসলে পরিনত চিত্রনাট্য আমাদের বয়স অনুযায়ী তখন হচ্ছিলনা।

সুচিত্রা: ‘নবরাগ’ খুব ম্যাচিউর মুভি ছিল। বিজয় বোসে’র। তারপর সত্যি সেরাম ভালো চিত্রনাট্য পাইনি আমরা। ‘হার মানা হার’ এ আমার তখন পয়তাল্লিশ পার আমায় বেণী বেধ বুকে বই ধরিয়ে কলেজে পড়তে পাঠাল শিবানী বোসের সঙ্গে ডিরেক্টর। নায়িকাদের আসলে বয়স বাড়েনা দেখানো হয়। একটু অন্য ভাবেও তো চিত্রনাট্য ভাবা যেত। তাই মঙ্গল চক্রবর্তীর ‘প্রণয় পাশা’র পর আর কাজ করিনি।

উত্তম: যা করেছ বেশ করেছ তোমার মতো মরার পরেও নায়িকার আসনে এক নম্বরে থাকতে কজন পেরেছে?তোমার কফিন দেখতেও কি ভীড়।

সুচিত্রা: কি করতাম আজকাল মিডিয়ার যা বাড়বাড়ন্ত তাই বলে রেখেছিলাম নয়তো তোমার মতো টানা হিচরে করত আমার এখনকার রূপ দেখবে বলে। একবার সেই স্টার আনন্দ’র সুমন দে যা অতিষ্ট করেছিল। বাড়ির ঝি-দেরও বিশ্বাসী দেখে রাখতাম। তোমার সময় তো সবার হাতে মোবাইলের বাড়বাড়ন্ত ছিলনা।

উত্তম: তা অবিশ্যি মোবাইল কি জিনিস বুঝলামনা। মেট্রো চড়লাম না অথচ আমার নামে মেট্রো স্টেশন। সেদিন মহাশ্বেতা বলল। আরে আমাদের বিজন ভট্টাচার্য্যর বউ।

উত্তম: আজ হঠাৎ বেরোলে মুড ভালো নিশ্চয়?

সুচিত্রা: মমমমম…তা বলতে পারো আমি বালিগঞ্জে থাকতেও লাভার্স লেনে বিকেলে যেতাম মাঝেমধ্যে একটি ক্লাবে। নাতনীদেরও নিয়ে যেতাম। আর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক বন্ধুদেরও। বিকেলের আড্ডা।

উত্তম: হুম বুঝলুম। আরে আরে রমা দেখো ঐ ছেলেটি না ঐ লোকটি সুদর্শন ভদ্রলোকটি চেনাচেনা লাগছে না?

সুচিত্রা: কে কোথায়।

উত্তম: আরে ঐ তো এদিকেই আসছেন। দাড়াও ডাকি ….ও ভাই শুনছেন এই যে মশাই!এদিকে!

জনৈক ভদ্রলোক চমকে তাকালেন উত্তম সুচিত্রার পারিজাত বৃক্ষের তলায়।

উত্তম: আরে পার্থ না?

সুচিত্রা: দাঁড়াও দাঁড়াও এত জলদি ও এখানকার টিকিট পেল?

পার্থ: আরে দাদা ম্যাডাম আপনারা …এসেই আপনাদের দেখে কি ভালো লাগছে। হ্যাঁ সত্তরেই পৃথিবী থেকে ছুটি হয়ে গেল।খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম হাসপাতাল বাড়ি করে।মুক্তি পেলাম সেসবের থেকে।

উত্তম: অসীমা টা একা হয়ে গেল।

পার্থ: ও আমার থেকে পাঁচ বছরের বড় হয়েও আমার আগে ছুটি হয়ে গেল। হ্যাঁ একা হয়ে গেল। ও এলে আগে আমি একা হতাম।

উত্তম: আমার ‘মেমসাহেব’ ছবিতে খুব ভালো সুরে গান বানিয়েছিল অসীমা। বিএফজেতে সেরা ছবির পুরস্কার পায়।

আয় আয় বস। আপনি কি তুই তো আমায় তুমি বলতিস তাই বল। তবে তোমাদের সুচিত্রা সেনের ব্যাপার জানিনা ওকে তো ম্যাডাম আপনি না বললে কুরুক্ষেত্র করবে।

সুচিত্রা: পার্থ আমার ছেলে হয়েছিল বিজয় বোসের ছবি ‘ফরিয়াদ’ এ। সে আমায় তুমি বললে রাগ করব কেন? তবে সাবি বেনু মাধবী দের মতো মার্কামারা মায়ের রোল কোনোদিনই করিনি। কিন্তু আমার মাতৃত্ববোধ কিছু কম ছিল বল পার্থ?

