উত্তমের সংসার, উত্তম সংসার

বাঙালির চিরপরিচিত মহানায়ক উত্তম বরাবরই সবার কাছে ছিলেন আপনজন। বাঙালির বাঙালিয়ানার ষোলো আনার দাবিদার উত্তমকুমার। কখনো রোমান্টিক, কখনো বদমেজাজি, কখনো মেজাজি। বাঙালি জীবনের এমন কোনো চরিত্রচিত্রণ নেই, যেখানে আমরা উত্তম কুমারকে পাইনি।

পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির এই মানুষটি কখনো ধুতি, কখনো ট্রাউজার, কখনো স্যুট, কখনো পাঞ্জাবি আবার কখনো বা গ্রামবাংলার আটপৌরে রূপে যেন বহুরূপী। অরুণ কুমার চ্যাটার্জি থেকে জীবন-সংগ্রামে ক্রমাগত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে উত্তম কুমার হন তিনি। যে সংগ্রামে স্ত্রী গৌরী দেবী ছিলেন অন্যতম কাণ্ডারি।

যদিও কোনো কারণে তাঁদের সংসার একটা সময় টেকেনি। আবার বিচ্ছেদও হয়নি। একটা সময় উত্তম নায়িকা সুপ্রিয়ার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উত্তম সুপ্রিয়ার সাথে ১৭ টি বছর ঘর করেছেন। উত্তমের আগের ঘরে গৌতম নামে তার একটি ছেলে ছিল তেমনি সুপ্রিয়ারও আগের ঘরে সোমা নামে তার একটি মেয়ে ছিল।

উত্তম-সুপ্রিয়ার কোন নিজ সন্তানাদি ছিল না। উত্তমের সাথে গৌরি দেবীর সংসার না টিকলেও তাদের মাঝে যোগাযোগ ছিল। সাংসারিক দায়বদ্ধতা থেকে মহানায়ক নিজেকে গুটিয়ে নেননি। তিনি যেমন গৌরি দেবী, তার ছেলে গৌতমের ভরন পোষণ করতেন। তেমনি সুপ্রিয়ার মেয়ে সোমাকেও নিজের মেয়ে হিসেবে দেখতেন। গৌতম এবং সোমা দুই জনকেই নিজ হাতে বিয়ে দিয়েছেন।

ছেলে গৌতমের বিয়েতে উত্তমের সাথে গৌরী দেবী এবং নায়িকা সুচিত্রা সেন।

উত্তম কুমারকে ‘বণিক’ বলে ডাকতেন তাঁর স্ত্রী গৌরী দেবী। বণিক কেন? মনে হয়, উত্তম কুমারের বাণিজ্য ভাবনা থেকেই এই নামের উৎপত্তি। সিনেমাটাকে ঘিরে ব্যবসা করার কথা ক্রমেই মাথায় চড়ছিল উত্তমের। গৌরী জানতেন, উত্তম কুমারের পক্ষে আর যা করাই সম্ভব হোক না কেন, জমিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। উত্তম কুমারের মানসিকতাতেই তা খাপ খাবে না। তাই মনে হয়, খানিকটা ঠাট্টার ছলেই ‘বণিক’ নামটি এসেছে।

উত্তম কুমার আবার গৌরী দেবীকে আদর করে গজু বলে ডাকতেন। আসলে গৌরী দেবী ক্রমে মোটা হচ্ছিলেন। আর সেখান থেকেই গজু নামটা এসেছে বলে মনে হয়। তবে ব্যাপারটা বেশ স্পষ্ট হয়ে যায় ১২ অক্টোবর ১৯৭১ সালে। ভারতের এলাহাবাদ থেকে গৌরী লিখে ব্রাকেট দিয়ে লিখেছেন ‘হাতি মেরে সাথী’। উত্তম কুমারের লেখা সেই চিঠিটাই একবার দেখে নেওয়া যাক। এই চিঠি দেখলেই উত্তমের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটু ধারনা পাওয়া যায় এবং তিনি যে রসিক তাও জানা যায়।

সুপ্রিয়ার মেয়ে সোমার বিয়েতে উত্তম কুমার।

অনলাইন ঘেঁটে দুটো চিঠি পেয়েছি। প্রথমটা ৭১ সালের।

গৌরী (হাতি মেরে সাথী)

পুজো কেমন কাটালে? গলা ধরেনি? গৌতম কেমন আছে?

কাশী থেকে ফেরার সময় আর ফোন করে উঠতে পারলাম না। যাই হোক, ওপারের ঠিকানায় আছি। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। বাংলোটাও বেশ আধুনিক। কেবল টেলিফোন নেই। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের আজ আসবার কথা। শুটিং আরম্ভ হওয়ার কথা ১৫ অক্টোবর। ২৫ তারিখের আগে যদি হয়ে যায়, তাহলে কলকাতায় ফিরে যাবো। আর বাইরে ঘুরতে ভালো লাগছে না।

তোমার শরীর ভালো আছে তো? আমার জন্য চিন্তা করো না। আমি ভালো আছি। মজুমদার হয়তো অক্টোবর মাসের দরুন তিন হাজার টাকা দেবে। ওটার সঙ্গে আলিপুর ও ভবানীপুর বাড়ির ভাড়া যোগ করলে ছয় হাজার টাকা হয়। চালিয়ে নিও। বাকি বকেয়া যা আছে, ফিরে গিয়ে হিসাব করবো। পাড়ায় কোনো গোলমাল নেই তো? তোমার মা আছেন, না চলে গেছেন? যদি থাকেন, আমার বিজয়ার প্রণাম জানিও।

খোকা, ছুটকি ওরা কেমন আছে? জামাই আর তৃণা কি আসে? জামাইয়ের চাকরি কি হলো? ভালো থেকো। ফিরে গিয়ে আলাপ, প্রলাপ সব হবে। আসি?

