উত্তম কুমারের পরেই যার স্থান

টালিগঞ্জের ইতিহাসে উত্তম কুমারের চেয়ে জনপ্রিয় নায়ক আর হয়ত আসেননি, তবে উত্তম কুমারের পর তার থেকে একটু কম হলেও কিছু জনপ্রিয় নায়ক যুগে যুগে এসেছেন। কিন্ত কে কতদিন ইন্ড্রাস্টিতে টিকে থেকেনে এমন লিস্ট করলে হয়ত সুপারস্টার লিস্টের নামগুলোও অনেকটা কমে যাবে।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, বুম্বাদা নামেই যিনি বেশি পরিচিত তিনি ৩৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে সফলতার সাথে টালিগঞ্জে আছেন। এটা আসলেই টালিগঞ্জের ইতিহাসে একটা বড় অধ্যায়। বাঙালি অভিনেতাদের প্রধান চরিত্রে টিকে থেকে টানা ৩৪ বছর অভিনয় জীবনের ব্যপ্তি ঘটানোর অসাধ্য কাজটিকে বাস্তবায়ন করতে তাকে কম সংগ্রাম করতে হয়নি।

মহানায়ক উত্তম কুমারের পর টালিগঞ্জে আর কেউই তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেননি। একে একে ফ্লপ সিনেমায় ব্যবসায় যখন লালবাতি জ্বলে যাওয়ার মত অবস্থা তখন চিরঞ্জিত ও তাপশ পাল আশার আলো জাগালেও তাদের সুপারস্টারডম বেশি একটা দীর্ঘায়ীত হয়নি।

প্রসেনজিতের অভিষেক কলকাতার বাংলা সিনেমার এই আকাল যুগেই। পড়াশোনা করার সময় ই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কাজে তার সরব উপস্থিতি ছিল। মঞ্চ, টেলিভিশন ও রেডিও নাটক করে এসে সিনেমায় নামেন। চিরঞ্জিত আর তাপশ পালের যুগের অবসানের পর একা হাতে চালিয়েছেন টালিগঞ্জের চাকা। টানা ১২-১৫ বছর অর্থাৎ বর্তমান প্রজন্ম আসার আগের যুগ তিনিই চালিয়েছেন।

শুধু কমার্শিয়াল সিনেমা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাননি সাথে সাথে করেছেন একাধিক আর্ট ফিল্ম। ৯০ এর দশকে টানা ২৫ টা সাইনিং করা বছরো গিয়েছে তার। নিরলস পরিশ্রম আর গুনের মাধ্যমে ৩০ বছরেরো বেশি ক্যারিয়ারে ৩০০+ সিনেমায় অংশগ্রহণ করেছেন। এত কিছুর পরেও কোন সুপারস্টার, মেগাস্টার উপাধি নেননি।

এই বয়সেও করেছেন একের পর এক মানসম্মত সিনেমা। তার ফ্লপ সিনেমা লিস্টের বহর অনেক সমালোচক সামনে আনেন, তাদের জানাই ৩০০+ সিনেমা যে কেউ করলে এর চেয়ে কম নয় বরং দ্বিগুন ফ্লপ আসলেও আসতে পারত। উনি না থাকলে হয়ত সেই আমলে কলকাতার সিনেমা বাচত না।

যারা তার পুরোনো সেকেলে কমার্শিয়াল দেখে হাসিতে ফেটে পড়েন তাদের জানানোর জন্য বলি উনি আর্ট ফিল্ম দিয়ে হল বাচাতে পারতেন না। আজ যখন জিৎ-দেব-সোহমরা কমার্শিয়াল এর দ্বায় ঘাড়ে নিল, তখন মধ্যবয়সী চিরসবুজ অভিনেতা নিজের রুচিবোধ, বয়সের হিসাব, আর ভারসেটাইলিটির পরিচয় ও দিয়ে আসছে অটোগ্রাফ (২০১০) পরবর্তী সময় থেকে।

শুধু ৯০ এর দশকেও নয় এভারগ্রীন এই অভিনেতা বর্তমান সুপারস্টারদের সাথে পাল্লা দিয়ে বক্স অফিস কালেকশন দিয়ে যাচ্ছে। এইতো ২০১৬ সালেও ‘প্রাক্তন’ সিনেমা বছরের সর্বোচ্চ আয় ও অল সর্বকালের সবচেয়ে আয় করা সিনেমার মধ্যে তিন নম্বরে চলে গেছে। সিনেমাটির মোট ৮ কোটি ভারতীয় রুপি।

