ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার অভিজ্ঞতা

চতুর্থ দিনের খেলা শুরু হতে মাত্র ১০ মিনিট বাকি। তখনও অ্যাকাডেমি মাঠে ব্যাট হাতে ঘাম ঝড়াচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডার ও টেইল এন্ডারের ব্যাটসম্যানরা। দলের টেইল এন্ডার ব্যাটসম্যানরা অ্যাকাডেমি মাঠের নেটে ব্যাট করছিলেন। আর সেন্টার উইকেটে ব্যাটিং অনুশীলন করছিলেন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান ম্যাথু ওয়েড।

লোকাল দুইজন স্পিনার দিয়ে ওয়েডকে বল করাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার কোচ ড্যারেন লেহম্যান। একজন স্পিনার বাঁ-হাতি এবং আরেকজন ডানহাতি। বাঁ-হাতি স্পিনার রাউন্ড আর্ম এবং ডানহাতি স্পিনার স্ট্রেইট আর্ম অ্যাকশনে বল করে যাচ্ছেন ওয়েডকে। বুঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশি স্পিনারদের নিয়ে বুধবার বেশ সতর্ক ছিল অজিরা। আরো পরিস্কার করে বলতে গেলে সাকিব ও মিরাজের বোলিং নিয়েই ছিল তাদের যত মাথাব্যথা। আর হবে না ই বা কেন? ম্যাচের পুরোটা সময়ই তো এই দুই বোলারের তোপে বিধ্বস্ত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন-আপ! তাই  সাকিব ও মিরাজের প্রায় সমান উচ্চতাসম্পন্ন এবং একই অ্যাকশনে বল করা দু’জন লোকাল স্পিনারকে দিয়ে ম্যাথু ওয়েডকে চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর আগে অনুশীলন করানো হয়।

এটা সবারই ধারনায় ছিল যে চতুর্থ দিনের বেশিরভাগ সময় সাকিব ও মিরাজকে মোকাবেলা করতে হবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের। এই দুইজন ১ম ইনিংসে তাদের ১০ জন ব্যাটসম্যানের মধ্যে ৮ জনকেই প্যাভিলিয়নের পথ দেখিয়েছেন। তাছাড়া তাদের দু’জনের প্রকোপেই ২য় ইনিংসের শুরুতে ২ উইকেট হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া। তাই তাদেরকে নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে অ্যাকাডেমি মাঠে এই পন্থা অবলম্বন করেন ড্যারেন লেহম্যান। পারলে হয়ত সাকিব-মিরাজকে দিয়েই খেলার আগে অজি ব্যাটসম্যানদের অনুশীলনটা সারাতে চাইতেন কোচ। কারণ তাঁরা দুজনই যে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা!

বুধবার সকাল থেকেই একাডেমি মাঠে প্রচন্ড ব্যস্ত ছিলেন অজি কোচ ড্যারেন লেহম্যান। এক একটি বল খেলার পরপরই ছুটে যাচ্ছিলেন ওয়েডের কাছে। স্পিন মোকাবেলায় ওয়েডের ছোটখাটো ভুল সংশোধন করে দিচ্ছিলেন তিনি। তাকে শুধু ওই দুইজন স্পিনারদের দিয়ে অনুশীলন করানোর একটা কারণ হতে পারে যে তিনিই দলের শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান তাই কোন কারণে সাকিব, মিরাজ যদি জ্বলে ওঠে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয় ঘটান তাহলে সেই পরিস্থিতিতে এই অনুশীলনটা খেলার মাঠে ওয়েডকে কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে। তবে মাঠে সেরকম কিছু হয়নি। বরং সাকিব আল হাসানের বলেই মাত্র ৪ রান করে লেগ বিফোর উইকেটের ফাদে পড়ে প্যাভিলিয়নের রাস্তা ধরেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান।

বুধবার খেলা শুরু হওয়ার ১০ মিনিট আগেও  একাডেমি মাঠে বেশ ব্যস্ত দেখাচ্ছিল অজিদের এক একজনকে। ততক্ষণে শের এ বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ব্যাট প্যাড পরে প্রস্তুত আগের দিনের দুইজন অপরাজিত ব্যাটসম্যান স্টিভ স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নার। জয়ের জন্য তাদের দরকার ১৫৬ রান, হাতে উইকেট ৮টি। ওয়ার্নার ৭৫ ও স্মিথ ২৫ রানে অপরাজিত। অনিশ্চয়তায় দোলাচলে ঢাকা টেস্টের ভাগ্য। কে জিতবে তা আগেভাগেই কেউ অনুমান করতে পারছে না, যেমনটা অনুমান করা যায়নি মিরপুরের উইকেট সম্পর্কে। তবে জয়ের সম্ভাবনার পাল্লাটা একটু ভারী ছিল সফরকারীদের। আগের দিন ২৫৬ রানের লক্ষ্যে মাত্র ২৮ রানের মাথায় ২ উইকেট পড়লেও উইকেটে খুব ভালোভাবে দাঁড়িয়ে যান দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান  ওয়ার্নার ও স্মিথ। শুরুতে উইকেট খোয়ানোর চাপটা নিজেদের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি তাঁরা। সাকিব, মিরাজ, তাইজুলদেরও চড়াও হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেননি। যেমনটা বুধবার সকালেও ঘটেছে।