ভালোবাসা জেনো। গৌতমকে আমার শুভেচ্ছা ও প্রীতি জানিও।

ইতি

উত্তম (বণিক)

নাতনি মানে সৎ মেয়ে সোমার মেয়ের জন্মদিনে উত্তম কুমার।

দ্বিতীয়টা নায়ক জীবনের শুরুর সময়ের চিঠি যখন তিনি সিনেমা জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছেন কষ্ট করে। তার সংগ্রামী সময়ের কিছুটা আঁচ করতে পারবেন নিচের চিঠিটা পড়লে।
বোম্বে থেকে সেই সময়ে গৌরী দেবীকে লেখা উত্তমের সেই চিঠি।

প্রিয় গৌরী (গজু)

মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। ভেবেছিলাম যে বোম্বে, মাদ্রাজকে কেন্দ্র করে কলকাতার অর্ধকৃত ছবিগুলো শেষ করব। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ল, যখন জানতে পারলাম যে ওরা কেউই কলকাতা ছেড়ে আসতে রাজি নয়। আরো হতাশ হয়ে পড়লাম যখন দেবেশ খবর দিলেন যে, প্রোডিউসাররা এর পরের মাস থেকে আর টাকা দিতেও রাজি নয়, যদি আমি কলকাতায় ফিরে না যাই।

দুটো ঘরওয়ালা একটা ফ্ল্যাটও দেখেছিলাম তোমাকে এনে রাখবো বলে। কিন্তু টাকাই যদি না আসে, কার ভরসায় আমি ফ্ল্যাট নেব? আর আমিই বা না খেয়ে কত দিন এখানে পড়ে থাকবো? নানা রকমের ভাবনা ছেঁকে ধরেছে। কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না। এও ভেবেছিলাম যে, শক্ত সামন্ত হয়তো কিছু করলেও করতে পারে। সে বিষয়ে ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। কিন্তু এমনটাই ভাগ্য দেখো যে শক্তি সামন্তও ঠিক সেই সময়ে পড়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো। কোনো দিক দিয়ে কোনো আশা-ভরসা পাচ্ছি না।

দেবেশ দয়া করে ওর যে ফ্ল্যাটে থাকতে দিয়েছে, সেটাও ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে। কেননা, রঞ্জনা পুজোর ছুটিতে এখানে থাকবে। অগত্যা আপাতত আলোর ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর খুঁজে পাচ্ছি না। অসীমকে পাঠিয়েছিলাম। অসম্ভব খরচা বাড়িয়ে লাভ কী? অসীমের কাছে আমার ফুরাবস্থার কথা সব জানতে পারবে। নীতাদিকে জিজ্ঞেস করে আমাকে যতো শীঘ্রি পারো জানাবে যে, ওখানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কোন সময়টা প্রশস্ত। তাহলে যতো শীঘ্রই পারি আমি এখান থেকে ফিরে যাবো। এখানে আর একেবারে ভালো লাগছে না।

তুমি চারতলা বাড়ির ভাড়াটা ও আলিপুরের বাড়ির ভাড়াটা নিয়ে কোনোরকমে যদি চালিয়ে দাও, আমার মনের এবং শরীরের ভীষণ উপকার হবে। মায়ের টাকা ও আমার এখানকার শুধু খাওয়ার টাকাটা অসীম ওখান থেকে যা হোক করে বলেছে পাঠিয়ে দেবে। তারপর জানি না কী হবে? সবাই চোখের সামনে এক রকম। আর চোখ ফেরালেই অন্য রকম।

উত্তম ও সুপ্রিয়া

এর ওপর তুমি যদি এখানে আসার ও থাকার বায়না করো, তাহলে ভীষণ ক্ষতি। কেননা, এখানে ফ্ল্যাট নিতে গেলে কমপক্ষে ৬০০ টাকা জমা দিতে হবে। ছবির এখানে চেষ্টা করছি। কাজের চেষ্টা চলছে। যদি একখানা বাংলা ছবিও এখানে করতে পারি, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি, নিশ্চয়ই এখানে নিয়ে আসবো। তবে কাজ কিছু না হলে বা পেলে আমাকে ফিরে যেতেই হবে।

গৌতমের জন্মদিন বেশ ভালোই কেটেছে। ওরা এখানে খুব ঘুরে বেড়িয়েছে। তুমি একেবারে মন খারাপ করো না। সময় যখন খারাপ পড়ে, তখন মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করতে হয়। আমি জানি, এই চিঠি পড়ে তোমার খুব মন খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু উপায় একটা কিছু না বের করলে কী করে কী হবে বলো? দু’একটা বাংলা ছবি এখান থেকে হওয়ার কথা যে হচ্ছে না, এমনও নয়, হচ্ছে।

তবে যতোক্ষণ কাগজপত্রে সই-সাবুদ না হচ্ছে, বিশ্বাস কী বলো? তুমি একদম মন খারাপ করো না। এই সময় তুমি মন খারাপ করলে শরীরের দিক থেকে আমাদের দু’জনেরই ক্ষতি। আমার জন্য অনেক কষ্টই তো সহ্য করলে, আর এই কটা দিন একটু সহ্য করো। মায়ের খবরাখবর করো। আর বুড়ো আতঙ্কের বোঝা না বাড়িয়ে আমার যেন একটু খবরাখবর করে। সপ্তাহে যেন একখানা করেও চিঠি দিও।

ইতি
উত্তম (বণিক)

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।