ইন্ট্রোভার্ট হলে রক্ষা নাই, এই কথার ভিত্তি নাই!

বর্হিমুখী  বা এক্সট্রোভার্ট স্বভাবের মানুষদের সবাই পছন্দ করে। তাদের হৈ-হুল্লোড়, যেকোনো কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা, যেকোনো প্রতিযোগিতায় নিজেদেরকে প্রমাণ করবার চেষ্টা অনুপ্রেরণা যোগায় অনেককেই। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, ‘ধ্যাত, এসব করার টাইম আছে নাকি!’ আপনার পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব মি’ ট্যাগ লাগানো মোটা ফ্রেমের চশমাওয়ালা বন্ধুটির মনের ভেতর কি চলছে? চলুন দেখে আসা যাক।

১. মার্টি ওলসেন লেনের লেখা ইন্ট্রোভার্ট অ্যাডভান্টেজ অনুযায়ী, অন্তর্মুখী ব্যক্তিরা একটু বেশী স্নায়ু সংবেদী। যার ফলে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর কোনো তথ্য বা ঘটনা তাদের নজর এড়ায় না। তাই অন্তর্মুখীদের পর্যবেক্ষণ শক্তি বহির্মুখীদের চাইতে অনেক এগিয়ে।

এর পেছনে আরো একটি কারণ রয়েছে। অন্তর্মুখীরা যখন কারো সাথে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়, তখন সেই মানুষটি ছাড়াও আশে-পাশের পরিবেশ তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাড়ায়।

উপরের কাট্টাখোট্টা কথাগুলো হয়তো বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। ধরুন আপনি আপনার কোনো অন্তর্মুখী বন্ধুর সাথে দেখা করতে পার্কে গিয়েছেন। খেয়াল করে দেখবেন হয় সে অধিকাংশ সময়ই চুপ থাকছে, অথবা কথা বললেও এমন সব প্রশ্ন করছে যা চারপাশের প্রকৃতি বা আবহাওয়া সম্পর্কিত।

২. মনোবিজ্ঞানী হান্স ইয়েসঙ্কের গবেষণা মতে, অন্তর্মুখীদেরকে সংবেদী করতে কম উদ্দীপনা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ জাগ্রত ও সতর্ক হতে সামান্য ইশারাই যথেষ্ট। হতে পারে তা আলোর সামান্য ঝলকানি কিংবা টেবিল থেকে কলম পড়ে যাবার শব্দ।

অন্তর্মুখীরা হয়তো ভাবছেন, ‘ইয়েসসস..! এ রাউন্ডটা আমরা জিতে গেলাম!’ কিন্তু প্রিয়বন্ধু, এতো আগেই খুশি হয়ে উঠবেন না। এই অতিসংবেদনশীলতার একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। যেহেতু অন্তর্মুখীরা সামান্য পরিবর্তনেই সংবেদী হয়ে পড়ে, তাই তাদের অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।

তবে খুব বেশী দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কেননা অন্তর্মুখীদের এই ক্ষতিকর দিকটি প্রশমিত করতে তাদের মস্তিষ্ক বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে। অন্তর্মুখীদের মস্তিষ্কের নিউরাল নালী বহির্মুখীদের তুলনায় একটু বেশীই দীর্ঘ। ফলে স্নায়ুবিক সংকেতগুলো মস্তিষ্কে পৌছুতে বেশী সময় নেয়। এতে করে মস্তিষ্কে চাপ পড়ে কম।

৩. ডোপামিনের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীলতার পার্থক্যের কারণে অন্তর্মুখী ও বহির্মুখীদের মস্তিষ্কের কার্যাবলীতে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বহির্মুখীদের তুলনায় অন্তর্মুখীদের মস্তিষ্ককে একটি এনার্জি-সেভিং মোডে চালিত সেলফোনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এই কারণে অন্তর্মুখীরা বই পড়া, গভীর চিন্তা, বা ধারণার মতো কাজে ডুবে থাকতে পছন্দ করে।

এজন্যই বন্ধুবান্ধবদের কোনো জটলায় আপনি সবসময় এমন একজনকে (কিংবা একের বেশী) দেখতে পাবেন, যে কিনা আড্ডায় অংশ না নিয়ে মোবাইলে গান শুনতে অথবা কোনোদিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে অভ্যস্থ।

৪. কোনো কাজে ঝুঁকি নেয়ার সময় বহির্মুখীদের থেকে অন্তর্মুখীদের মস্তিষ্ক কম পুরস্কৃত হয়। এর কারণ ডোপামিন নিউরোট্রান্সমিটারের ভিন্নতা, যা অামাদের মস্তিষ্কের প্রশান্তি ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তারা ঝুঁকি নিতে খুব একটা অাগ্রহ দেখায় না।

তাই অন্তর্মুখী ব্যাক্তিদের মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে দেখা যায় কম। কিছু কিছু পেশাগত ক্ষেত্র যেমন, পর্বতারোহণ, সাঁতার, ক্রীড়া ইত্যাদিতে তাদের পদচারণা খুবই সীমিত।

৫. ‘অন্তর্মুখীরা সিদ্ধানন্তহীনতায় ভুগে’ এ মিথটি বহুল প্রচলিত হলেও এর কোনো সত্যতা নেই। বরং সত্যটা হল, নেতৃত্ববাচক গুণাবলীর দিক দিয়ে অন্তর্মুখীরা বহির্মুখীদের সাথে সমানে সমানে এগিয়ে আছে। একারণে দেখবেন, আড্ডায় যে বন্ধুটি চুপচাপ থাকে, কোনো বিষয়ে মতামত দরকার হলে অন্যরা তার দিকেই ফিরে তাকায়।

যখন একজন অন্তর্মুখী কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি তার দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিশক্তিকে কাজে লাগান। পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটি সাধারণ দৃষ্টিতে সময়ক্ষেপণ বলে মনে হলেও এতে ভুল-ভ্রান্তির আশঙ্কা তূলনামূলকভাবে হ্রাস পায়।

তাই অন্তর্মুখীরা হয়তো সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটু সময় নেয়, কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা? কখনোই না।

৬. অন্তর্মুখীদের মস্তিষ্কে একই সময়ে একাধিক চিন্তা-ভাবনা চলতে থাকে। তাই তাদের কাছে কোনো বিষয়ে তাৎক্ষনিক মতামত চাওয়া হলে, তারা অপারগতা প্রকাশ করে। তবে তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী হওয়ায় অন্তর্মুখীরা কোনো বিষয়ে সার্বিক আলোকপাত করতে অধিক পারদর্শী। তাই অন্তর্মুখীদেরকে সাধারণত নিবন্ধকার, সমালোচক, চিত্রশিল্পী হতে দেখা যায়।

তাই এখন থেকে কারো ব্যাপারে ‘ও তো একদম বোরিং’ অথবা ‘ওর ইগো বেশি’ মন্তব্যগুলো করার আগে আরেকবার ভেবে দেখুন, তার মনে আসলেই কি চলছে!

হাফিংটন পোস্ট অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।