চতুর্থ দিনের খেলার শুরু থেকেই উইকেটে বেশ ইতিবাচক ছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ। সাকিব মিরাজকে এককথায় কোন প্রকার ছাড় দেননি তাঁরা। এই জুটি ভাঙ্গতে দিনের শুরু থেকেই মরিয়া ছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। তাই তো দিনের খেলার শুরুতে মাত্র ২ ওভার করিয়ে মিরাজের জায়গায় তাইজুলকে বোলিংয়ে আনেন অধিনায়ক। কিন্তু তাতেও সফলতা মেলেনি। তাকে দিয়ে ৩ ওভার করিয়ে মিরাজকে আবার আনা হলো আক্রমণে। তবে কোনভাবেই এই জুটি ভাঙ্গা যাচ্ছিলো না। এদিকে দিনের ৯ম ওভারে নিজের উনিশতম টেস্ট শতকটি তুলে নেন ডেভিড ওয়ার্নার।

শতক তুলে নেয়ার পাশাপাশি নিজের ট্রেডমার্ক উদযাপনটি করতেও ভুলেননি তিনি। তাইজুল ইসলামের বলে কভারে গ্যাপ গলিয়ে দুই রান নেয়ার সাথে সাথে হ্যালমেটটি খুলে শূণ্যে লাফ দিয়ে ব্যাট ছুড়ার উদাযপনটি করে ফেলেন ওয়ার্নার। ব্যাট ছুড়ার সাথে সাথে তিনি যেন বাংলাদেশকেও ম্যাচ থেকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছিলেন সেইসময়। তখন হাত থেকে ফসকে যাওয়া ম্যাচগুলোর তালিকায় এই টেস্টের নাম যোগ হওয়ার চোখ রাঙ্গানিতে বাংলাদেশ। মিরপুরের গ্যালারিতেও তাই পিন পতন নীরবতা। তবে সেই নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি সাকিব আল হাসান। অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য যখন মাত্র ৯৮ রান দরকার ঠিক তখনই গর্জে ওঠে পুরো শের এ বাংলা স্টেডিয়াম। ১১২ রান করা ডেভিড ওয়ার্নারের বহুল কাঙ্ক্ষিত উইকেটটি তুলে নেন সাকিব আল হাসান।

সাকিব আল হাসান একজন জাত লড়াকু। শুধু লড়াই করা না, পাশাপাশি লড়াইয়ে জেতা তাঁর কাছে যেন ডাল-ভাত! যেকোন পরিস্থিতিতে রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে তাঁর লড়াই করার অভ্যেসটা তো সকলেরই জানা। বুধবার তারই প্রমাণ মেলে আরেকটিবার।

ডেভিড ওয়ার্নার ফিরে যাবার পর ম্যাচের মোড় ঘুরতে শুরু করে। তাকে আউট করার মাত্র ৪ ওভারের মধ্যে সাকিবের শিকার আরেক সেট ব্যাটসম্যান স্টিভেন স্মিথ (৩৭)। এই উইকেটটি পতনের সাথে সাথেই পুরো ম্যাচের রঙ পাল্টে যায়। স্মিথ আউট হবার পর মাত্র ১২ রানের মধ্যে আরো ৪ জন ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া। ততক্ষণে দলের সব স্বীকৃত ব্যাটসম্যান ড্রেসিংরুমে। স্মিথ আউট হবার পর মিডিয়া প্রান্ত থেকে তাইজুল ও তার বিপরীত প্রান্ত থেকে সাকিব অস্ট্রেলিয়া ব্যাটসম্যানদের রীতিমত স্পিন ঘূর্ণিতে তুর্কি নাচন নাচিয়েছেন। তাতেই প্রথম ইনিংসের মত দ্বিতীয় ইনিংসেও নিজের ঝুলিতে ৫ উইকেট যোগ করেন সাকিব আল হাসান । এতে করে স্যার রিচার্ড হ্যাডলির পর  টেস্টে একাধিকবার হাফসেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট তুলে নেবার রেকর্ডের মালিক বনে যান তিনি।

১৯৯ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়া অস্ট্রেলিয়ার আশা কিছুটা হলেও বাঁচিয়ে রাখেন প্যাট কামিন্স ও নাথান লিঁও। বাংলাদেশি স্পিনারদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করা এই দুই ব্যাটসম্যান নবম উইকেটে জুটিতে যোগ করেন ২৯ রান। তারপর মিরাজের বলে লিয়ন আউট হয়ে গেলে প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের জয়।  জশ হেজেলউড আগেরদিন ইঞ্জুরিতে পড়ায়  ম্যাচের চতুর্থ দিন তাঁর ব্যাটিং করা নিয়ে ছিল সংশয়। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় ইঞ্জুরিগ্রস্ত এই পেসারকে শেষ উইকেটে মাঠে নামিয়ে দেয় অজি টিম ম্যানেজমেন্ট। কারণ অস্ট্রেলিয়ানরা তো এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নন। ২২৮ রানে ৯ম উইকেটের পতনের পরও তাঁরা ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন প্যাট কামিন্সের ব্যাটের ওপর ভরসা রেখে। হেজেলউডও তাকে যোগ্য সঙ্গ দিতে থাকেন। তাদের এই জুটি দলীয় সংগ্রহে যোগ করে ১৬ রান। তখনও কারো কারো মনে শঙ্কার কালো মেঘ। ফতুল্লা আবার ফিরে আসছে না তো মিরপুরে!

