ঈদের জামা || ছোটগল্প

মহিম পাড়াতলি গ্রামের দরিদ্র কৃষক। নিজের তেমন কোনো জমি-জমা নাই। অন্যের কিছু জমিতে চাষ করে জীবন চালায়। সামনে কুরবানির ঈদ। ছেলে মেয়ে নতুন জামার আবদার করেছে। বাবা বাবা নতুন জামা লাগবে? মহিম বাবু কি বলবেন ঠিক করে উঠতে পারছেনা। ছোট মেয়েটাকে কোলে নিয়ে একটা চুমু খায়। বলে, ‘মা নিশ্চয়ই ঈদে জামা নিয়া আসবো।’

পিছন থেকে ছেলেটা বলে উঠে, ‘বাবা আমার জন্যে নিয়া আসবা না?’ – ‘হুম! বাবা তোমার জন্যেও নিয়া আসবো।’ কি মজা মজা বাবা নতুন জামা নিয়ে আসবে বলে দুটো ছেলে মেয়ে লাফাতে শুরু করলো। মহিম বাবু কাছে এখন সামনে একটাই পথ ছেলে মেয়ের নতুন জামা। কিন্তু কারো চাইতে মহিম বাবুর লজ্জা লাগে।

মহিমের কাছে বিক্রি করার মতো কিছু নাই। যে কিছু বিক্রি করে জামা নিয়ে আসবে। চোখেমুখে অন্ধকার। আর মাত্র দু’দিন বাকি ঈদের। মাথাটা নিচু করে বললেন বউ এখন কি করি? হাতের পানির গ্লাসটা রেখে দিয়েছে মহিম বাবুর স্ত্রী রাবেয়া। রাবেয়ার কিছু বলার থাকতে পারেনা। কোনো বুদ্ধিও দিতে পারেনা। মহিম বাবুর কথা তার কাছে তেমন প্রয়োজনীয় মনে হয়নি।

তাই কিছু না বলেই ঘরে থেকে বের হয়ে চলে গেল। উঠানে বসে বাচ্চা দু’টো। ঈদে নতুন জামা নিয়ে আসবে বাবা, ঈদের দিন সকালে গায়ে দিয়ে সারা গা ঘুরে বেড়াবে। কত কথা বলছে দু’ভাই বোনে। ছেড়া শাড়ি গায়ে দিয়ে রাবেয়া খেয়াল করলো, মহিমের চোখে ছলছল করছে। মহিম কিছু করতে পারছেনা। রাবেয়া হাতে বিছানাটা গুছিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘বেলা পড়েছে, নতুন জামার কথা বাদ দেন। আমি বুঝামু নে। আপনি খেয়ে বের হবেন। এই  নিয়ে কোনো চিন্তা করা লাগতো না।’

মহিমের নির্ভার জবাব, ‘দেখো বউ ছেলে মেয়ে কম বয়স, এই বয়সে তো নতুন জামা কাপড় পড়তে চাইবেই। আর আমি কি হতভাগ্য বাবা ছেলে মেয়ের চাহিদা পুরন করতে পারিনা। আজ ভাগ্য কোথায়?’ বলতে বলতে মহিম বাবুর চোখে জল আসে। কিছু না খেয়েই বের হয়ে যান।

মা বাবা কি নতুন জামা নিয়ে আসবে? রাত ১০ টা বেজে গেছে। এতোখনে তো এসে পড়ার কথা। এতো দেড়ি তো কোনোদিন করেনি। রাবেয়ার মনে হালকা টেনশন ঢুকে গেলো। ছেলে আবার জিজ্ঞেস করলেন মা বাবা কি নতুন জামা নিয়ে? মা জানে নতুন জামা নিয়ে আসার মত কোনো অবস্থাই নেই। তবুও স্বান্তনা দেয় হ্যা আনবেই তো। মেয়েটা মাকে জিঙেস করে মা আমার নতুন জামার রঙ কি হবে?

ছেলেটা বোনকে বলে তর জামা থেকে, আমার জামা ভালো হবে। না না আমার টা। মা হঠাৎ হুংকার দিয়ে বলে, ‘দুইজনে থামবি। নতুন জামা আনলে দুইজনেরটাই ভাল হবে। এখন ঘুমা তোরা। নাহলে নতুন জামা হবে না!’ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ভাই বলে, ‘মা বলছে ঘুমাইতে, না ঘুমাইলে নতুন জামা হবেনা, চল ভাই ঘুমাই।’ ঠিক বোন ঘুমিয়ে যায়।

এদিকে মহিমের ফেরার কোনো পাত্তাই নাই। কেন যে নতুন জামার কথা বলল বাচ্চারা। ওদের কি দোষ বাচ্চা মানুষ। আর কি হবে বলে, মহিম তো তেমন কিছুই আয় করছেনা। এভাবে পুরোটা রাত চলে গেল। মহিম ফিরে এলো না। ঈদের দিন চলে গেলো, কিন্তু মহিমের খবর নেই।

ঈদের দিন। পাশের চৌধুরী বাড়ি থেকে কিছুটা মাংস পেয়েছিল রাবেয়া। তাই রান্না করে ছেলে মেয়েকে দিয়েছে। বাচ্চারা জিজ্ঞেস করছে বাবা কেন আসেনা? রাবেয়া কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেও কোনো খোঁজ মিলছিল না। ঈদের দিন রাত ঘন ঘন অন্ধকারে লুকিয়েছে চারিদিক।

ছোট মেয়েটা এবার কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। মা আমার নতুন জামা লাগবেনা বাবাকে নিয়া আসো। ছেলেটাও পাশ থেকে মা আমারও জামা লাগবেনা। বাবাকে নিয়া আসো, আমাদের কোনো জামা দরকার নাই। তুমি বাবাকে নিয়া আসো।

রাবেয়া ছেলে মেয়ে সহ কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। এরপরে রাত শেষে ভোর হয়ে গেল। দিন চলে গেল। মহিম ফিরলো না। শুধু পত্রিকায় খবর এল, ‘নিউ মার্কেটে চুরি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যু!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।