এছাড়া তার ‘মিশর রহস্য’ সিনেমাটিও তালিকায় ৭.২৫ কোটি নিয়ে অবস্থান করছে। এইতো পূজায় ইয়েতি অভিযান আর ককপিটের ক্লাশে ব্যাপক ব্যবধানে জিতছেন, ইতোমধ্যে এক সপ্তাহে ২.৫ কোটি কালেকশন নিয়ে এ বছরের বড় হিটের তালিকায় এসে গেছে। বড় কথা প্রাক্তন, ইয়েতি অভিযান কিম্বা মিশর রহস্যে ধুম ধারাক্কা একশন কিম্বা রোমান্স প্যাকেজ ছিল না, তবুও এ ধরনের ফিল্মে সফলতার মুখ দেখানো চাট্টিখানি কথা নয়।

বুম্বাদা জন্মেছেন ১৯৬২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। সেই হিসেবে একদিন আগেই তিনি ৫৪ বছর বয়সে পা রেখেছেন। আশা করি সাফল্যর সাথে, এই ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি ৫০ বছর ছুয়ে যাবে।

প্রসেনজিৎ সম্পর্কে কয়েকটা ব্যাপার না জানলেই নয়। এক সময় তার সিগারেট আর মদের অভ্যাস থাকলেও ২০০৯ সালে সিগারেট ছাড়েন। কিন্ত তার সিনেমা ‘ক্ষত(২০১৬)’ শুটিংয়ের সময় চরিত্রের প্রয়োজনে ব্যাপক সিগারেট টেনেছেন।

সিনেমায় আসার আগে তিনি ছোট পর্দায় ও রেডিও নাটকে কাজ করেন। ৩০+ বছরের ক্যারিয়ারে ৩০০+ সিনেমা করেছেন। ১৯৯৪ সালে তিনি ‘জি বাংলা’ চ্যানেলের উদ্বোধন করেছিলেন। ২০০৪ সালে টালিগঞ্জ সিনেমার ইতিহাসে রেকর্ড করে ২২ টি সিনেমা করেন।

বর্তমান বলিউডের স্টার অমিতাভ বচ্চন, জুহি চাওলা, রাণী মুখার্জি, মনিশা কৈরালা, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, বিপাশা বসুর সাথেও তিনি স্ক্রিন শেয়ার করেছেন। এছাড়া একাধিক বলিউড ফিল্মেও কাজ করেছেন। তিনি নিজের নামের পূর্বে মেগাস্টার, সুপারস্টার, সুপার হিরো ইত্যাদি টাইটেল লাগানো একদমই পছন্দ করেন না।

বাঙালি অভিনেতা হয়েও ভারত থেকে কান উৎসবে তার লাল গালিচা পাড়ানোর সুযোগ হয়েছে। উল্লেখ্য চোখের বালি সিনেমার জন্য তিনি এ সুযোগ পান। প্রতি সিনেমায় ভিন্ন লুক আর ভিন্ন চরিত্রে তার চেষ্টাটা প্রশংসনীয়। তার সিনেমা ‘সংঘর্ষ’ এর জন্য তিনি সাতটি ভিন্ন লুকে হাজির হয়েছিলেন।

তার জাতীয় পুরষ্কার পাওয়া সিনেমায় ‘কুশল হাজরা’ চরিত্রটি করতে ১০ সপ্তাহে প্রায় ৩০ কেজি কমিয়েছিলেন। এতে উনি এতটাই রোগা হয়ে গিয়েছিলেন যে রাস্তা দিয়ে হাটলেও লোকে তাকে চিনতে পারত না। এই ফিল্মের জন্য তিনি তার মাথার চুলের কিছু অংশ কামিয়েছিলেন। এতটাই রোগা হওয়ায় প্রায় মরতে বসেছিলেন।