পার্থ: তখন আমায় ম্যাডাম একদিন ওনার বাড়ি নিয়ে গিয়ে পেট পুরে খাইয়ে তবে ছেড়েছিলেন।

উত্তম: তা ওখানকার খবরাখবর বল টালিগঞ্জ পাড়া কেমন চলছে।

পার্থ: এখন স্টুডিও গুলোতে মেগার দাপট আর সব ছবি বিদেশে শ্যুট হয় অনেক টাকা কিন্তু তোমাদের সময়কার মতো আন্তরিকতা পরিবার হয়ে ওঠা সেটা আর নেই।

উত্তম: এ জন্যই রমা আগেভাগে নিজের বাজার ধরে রাখতে লুকিয়ে পড়ে।

সুচিত্রা: উতু তোর কি আমায় সব কথায় না টানলে চলেনা? তুইও বলত চরিত্রাভিনেতার অভিনয়ে ঝুঁকতিসনা। আর প্রথম মেগা তো বেণু (সুপ্রিয়া দেবী) শুরু করল। জননী। সব খবরই রাখতাম তখন। লোকে ভাবে সারাদিন পুজো পাঠ করি।

পার্থ: হ্যাঁ ঠিক বলেছ দুলেন্দ্র ভৌমিকের লেখায় বিষ্ণু পালচৌধুরী আনেন প্রথম মেগা নব্বই দশকে ‘জননী’। আমি বেণু দির মেজ ছেলে হয়েছিলাম। ওটাই বলতে গেলে আমার শেষ জনপ্রিয় কাজ। তার আগে অঞ্জন চৌধুরী’র ‘অভাগিণী’ ছবিটা করেছিলাম। ‘জননী’-তে রীতা কয়রাল আমার বউ হয়েছিল। ঔ তো কদিন এ তল্লাটে এল। দেখা হবে নিশ্চয়।

উত্তম: বেণু তো আপনাদের দাদা এটা খেতে ওটা খেতে ভালোবাসে বলে অনেক রান্নার শো করত সুপারহিট হত। যেগুলো অনেকের মুখে শুনতাম এখানে যারা আসত।

সুচিত্রা: বেণুটা বড় ভালো মেয়ে। লোকে আমাদের প্রতিদ্বন্দী ভাবত।তোর জন্য অনেক করেছে উতু। সে না হয় একটু তোর আদর সোহাগ বলা পাড়াবেড়ানী বেণু। কিন্তু কি আন্তরিক চিরকাল। আর বেণু উত্তম আলোকে আলোকিত নয়। বেনু কিন্তু ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ করেছে। পুলু তো বলেছিল সুচিত্রা সেনের সব ফলস , বেণু ভালো রান্না করে। দেখ আমি মরার পর আমার নামে এটা ওটা বলে কিছু সংবাদ মাধ্যম যদি প্রচার করে ওদের কিন্তু ঐ খবর গুলোয় আমায় নিয়ে আজও হেডলাইন করতে হয়। আর বেণু ভালো জবাব দিয়েছে পুলুকে ‘সৌমিত্র ভালো আবৃত্তি করে’ বলে। হাহাহা…

পার্থ: বেণুদি আমার মাতৃসমা আরেকটি অসাধারন রোল করেন ‘বাঘবন্দী খেলা’য়।রাজেশ বলে বেণুদির সেই ভরাট গলার আবেদনময় ডাক। তবে সৌমিত্রদা এখনও কি অ্যাক্টিভ। সুপার ডুপার হিট বই করছে।

উত্তম: হ্যাঁ পুলুই এখন টলি পাড়ার ছবি বিশ্বাস।

সুচিত্রা: ওর নাতিটা অসুস্থ বেচারি চাপে আছে। লোক মুখে ওখানকার খবর পাই।

উত্তম: তা পার্থ ব্রাদার আমাদের জমানার পর তুই সেভাবে নায়ক হলিনা কেন? ‘ধন্যি মেয়ে’ তে কি ভালো অভিনয় তোর।বগলা তো মারকাটারি হিট হয় নতুন প্রজন্মের কাছে। ‘সব খেলার সেরা ফুটবল’।

