ইটস অ্যা নাইস ওয়েকআপ কল: মাশরাফি

৮২ রানে অলআউট। ১০ উইকেটের হার। এই বিপর্যয়কে খোদ মাশরাফি বিন মুর্তজাও বিশ্বাস করতে পারছেন না। শনিবারের ফাইনালের আগে তিনি একে দেখছেন ‘ওয়েকআপ কল’ হিসেবে।

বাজে দিন ছিল? উইকেট খুব বোলিং সহায়ক ছিল? না ওরা অনেক ভাল বল করেছে? না আমরা বাজে ব্যাট করেছি?

সবগুলোই বলা যায়। টপ অর্ডারে যারা আউট হয়েছে। তারা কিছু সময় হলেও পাড় করেছে। কোনো কমপ্লেইন করেনি। এটা ব্যাড ডে। আরলি উইকেট পড়ে যাওয়ার পরে মিডল অর্ডারে যারা ব্যাটিং করছিল তারা আরেকটু সেট হয়ে বেশি রানের দিকে না যেয়ে তারপর হয়ত রান টাকে আরেকটু বিল্ড আপ করা যেত। যেহেতু চারটা আরলি উইকেট পড়ে গিয়েছিল। ওখান থেকেও আমাদের ১৮০ বা দুইশ রান করার মতো অ্যাবিলিটি ছিল। তো আমার কাছে মনে হয় ওখানে এপ্লিকেশন আমরা ঠিকমতো করিনি। উইকেটে আরেকটু সেট হয়ে আত্মবিশ্বাস আরেকটু বাড়িয়ে আমাদের ব্যাটিং ইনিংসটাকে আরেকটু হেলদি করার দরকার ছিল।

চার ব্যাটসম্যান – এনামুল, সাব্বির, রিয়াদ, নাসির। তাদের ফর্মটা কি ফাইনালের আগে বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়?

যেহেতু ফাইনালের আগে আমার মনে হয় না ডিটেইলসে যাওয়া উচিত। আমি সিউর যে, আমি তাদের উপর কমপ্লেইন করতে পারতাম যদি তারা হার্ড ওয়ার্ক ও চেষ্টা না করত। তারা যে চেষ্টাটা করছে একটা-দুটা রান না করে ওখান থেকে বের হয়ে আসাটা কঠিন। আজকে হয়তোবা তাদের জন্য আরও ভালো কিছু করার ছিল। উইকেটে আরও সময় কাটাতে পারত। ২০-২২ ওভারে অলআউট হয়েছি। যে সময়টা পেয়েছি…. যদি আজকে স্ট্রাইক রেট কমও হতো তাহলেও কেউ প্রশ্ন আনতো না। আমার কাছে মনে হয় তাদের জন্য আজকে একটা ভালো সুযোগ ছিল্ চেষ্টা করছে। আপনি যাদের নাম বলেছেন তাদের মধ্যে একজন-দুজন অনেক দিন ধরেই খেলছে। এ ধরণের পরিস্থিতিটা পাড় করেছে। কঠিন সময়ে তারা বেরও হয়ে এসেছে। আমি আসলে প্রত্যাশা করছি তারা এখান থেকে বের হেয় আসতে পারবে।

তিনটা ম্যাচে দারুণ জয়ের পর বাজে হার। এটা কি বাংলাদেশকে মানসিকভাবে  বিপর্যস্ত করলো ফাইনালের আগে?

এটা আসলে নির্ভর করছে ব্যক্তির উপর। আমরা জানি যে শ্রীলঙ্কা আমাদের হারাতে পারে। কিন্তু এভাবে আমরা হারব সেটা কেউই প্রত্যাশা করিনি। এটাতো তো সত্যি। ড্রেসিং রুমের কেউই এটা বিশ্বাস করবে না যে আমাদেরকে শ্রীলঙ্কা হারাতে পারে না। শেষ তিন ম্যাচ এভাবে খেলার পর এভাবে হারব সেটা হয় না। আসলে কমেন্ট করা খুব কঠিন এভাবে তিন ম্যাচে পারফরম্যান্সের পর। ম্যাচ ডিটেইলস নিয়ে এক্সপ্লেইন করাও কঠিন। আমার কাছে মনে হয়..যেভাবে আমরা শেষ তিন ম্যাচ খেলেছি সেভাবেই আমাদের চিন্তা করতে হবে। স্টিল আমাদের ইতিবাচক ক্রিকেট খেলতে হবে। হয়তোবা এটা আমাদের জন্য ভালো একটা ওয়েকআপ কল ছিল বিফর ফাইনাল। হয়তো অমাদের নার্ভটা আরেকটু শক্ত হবে।

প্রথম ও তৃতীয় ব্যাটসম্যান ধারাবাহীক। মিডল অর্ডার আজকের ম্যাচে এক্সপোজ হয়ে কলাপস করলো। আনটেস্টেড থাকার কারণেই কি হল?

