ইন্সপেক্টর বিজয় সিং কিংবা একজন অরো

১৯৭১ সাল, বলিউডের বিখ্যাত ছবি ‘আনন্দ’ মুক্তি পায়। এই ছবি তে সুপারস্টার রাজেশ খান্নার সাথে অভিনয় করেছিলেন এক নবীন অভিনেতা। বলা হয়, এই ছবির পর থেকেই নাকি রাজেশ খান্নার ক্যারিয়ার পড়তির দিকে চলে যায়, তাঁর কারণ ছয় ফুটের ও বেশি দীর্ঘকায় রোগা, লম্বা এই নায়কটি।

এরপর ইতিহাস, ধীরে ধীরে তিনি জায়গা করে নিলেন বলিউডের শীর্ষ স্থান। যুগের পর যুগ এসেছে, রুচির, ধারার বদল ঘটেছে, পরিবর্তন এসেছে সব কিছুর। এর মাঝেও তিনি সমুজ্জ্বল, শুরুর দিকে তিনি ‘বাবু মশাই’ বা ‘ইন্সপেক্টর বিজয় সিং’, কিংবা তাঁর ও অনেক সময় পর ‘অরো’ বা ‘ভাস্কর ব্যানার্জী’ হয়ে দ্যুতি ছড়িয়েছেন।নিজের একাগ্রতা, পরিশ্রম দিয়ে নিজেকে করেছেন কালোর্ত্তীন, তিনি হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে সফলতম নায়ক শাহেনশাহ খ্যাত ‘অমিতাভ বচ্চন’।

সরকারি চাকরি করতেন,কিন্তু মন ছিল অভিনয়ে। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটা সিনেমার অভিনয়ের জন্য চলচ্চিত্র পাড়ায় ঘুরতেন। অবশেষে আসে,সেই সুযোগ। মৃনাল সেনের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘ভুবন সোম’ এ এক ভাষ্যকারের ভূমিকা পালন করেছিলেন, এরপর ‘সাত হিন্দুস্তানি’ ছবিতে প্রথম অভিনয়। এরপর বিখ্যাত ছবি ‘আনন্দ’ এ একজন চিকিৎসকের ভূমিকায় অভিনয় করে বেশ আলোচিত হন। হাতে আসতে থাকে একের পর এক ছবি।

সত্তরের দশকে শুরুর দিকে সুপারহিট ছবি ‘জাঞ্জির’ এ অভিনয়ের পর পিছন ফিরে তাকাতে হয় উনাকে,এই ছবি দিয়েই পেয়েছিলেন ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ এর খেতাব। আরেক বিখ্যাত ছবি ‘শোলে’র বিরাট সাফল্যর পর, একই বছরেই ‘দিওয়ার’-এর সাফল্য, নায়ক হিসেবে নিজের ক্যারিয়ারের পথ বেশ সুগম করেছেন। এরপর ‘ডন’ ছবি করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন একধাপ, পেয়েছিলেন সুপারস্টারের খেতাব। এছাড়া এই দশকে রয়েছে নমক হারাম, চুপকে চুপকে, কাভি কাভি, অভিমান, অমর আকবর অ্যান্থনি, ত্রিশূল, সুহাগের মত সাড়া জাগানো ছবি।

আশির দশক নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করার বছর। হারিয়ে যেতে দেন নিজেকে,বরং একের পর এক বাণিজ্যিক সফল ছবি উপহার দিয়েছেন। দিলীপ কুমারের সাথে একফ্রেমে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন ‘শক্তি’ ছবিতে, মুক্তি পায় ‘সিলসিলা’র মত আলোচিত ছবি। আরেক সাড়া জাগানো ছবি ‘কুলি’র পাশাপাশি ,‘দোস্তানা’ ছবিটিতো রয়েছেই।মাঝে রাজনীতিতে সময় দেয়ার পর আবার ফিরে এসেছিলেন ‘শাহেনশাহ’ ছবি দিয়ে, তারপর মুক্তি পায় ম্যায় আজাদ হু, অগ্নিপথের মত আলোচিত ছবি।

