ঈদ হোক সকলের

১.

‘কুরবানির ঈদ’ আমাদের জন্য সবসময়ই একটা আনন্দের উপলক্ষ্য ছিল। আমাদের ফ্যামিলি ছিল টিপিকাল বাঙালিদের মতো। সারা বছর ঢাকা থাকলেও ঈদের সময় গ্রামে চলে যেতাম। সেই গ্রামে যাওয়াটাও বিশাল আয়োজনের মতো ছিল।

সেই আমলে আমাদের গ্রামে হাতে গোনা ৮/১০ টা পরিবার কুরবানি দিত। সেই হাতে গোনা পরিবারগুলোর মাঝে আমাদের পরিবারও ছিল। সেই ছোট বয়সে বুঝেছিলাম যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম তাদের উপর কুরবানি প্রয়োজনীয় নয়।

হুট করে একবার এক কুরবানির সময় দেখলাম আমার এক দুঃসম্পর্কের মামা আবার বাবার কাছে টাকা ধার চাচ্ছে। তার টাকা পয়সার নাকি সমস্যা চলছে, আবার কুরবানী না দিলেই নয়। আমার মাথায় আসলো না, টাকা না থাকলে কুরবানী দেওয়াটা তো অত্যাবশ্যকীয় না। তাছাড়া যতদূর জানতাম ধার করে কুরবানী দেওয়া যায় না।

সেই কথা মামাকে বলার পর কঠিন এক ধমক খেলাম। কিছু না বুঝলেও তখন চুপ করে থাকাটাই উচিত মনে করলাম। সেই বয়সে নিশ্চুপ থাকলেও এক সময় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারলাম যে সমস্যাটা কি ছিল।

আমি চাকুরি করি ২০০৫ সাল থেকে। তবে আমার চাকুরির টাকার উপর আমার পরিবার কখনো নির্ভরশীল ছিল না। ফ্যামিলি মেইনটেন বিষয়টা তাই আমার ভেতর সেভাবে গড়ে উঠে নি। টাকা পয়সা যাই পেতাম সেটার কিছু অংশ হয়তো বাসায় দিতাম।

দায়িত্ব বিষয়টা সর্বপ্রথম অনুভব করলাম আমার বাবা মারা যাবার পর। চারদিকে এত চাপ, হাপিয়ে উঠছিলাম। কিছু টাকা পয়সার সমস্যাও হচ্ছিল। এই অবস্থায় যখন কুরবানী ঈদের সময় আসলো তখন হাতে টাকা পয়সার অনেক টানা টানি। কিছু ধার কর্যও আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম এবার কুরবানি দিব না। বাসায় আমার মা বোনেরাও বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই নিল।

কিন্তু বাধ সাধলো অন্যেরা। আত্মীয়দের মাঝে খুব কাছের একজন আমাকে ডেকে নিয়ে কয়েকটা কথা বুঝালো। শোনার পর বুঝতে পারলাম কথাগুলো একেবারে অযৌক্তিকও নয়।

আমার বাবা গত ২৫ বছর ধরে কুরবানি দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি মারা যাবার পর এবারই আমার প্রথম ঈদ। আর এবারই আমি কুরবানি না দিলে স্বাভাবিক ভাবেই আশেপাশের মানুষ ভাববে যে বাবা মারা যাবার পর আমাদের ফ্যামিলি একেবারে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় পড়ে গিয়েছে। তাই খুব বেশী সমস্যা না হলে কিছুটা কষ্ট হলেও ছোট খাটো একটা কুরবানি দেওয়া উচিত।

অকারণে মানুষের কথাকে আমি খুব বেশী মূল্য দেই না। তবে সেই আত্মীয়ের একটা কথা আমার সঠিক মনে হলো। সামাজিক জীব হওয়ার কারণে সবসময় নিজের মন মতো চললে হয় না। আমি মানুষের কথাকে মূল্য না দিলেও সেওসব কথা শুনে আমার মায়ের খারাপ লাগতে পারে। তার মনে হয়তো আসতে পারে যে আমার বাবা থাকলে এরকম ঘটনা ঘটতো না।

আমি ছোট বেলা থেকে আমার মায়ের কাছে কোন জিনিস চেয়ে পাব না এরকম ঘটনা ঘটে নি। আমার জীবনেও একটা টার্গেট আছে যে পারতপক্ষে আমার মায়ের কোন চাওয়া আমি অপূর্ণ রাখবো না।

সেই বছর কিছুটা কষ্ট করে কুরবানিটা দিলাম। আমার মনে হয় ‘গরু’ জবাই দেওয়াটা কুরবানি ছিল না, অন্যান্য দিকে ম্যানেজ করতে যে কষ্টটা হয়েছিল সেটাই ছিল আসল কুরবানী। আল্লাহর রহমতে পরবর্তী সময়ে আর কুরবানী দিতে সমস্যা হয় নি।

আজ এতদিন পর এসে মনে হচ্ছে সেই আত্মীয়ের কথাটা সত্য ছিল।

২.

কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য আসলে কি?

বর্তমানে ‘কুরবানি’ ধর্মীয় অনুশাসনের সীমানা ছাড়িয়ে সংষ্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বেশির ভাগ মানুষই কুরবানি দেয় স্ট্যাটাস রক্ষার জন্য। কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ত্যাগের মহিমা বুঝা। তার মানে প্রথমে আমাদেরকে বুঝতে হবে ত্যাগ জিনিসটা কি?

কুরবানি হচ্ছে সেই জিনিস যা করতে গেলে নিজের কিছুটা কষ্ট স্বীকার করতে হয়।

ভিন্ন প্রসঙ্গে একটা কথা বলি।

কিংবদন্তী বক্সার মোহাম্মদ আলীকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তিনি প্রতিদিন কয়টা বুক ডন দেন?

উত্তরে আলী বলেছিলেন, ‘আমি যখন বুক ডন দেওয়া শুরু করি তখন কাউন্ট করি না, দিতেই থাকি। একটা পর্যায়ে শরীর ব্যথা করতে থাকে। তখন থেকে কাউন্ট করা শুরু করি।’

বিষয়টা এটাই। আপনার সহ্য ক্ষমতার কতটা পর পর্যন্ত আমি সহ্য করেছেন সেটাই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

প্রতিটা মানুষের সহ্য শক্তি একরকম নয়। প্রতিটা মানুষের ক্ষমতাও এক নয়। আপনি হয়তো ৫০ কেজি ওজন বহন করতে পারেন। আরেকজন হয়তো ২৫ কেজি পারে। তার মানে আপনি ৫২ কেজি ওজন বহন করেও যে কষ্ট পাচ্ছেন আরেকজন মানুষ ৩৫ কেজি বহন করেই তার চেয়ে বেশি কষ্ট করতে পারেন।

কে কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেটা নির্ণয় করবেন আমাদের উপরওয়ালা। সেখানেই নির্ধারিত হবে কার কুরবানি কতটা সঠিক হয়েছে।

৩.

অফিস থেকে বাড়ি যাচ্ছি। আমার মতো অনেকেই বাড়ি যাচ্ছে। সবাই যেন সুস্থ ভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে সেই কামনা করি। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।