এছাড়া শংখচীল(২০১৬) সিনেমার জন্য নিজের ১৫ কেজি কমিয়ে এক স্কুল শিক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করেন। মনের মানুষ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য চরিত্রে ঢুকতে তিনি ঘর বাড়ি ছেড়ে দরজা বন্ধ করে কুড়ে ঘরে শুয়েছেন, শাখ সবজি খেয়ে পথের ভিখারীদের সাথে থেকেছেন। এবং সম্প্রতি তিনি কোন ধরনের ওষুধ গ্রহন ছাড়ায় এই বয়সে প্রাকৃতিকভাবে ‘সিক্স প্যাক’ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এছাড়া টালিগঞ্জে তার মত খাদ্যাভাস সচেতন অভিনেতা খুব একটা নেই বললেই চলে। এতটা অধ্যাবসায়ী ও পরিশ্রমী অভিনেতা টালিগঞ্জে খুব একটা নেই বললেই চলে।

তিনি ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার আর্টিস্ট ফোরাম’-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং প্রাক্তন জেনারেল সেক্রেটারি। এছাড়া তার নিজের ‘আইডিয়াস ক্রিয়েশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

তিনি ইউনিসেফের ‘চাইল্ড সারভাইভাল’-এর অ্যাডভোকেট হিসেবে কর্মরত। বুম্বাদা ১২ বছর বয়সে ড্রাম বাজানো শিখেছিলেন। তার একটা ব্যান্ড দল ছিল যার নাম ‘তুফান মেলোডি’। তার ওপর নির্মিত ডকুমেন্টারির নাম ‘সিনেমা অনলি’।

তিনি গ্রিন টি ও ব্ল্যাক কফি খেতে খুব ভালবাসেন। মেকাপ আর্টিস্ট সুবাশ বেরা তার সাথে ২০ বছর ধরে একত্রে কাজ করছেন। মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনীত দুই পৃথিবী(১৯৭০) সিনেমায় তিনি উত্তম কুমারের শিশুকালের চরিত্রে কাজ করেন।

তার সবচেয়ে বড় ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘সঙ্গী (১৯৮৭)’ সিনেমা হলে ৫২৫ দিন চলার রেকর্ড গড়েছিল। সেটা এখনো ভাঙেনি। শতাব্দী রায়, ঋতুপর্ণ সেনগুপ্ত ও ইন্দ্রাণী হালদারের সাথেও তিনি সফল জুটি উপহার দিয়েছেন। ঋতুপর্ণ ও শতাব্দী – প্রত্যেকের সাথে ৫০ টির বেশি সিনেমা উপহার দিয়েছেন। ১৬ টি সিনেমা ইন্দ্রাণী হালদার ও ৩৫ টি সিনেমা রচনা বন্দোপাধ্যায়ের সাথে উপহার দিয়েছেন।

তিনি ‘গান পাড়ার পূজো’ নামক একটি অ্যালবামে গান গেয়েছেন গানটির নাম ‘আজ আধার তালে তালে’। তিনি ডিরেক্টর কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ক্ষত(২০১৬)’ সিনেমায় প্রথম সজ্জাদৃশ্যে অভিনয় করেন।

তিনি জীবনে একাধিক সিনেমা ও সিরিজে বায়োপিক বা বায়োক্যারেক্টারে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছেন। যেমন – উত্তম কুমার, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, লালন শাহ ইত্যাদি। ‘পুরুলিয়া প্যান্থারস’ – সেলেব্রিটি ক্রিকেট লিগে এই দলটির মালিক তিনি।

তিনি ‘মানান’ নামের একটি এনজিও’র সাথে জড়িত। তিনি তার জন্মদিন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাথে কাটান। অমিতাভ বচ্চন তার ‘ওয়ান (২০১৭)’ ও ‘ইয়েতি অভিযান (২০১৭)’ এর ট্রেইলার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন এবং তাকে ‘সুপারস্টার অফ বেঙ্গল’ বলে উল্লেখ করেন।

তার প্রতি ভালবাসা আর শ্রদ্ধার জায়গাটা আজীবন রয়ে যাবে। মনের ক্যানভাসে বাইশে শ্রাবন, জাতিশ্বর, অটোগ্রাফ, কাকাবাবু, মনের মানুষ, ক্ষত, জুলফিকার, প্রাক্তন, চলো পাল্টাই, ট্রাফিক, উৎসব, লড়াই, শংখচীল, উনিশে এপ্রিল, দেবদাস ইত্যাদি কালজয়ী স্মৃতি হয়ে থাকবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।