না। এবার আর সেই বেদনাবিধুর দৃশ্যপটের মঞ্চায়ন হয়নি। অজিদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন তাইজুল ইসলাম। ১০ম উইকেটে ১৬ বল সারভাইভ করে শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছে হার মানেন জশ হেজেলউড (০)। তাইজুলের বলে লেগ বিফোর উইকেটের ফাদে পড়ার সাথে সাথে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০ রানের ঐতিহাসিক জয়টি নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের। প্যাট কামিন্স দলের হয়ে ব্যক্তিগত তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৩ রান করে অপরাজিত থাকেন।

সবদিক দিয়েই এই ম্যাচে অন্য এক সাকিবকে দেখেছে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব। মাঠে তাঁর আক্রমণাত্মক দেহভঙ্গিমাই বলে দিচ্ছিলো এই জয়ের জন্য তিনি কতটা মরিয়া ছিলেন। ম্যাচে ব্যাট হাতে ৮৯ রান ও বল হাতে ১০ উইকেট তুলে নিয়ে পারফরম্যান্সের বিচারে ছিলেন সবার ঊর্ধ্বে। উদযাপনের দিক দিয়েও তিনি ছিলেন অন্যান্যবারের চেয়ে বেশ ব্যতিক্রম। আগেপরে উইকেট পাওয়ার পর ভাবলেশহীন থাকলেও ম্যাথু ওয়েডের উইকেট পেয়ে বেশ আগ্রাসী উদযাপন করেন তিনি যা সচরাচর করতে দেখা যায় না তাকে।

সাকিব আল হাসান বরাবরই দলের সবচেয়ে ভালো ম্যাচ রিডার, সহজেই বের করতে পারেন যেকোন ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা। বুধবার তাঁরই একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। অ্যাস্টন আগারকে আউট করার ১ বল আগে তাইজুলকে ডেকে সাকিব কিছু একটা বললেন এবং দুই হাত এক করে ক্যাচ ধরার একটি অঙ্গভঙ্গি দেখালেন। খুব সম্ভবত আগারকে আউট করার টোটকাটা তাইজুলকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সাকিব। তাইতো এক বল পরেই নিজের বলে নিজেই ক্যাচ ধরে আগারকে আউট করেন তাইজুল। ২য় ইনিংসে সাকিবকে যোগ্য সঙ্গও দিয়েছেন তিনি। ১৯.৫ ওভারে ৬০ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচ জয়ে অবদান রেখেছেন এই বাঁহাতি স্পিনার।

যখন হাতে ২ দিন, উইকেট ৮টি, রান দরকার মাত্র ১৫৬ আর উইকেটে থিতু অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ দুই ব্যাটসম্যান তখন বাংলাদেশের অনেক সমর্থকই বিশ্বাস করতে পারেননি যে এই ম্যাচটা তাঁরা জিততে যাচ্ছে। তাই তো দিনের শুরু থেকে স্টেডিয়ামে দর্শকদের আনাগোনা গত ৩ দিনের চেয়ে কম ছিল। টিকেট বিক্রি করার স্থান মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামেও ছিল না টিকেট প্রত্যাশী জনগণের লম্বা লাইন। এমনকি এ ম্যাচ জয়ের প্রত্যাশা সেই অর্থে ছিল না ম্যাচসেরা সাকিব আল হাসানেরও। কিন্তু চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর আগের রাতে স্ত্রী শিশিরের অনুপ্রেরণামূলক কিছু কথা ও দল খুব বেশি সুবিধাজবক অবস্থায় না থাকা সত্ত্বেও খেলার দিন দর্শকদের উপস্থিতি সাকিবকে জয়ের জন্য লড়তে উদ্বুদ্ধ করে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গত বছর ঢাকা টেস্ট জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ দলের প্রত্যেকটি সদস্যদের মধ্যে একটি বিশ্বাস জন্মে যে ঘরের মাঠে তাঁরা যেকোন প্রতিপক্ষকে হারানোর সামর্থ্য রাখে। সেই বিশ্বাস থেকে এবার তাঁরা অস্ট্রেলিয়ার মত দলকে টেস্টে হারিয়েছে। আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়ের ফলে সবার মধ্যে এই নতুন বিশ্বাসটি জন্মাবে যে টেস্ট ক্রিকেটে যেকোন পরিস্থিতিতে যেকোন প্রতিপক্ষের নাগাল থেকে ম্যাচ বের করে আনার সামর্থ্য রয়েছে তাদের। কারণ তাদের আছে একজন সাকিব আল হাসান।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।