বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস পাল্টে ফেলা এক ইনিংস

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি। সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপে না খেললে বাংলাদেশে ক্রিকেটের অবস্থান আজ ঠিক কোন জায়গায় থাকতো সেটা কেউই জানেনা।

টুর্নামেন্টের ফাইনালটাই হয়তো সবাই মনে রেখেছেন তবে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন ম্যাচ ছিলো ৪ এপ্রিল, নেদারল্যান্ডের সাথে। দ্বিতীয় পর্বের শেষ ম্যাচ বাংলাদেশের। সেমি ফাইনালে কোয়ালিফাই করার জন্য অন্তত ১ পয়েন্ট লাগে বাংলাদেশের। জিতলে ২ পয়েন্ট।

বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শুরু ম্যাচে নেদারল্যান্ড অল আউট ১৭১ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭২ রানের টার্গেট নিয়ে খেলা বাংলাদেশ চোখের পলকে ১৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে! চার বছর আগে এভাবেই কেনিয়ায় হওয়া টুর্নামেন্ট থেকে হেরে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন চুরমার হয়েছিলো। বাংলাদেশ তখন মনেপ্রাণে বৃষ্টি চাইছে।

২০ ওভারের আগে নামলে ম্যাচ পরিত্যাক্ত হয় এবং শেয়ার করা ১ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ সেমি ফাইনালে চলে যায়। বৃষ্টি নামলো ১৮.৫ ওভারে। কিন্তু ঘন্টা দেড়েক পর থেমেও গেলো। বাংলাদেশের সামনে আরো বড় বিপদ দেখা দিলো! ডি/এল মেথডে তখন জেতার জন্য ৮৫ বলে ৮৫ রান লাগে হাতে ৬ উইকেট। ‘৯৭ সালে ওভারপ্রতি ৬ রান মুখের কথা না।

তার উপর যেকোন সময় বৃষ্টি নামলে এবার আর ম্যাচ বাতিল হবেনা, ২০ ওভার খেলা হয়ে যাওয়ার ফলে রেজাল্ট হবে ডি/এল মেথডে। একটা ডট বল, একটা উইকেট পড়া মানে রান রেটে পিছিয়ে যাওয়া, ডি/এল মেথডে পিছিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের এবার চাওয়া আর যেন বৃষ্টি না নামে।

সেই কঠিন অবস্থায় অধিনায়ক আকরাম খান খেলেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন এক ইনিংস। অপরাজিত ৬৮ রানের একটি ইতিহাস বদলে ফেলা ইনিংস। যোগ্য সঙ্গ দিয়েছিলেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু (২২) এবং সাইফুল ইসলামের ২০ বলে ১৮ রানের একটা ক্যামিও। বাংলাদেশ ম্যাচ জেতে ৮ বল এবং ৩ উইকেট হাতে রেখেই।

বিশালাকৃতির আকরাম খানের ৯২ বলে ৬৮ রানের হার না মানা ইনিংসে বাউন্ডারি সংখ্যা মাত্র ৩ টি! বাকি রান দৌড়ে নেয়া। একটা কথা বলা হয় ক্রিকেটে ‘ক্যাপ্টেন লিডিং ফ্রম দা ফ্রন্ট’, সেটির আদর্শ এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন আকরাম খান।

কোন দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে একটা নির্দিষ্ট ইনিংস এতো বড় ভূমিকা রেখেছে কি না সেটা নিয়ে গবেষনা হতে পারে। আকরাম খান যদি সেদিন ওই ইনিংস না খেলতেন তাহলে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে যায় না, সেমিতে না গেলে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে খেলা হয়না, বিশ্বকাপে না খেললে টেস্ট স্ট্যাটাস আসেনা আর টেস্ট স্ট্যাটাস না আসলে কি হতো সেটা নাই বা বললাম। একসময়ে যাদের সাথে ঘাম ঝরিয়ে জেতা লাগাতো সেই কেনিয়া, নেদারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড কোথায় আর আমরা কোথাও!

আকরাম খান, পরিসংখ্যান বলবে ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি অতি সাধারন মানের, কিন্তু পরিসংখ্যান বলবে না কোন সময়ের কোন বাংলাদেশ দলে তিনি খেলেছেন, সেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবস্থান কি ছিলো!

একজন ক্রিকেটার দেশের হয়ে শত শত ম্যাচ খেলতে পারেন, হয়তো অনেক সেঞ্চুরীও করতে পারেন, জেতাতে পারেন অনেক ম্যাচ কিন্তু একটা ইনিংস দিয়ে নিজ দেশের ক্রিকেটের ইতিহাস রচনা কয়জন ব্যাটসম্যান করেছেন ইতিহাসে? একটা ইনিংস দিয়ে দেশের ক্রিকেটকে ভবিষ্যতের পথ কয়জন দেখিয়েছেন? শতবার জন্মালেও সেটা সবাই পারবেন না কারণ এই বিষয় গুলা সময় নিজের হাতে তৈরী করে দেয়! ইতিহাস এভাবেই তৈরী হয়, ইতিহাস বলে কয়ে বানানো যায়না!

বাংলাদেশের ক্রিকেট যার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ সেই আকরাম খানের আজ ৪৯ তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন আকরাম খান। আপনার অবদান কখনোই ভুলার মতো নয়। শুভ হোক আপনার বাকি জীবনের পথচলা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।