পার্থ: ধণ্যি মেয়ে’র সময় উত্তমদা সেসব সোনার দিন ছিল গো। জানেন ম্যাডাম, ঢুলুদার (অরবিন্দ মুখার্জ্জীর ডাক নাম) ধণ্যি মেয়ে’র শ্যুটে আমি আর জয়া বসেই থাকতাম প্রায় দিন গিয়ে আমাদের রোল গুলো অন্য দুজন করত। তারা প্রযোজকের পরিচিত পছন্দের লোক। ঢুলুদাও কিছু বলতে পারতনা। সে কি অদ্ভুত অবস্থা। জয়া আমায় এসে জিজ্ঞেস করছে ‘আমরা কি আদৌ ছবিতে পার্ট করছি বগলা মনসার চরিত্রে’। আমিও বুঝছিনা।আমাদের ডায়লগ অন্য দুজন করে যাচ্ছে।আর আমাদের বসিয়ে রেখে দিয়েছে।আমরা তো ধরেই নিলাম আর আমাদের পার্ট করা হচ্ছেনা এ যাত্রায় বাড়ি যাই। একদিন উত্তমদা সেটে হাজির উত্তমদা সব খেয়াল করলেন এবং ঢুলুদাকে ডেকে বললেন, ‘পার্থ জয়া দুজন যদি বগলা মনসা না করে ছবিতে আমি এ ছবিতে অভিনয় করবনা।’

ব্যস প্রযোজকের মাথায় হাত। প্রযোজক তখন ঢুলুদাকে বললেন পার্থ জয়াই যেন রোল করে।তখন আমরা সুযোগ পেলাম। সেদিন যদি উত্তমদা না প্রতিবাদ করতেন আমি জয়া আজকের আমরা হতামনা। জয়া তো তারপর পরই বোম্বেতে অফার পেল।

উত্তম: তোকে ভাই মানি ব্রাদার বলি এটুকু করা আমার কর্তব্য।

পার্থ: তবে জয়া আজকাল অনেক কথাই বলে শাহেনশা অমিতাভ ঘরণী হয়ে উত্তম কুমারের সমালোচনা করে সুচিত্রা সেন রূপের জোরে করে খায় বলে। কেন যে এগুলো বলে। সেদিন উত্তমদা না সুযোগ দিলে ও আজকের জয়া ভাদুড়ি থেকে জয়া বচ্চন হত।

‘বৌ কথা কয়’ ওর লিপে কি হিট আলোদি (আরতি মুখোপাধ্যায়ের ডাক নাম) গেয়েছিল।

উত্তম: ছাড় ছাড় জুনিয়র ও আমাদের কোন মুডে কি বলেছে।

সুচিত্রা: দেখ পার্থ মাটিতে পা রেখে চলাই উচিৎ। আমি রূপের জোরে করে খেয়েছি বটেই কিন্তু আমার আগে পরে কত সুন্দরী নায়িকা এল তারা কি কেউ আমার জায়গাটা পেল?আমি যদি অভিনয় না পারতাম।এসব ছোটোখাটো পাওয়া না পাওয়ার কথা ধরিস না। আর এখানে এসছিস যখন মুক্ত হয়েই এসছিস। ভরত মহারাজ আমায় বলেছিলেন, ‘মা, লোভ করো না’।

পার্থ: হ্যাঁ উত্তমদা’র প্রশ্নের উত্তরটা দি। আমি শিশু শিল্পী রুপে চিত্ত বসুর ‘মা’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করি রূপোলী পর্দায়।পার্থসারথী থেকে নাম হল পার্থ।এর কয়েক বছর করেছিলাম তপন সিনহার ‘অতিথি’ তারাপদ। জাতীয় পুরস্কার। বিশাল নাম হল। তোমরা তো জানোই। গানটাও খারাপ গাইতাম না।

তপনদার হাটে বাজারে, গল্প হলেও সত্যি থেকে আপনজন অনেক ছবিতে কাজ করি। পাশাপাশি উত্তমদার সঙ্গে অগ্নিশ্বর, ধণ্যি মেয়ে, বাঘ বন্দী খেলা, দুই পুরুষ, সেই চোখ। ম্যাডাম উৎপল দত্তের সঙ্গে ‘ফরিয়াদ’। এরপর তো উত্তমদা তোমার অকাল প্রয়ান হল। ও হ্যাঁ আমায় নায়ক ‘অতিথি’র পর তরুন মজুমদার ‘বালিকা বঁধূ’তে ভেবেছিলেন।

এরপর উত্তম দা তুমি চলে যাওয়ায় ইন্ডাস্ট্রি ভেঙে পড়ে। তখন আমি নায়ক হয়ে কিছু কাজ করি।

উত্তম: যেমন?