নব্বই দশকের শুরুতেই উপহার দেন ‘হাম’ ও ‘খুদা গাওয়ার’-এর মত সুপারহিট ছবি, এরপর কয়েক বছর বিরতি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড, লাল বাদশাহ, বডে মিয়া ছোটে মিয়া ছবিতে অভিনয় করেন, তবে কোনোটাই প্রত্যাশামাফিক সাড়া পায়নি ,মাঝে ‘সুর্যবংশম’ ছবিটা আলোচিত হয়েছিল।

রাজনৈতিক কারণে দেউলিয়া হতে বসেছিলেন, হাতে তেমন কাজ ও ছিল না। তখন তিনি নিজেই যশ রাজ ফিল্মসের কাছে বলেছিলেন আমার কাজ চাই, কাজ দেও। তখন তাঁরা অফার দিয়েছিলেন ‘মোহাব্বতে’ ছবির,আর এই ছবি দিয়েই প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তিনি, এরপর কাভি খুশি কাভি গাম, আকস, আঁখে, কাঁটে, বাগবান, খাকি, দেব, বান্টি অউর বাবলি’র মত ছবিতে অভিনয় করেছেন।

২০০৫ সাল ছিল, অমিতাভ বচ্চনের জন্য এক বিশেষ বছর। সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘ব্ল্যাক’ ও রামগোপাল ভার্মার ‘সরকার’ এই ছবি দুটি পৌঢ় অমিতাভ বচ্চনকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। দ্য কিং লিয়র, চিনিকম, র পর ‘পা’ ছবি দিয়ে নিজেকে আবার নিরীক্ষা করেছেন, ‘পিকু’তে অনবদ্য অভিনয়ে নিজের ক্যারিয়ারে আরেকটি বিশেষ পালক যুক্ত করেছেন।

‘পিংক’ ছবিতেও নিজের প্রতিভার মূল্য রেখেছেন। এই সময়ে এসেও নিজেকে ভাঙছেন, এই যেন অনন্য অমিতাভ বচ্চন। মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘ঠাগস অব হিন্দুস্তান’-এর মত বহুল অপেক্ষমান ছবি। প্রযোজক হিসেবে সুবিধে করতে পারেন নি,তবে গায়ক হিসেবে সুপরিচিতি আছে। ওনার ভরাট কন্ঠ ও এনে দেয় ভিন্নমাত্রা,তাঁর অন্যতম উদাহরণ ‘লগান’। টেলিভিশনে ‘কওন বনেগা ক্রোড়পতি’র সফল উপস্থাপক তিনি।

বর্নিল ক্যারিয়ারে পেয়েছেন পদ্মশ্রী,পদ্মভূষণ,পদ্মবিভূষণ এর উচ্চসম্মান।জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন পাঁচবার,এর মধ্যে তিনটিই পৌঢ় বয়সে।এছাড়া বেশ কয়েকবার ফিল্মফেয়ার সহ পেয়েছেন অসংখ্য দেশী বিদেশী পুরস্কার।মাদাম তুসোর জাদুঘরে জায়গা পেয়েছে উনার মোমের মূর্তি।অপেক্ষা এখন দাদাসাহেব ফালকের সম্মানের কিংবা যেভাবে নিজেকে আরো বর্নাঢ্য করে যাচ্ছেন, হয়তো পুরস্কারের পাল্লা আরো ভারী হবে।

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া বচ্চনকে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সংসার করছেন চার দশকের ও বেশি সময় ধরে। সংসারে রয়েছে দুটি সন্তান, মেয়ে শ্বেতা বচ্চন চলচ্চিত্রে যুক্ত না হলেও, ছেলে অভিষেক বচ্চন চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত হয়েছেন, তিনিও নিজের মত করে কাজ করে যাচ্ছেন।

জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন উনার পুত্রবধূ। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথেও নিজেকে যুক্ত করেছেন এই পরিশ্রমী অভিনেতা। উনার আরেকটি বিশেষ গুন রয়েছে, অন্য কারো অভিনয় ভালো লাগলে, তিনি তাকে চিঠি দিয়ে অভিবাদন জানান। এই বুড়ো বয়সেও অমিতাভ হাঁটুর বয়সী অভিনেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে চলেছেন, খ্যাতি কুড়িয়ে চলেছেন। কাজ পাগল এই মানুষটিকে স্যালুট!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।