পার্থ: মহুয়ার সঙ্গে করলাম ‘শুভ রজনী’। মহুয়া বড্ড তাড়াতাড়ি এখানে পাড়ি দিয়েছিল। দেখা করব। আল্পনা’র সঙ্গে ‘অবশেষে’। অনেক গুলো এখন মনে পড়ছেনা সব।

সুচিত্রা: আল্পনা। খুব ভালো মেয়ে। মুনির (মুনমুন সেন) খুব ভালো বান্ধবী। তপনদার ‘বৈদুর্য্য রহস্য’-এ মুনি আল্পনা একসঙ্গে কাজ করেছিল। আমেরিকায় থাকে।

পার্থ: হ্যাঁ সেসময় আশির দশকের শেষে তরুন বাবু তপন বাবুরা দু-একটা বই করতেন বছরে আর সেরাম উন্নত স্ক্রীপ্ট হচ্ছিলনা। মুনমুন তো বলেইছে ঐসব স্ক্রীপ্টে আমার মা ও ভালো কাজ করতে পারতনা।

সুচিত্রা: খুব ভুল বলেনি মুনি। তোকে কিন্তু তনু বাবু (তরুণ মজুমদার) ‘বালিকা বঁধূ’র পর আর নায়কের রোলে ভাবেননি নেননি। সেটাও একটা কারন।

পার্থ: হ্যাঁ তাপস অয়নদের ছাড়া উনি ছবি করতেন না।

সুচিত্রা: মুনিও কি ভালো রোল পেত বল? আমি ওর সিনেমায় নামা এসব কারনেও চায়নি আর লোকে ওর সঙ্গে আমার তুলনা টানতই। বীরেশ চ্যাটার্জ্জীকে মুনি বলেছিল ‘ভাড়ার ড্রেসের শাড়ি গুলো একটু কাঁচিয়ে আমায় পরতে দেবেন অনুরোধ এটা’। বীরেশ বাবু ওকে সে ছবি থেকে বাদ দিয়ে অন্য নায়িকা নিয়ে নেন।

আর মুনি ওসব ঘরোয়া বউয়ের রোলে অভ্যস্ত ছিলনা। বিদেশী আধুনিকা রোলে ও যতটা সচ্ছন্দ। ও হয়তো আমায় মেয়েদের প্রোটেক্টান দিতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ারটা সেভাবে নিতে পারেনি।

উত্তম: বুঝলে ব্রাদার পার্থ সবই লাক। পার্থপ্রতীম চৌধুরীর ‘রাজবঁধূ’ ছবিতে আমার আর রমার মেয়ের একসঙ্গে কাজ করার কথা ছিল। আমি টসকে গেলাম তার আগেই ব্যস। শেষ অবধি আমার চরিত্রটা উৎপল করল। শ্বশুর বউমার রোল। সব লাক।

সুচিত্রা: ‘রাজবঁধূ’র মুনির বরের রোলটা শমিতকে (শমিত ভঞ্জ) না দিয়ে পার্থকে নিলে অনেক বেশী মানাত আমার মনে হয়। ছায়াদি ভানুদা ছিল।

উত্তম: ছায়াদি ভানুদা থেকে মাধবী সাবিত্রী সৌমিত্র একভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কুণকের (কণিকা মজুমদার) কি খবর?

পার্থ:  আমার ‘অবশেষে’ ছবিতে কণিকাদি একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। তারপর অনেকদিন পর খবর পেয়েছিলাম বৃদ্ধাশ্রমে নিজের শর্তে নিজের মত থাকেন।

উত্তম: আমাদের একসময় অনেক টাকার দরকার ছিল কুণকে খুব করেছিল। বেনুকে পেশাদার মঞ্চে অনেকগুলো কাজ কুণকে করে দিয়েছিল।

সুচিত্রা: ‘হার মানা হার’ এ উতু তোর আর আমার মাঝে কণিকার রোলটা খুব টাফ ছিল। তাইনা বলো।

উত্তম: তোমার এই এক স্বভাব রমা। তুমি কাকে যে কখন তুমি বল আবার তুই বল আবার আপনি বল নিজেই ভুলে যাও।

সুচিত্রা: হাহাহাহা…  সেই ভূবন ভোলানো হাসি।  তবে,      ‘ফরিয়াদ’ এ আমি ক্যাবারে ডান্সার আমার জেদী বখাটে ছেলের রোলে পার্থ তুই অনবদ্য করেছিলি। যে ছেলে মাকে অসম্মান অপমানের হাত থেকে শেষ অবধি বাঁচায়। উৎপলদার পেটে তোর সেই ছুরি মারার সিন! সেই ‘এ ছুরি জানে ভানুমতী খেল’। মুনি আমার ক্যাবারে ড্রেস গুলো ডিজাইন করেছিল। হাসান জামান ভাইয়ের মেক আপ।

পার্থ: তোমার সেই ছবির শেষে আমায় জড়িয়ে ডায়লগ ‘আমার বুকভরা বিষ আজ অমৃত হয়ে গেছে’।

সুচিত্রা: ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।

পার্থ: আর তোমার মনে আছে ‘ফরিয়াদ’ এ আমার গার্লফ্রেন্ড দেবিকা। যে পরে অঞ্জন চৌধুরীর ‘ছোটো বউ’ হয়ে নাম করল। ফরিয়াদ ওর শিশুশিল্পী রূপে প্রথম ছবি।

সুচিত্রা: হ্যাঁ আর চন্দ্রাদি ও খুব ভালো করেছিলেন (চন্দ্রাবতী দেবী)। আমি সিনেমা ছাড়ার পর প্রভাত রায় ভবেশ কুন্ডু অঞ্জন চৌধুরী অনেকেই আমায় ছবিতে অফার দেয়। যেমন ‘প্রতীক’ এ গুলজারের বউ রাখীর ঐ মা’র রোলটা কি করে করতাম বল। ওসব বাসনমাজা ঘর মোছার রোল। আবার ‘নাটের গুরু’ মৌসুমীর রোলটাও করতে মন চায়নি। রঞ্জিতের (কোয়েল মল্লিক) মেয়ের অভিষেক সিনেমা।

এক চিত্রনাট্যকার তো আমায় স্ক্রিপ্ট শোনাতে এসে চিত্রনাট্য পড়তে পড়তে আমার মুখে সিগারেটের ধোওয়া ছেড়ে দেন। জাস্ট বার করে দি তাকে। উতু তুই আগেভাগে মরে গিয়ে বেঁচে গেছিস তাই তুই আজও মহানায়ক। আমি এসব কারণে আর ছবি সাইন করতামনা।

উত্তম: তা সত্যি। চল চল পার্থ চল তোকে কোন পাড়ায় থাকতে দিল চল দেখি।যখন এসে পড়েছিস আর কোনো চিন্তা নেই তোর পেরেন্টস আমরা তোর সাথে রয়েছি।

সুচিত্রা সহমত।

উত্তম: কী গো রাজনন্দিনী তুমি কি আমাদের সঙ্গে যাবে রমা?

সুচিত্রা: চিৎকার করে বললেন, ‘প্লিজ স্টপ। আই সে, স্টপ প্লিজ। ডোন্ট ট্রল মি উতু। কেন যাবনা পার্থ প্রথম এসছে চল ওর সঙ্গে কাননদি ছায়াদি চন্দ্রাদি রাজলক্ষীদি ছবিদা পাহাড়ীদা রবি জহর ভানুদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দি।

উত্তম: বেশ চল চল। পার্থ আয়।

পার্থ: হ্যাঁ চলো এবার ওঠা যাক।চলো চলো।

 ____________

লেখাটি কাল্পনিক, ভাবনাটি অবাস্তব। স্মৃতিচারণামূলক লেখা। যা বলা হয়েছে তার কোনো কিছুই মিথ্যে নয়, এক বিন্দুও অতিরঞ্জন নেই। পুরোটাই বাস্তবতাকে পুঁজি করে লেখা। 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।