আনটেস্টেড এটা আমি বলব না। ওরা সুযোগ পেয়েছিল। মিডল অর্ডার যে এক্সপোজ্ড হয়নি তা না। জিম্বাবুয়ের সাথেও তারা সুযোগ পেয়েছিল কিন্তু আমরা ফেল করেছি। আজকেও আমরা ফেল করেছি। এটা অবশ্যই আমি বলবো…যে কোনো দিকেই যেতে পারে। যদি বলি কনসার্নের জায়গা আছে তা বললেও ভুল হবে না। আমি মনে করি টপ অর্ডারে সাকিব আল হাসান আসার পর আমরা যেটা চেয়েছি ঠিক সেটাই তারা ডেলিভারী দিতে পেরেছে। এখন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের একটু দায়িত্ব নিতে হবে। এমন না যে তারা অনুশীলনে যেটা চাচ্ছে সেটা হচ্ছে না। কিংবা নেটে যেটা চাচ্ছে সেটা হচ্ছে না। হয়তো করছে ঠিকই করছে কিন্তু মূল জায়গায় এসে এক্সিকিউশন ঠিক মতো হচ্ছে না। আমার কাছে মনে হয় মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। লাকও ফেবার করতে হবে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট তার অতীতে ফিরলো। মাঝে মাঝে এমন ওয়েকআপ কল কি ইতিবাচক?

এরকম অবস্থায় পড়ি তা অবশ্যই আমরা চাইবো না। আমরা অবশ্যই হারতে পারি। এভাবে অবশ্যই কেউ প্রত্যাশা করে না যে কেউ এভাবে হারবে। চার উইকেট পড়ার পরও আমাদের সামর্থ্য ছিল ওটাকে হেলদি করার। তাহলে হয়তো যারা ছিল তাদের জন্য ভালো হতো। ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস ভালো হতো। যেটা হয়েছে, ইটস অ্যা নাইস ওয়েকআপ কল যে আমাদের বাজে দিনে আমরা কতটা খারাপ খেলতে পারি। এটাও আমাদের জন্য জানা গেল। ফাইনাল ম্যাচে যে তাড়াতাড়ি দুটা উইকেট পড়বে না সেই গ্যারান্টি নেই। পরপর দুই বলে সাকিব-তামিম দুজনই আউট হয়ে যেতে পারে। কখন কিভাবে ব্যাটিং করতে হবে। আজকে আমরা না পারলেও কিছুটা হলেও আমাদের ধারণা পাওয়া গেল যে এ রানটাকে কতদূর নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

সাব্বির-নাসিরের কি সমস্যা মানসিক না টেম্পারমেন্টের ঘাটতি?

যে দুটো জিনিস বলেছেন এমনটা হতে পারে। মেন্টালি এই চাপটা নিতে পারছে কিনা, আরেকটা হচ্ছে টেম্পারমেন্ট। হয়তবা তারা রানটাকে বেশি পছন্দ করে, সময় কাটানোর চেয়ে মনে করে রানটা কুইক আসলে তাড়াতাড়ি সেট হয়ে যেতে পারে। ফার্স্ট ক্লাসেও যদি দেখেন তিন, চার উইকেট পড়ার পরো স্ট্রাইকরেট কিন্তু ১০০ থাকে। কাজেই ওই অভ্যাসটা আমাদের কম। এমনকি ওয়ানডে ম্যাচেও যে কখনো কখনো উইকেট পড়ে গেলে ছোট সময়ে জন্য উইকেটে সেট হয়ে রান করা, ওই অভ্যাসটা হয়তবা ন্যাচারালি আমাদের ক্রিকেটে একটু কম আছে। এখানে একটা ঘাটতি থাকতে পারে। আমার মনে হয় ওরা নিজেরাও খারাপ ফিল করছে আমার থেকেও।আমি চাইব যে ফাইনালের আগে এটা নিয়ে তারা চিন্তা করুক।

উইকেট কি কঠিন ছিল?

তামিম একটু আচমকা বাউন্সে আউট হয়েছে। এমন না যে সে রাশ শট খেলতে যেয়ে আউট হয়েছে। কিন্তু এরপরও তামিম অভিযোগ করেনি। সাকিব দুইটা শট খেলার পর সাকিবও ভাল ফিল করছিল। যারা মোটামুটি সময় কাটিয়েছে তারা বলেছে যে উইকেট ততটা খারাপ ছিল না। মুশফিকও কিন্তু আজ ভাল ব্যাট করছিল। ওই পাশ থেকে সমর্থন পায়নি। আমি আশা করছি যে এই ধরনের পরিস্থিতিতে তারা আরেকটু সময় কাটাক। আর উইকেটের কথা যেটা বললেন ভালো উইকেটই আমরা আশা করছি ওয়ানডে ম্যাচে। আজকে ব্যাটসম্যানরা যেটা বলেছে ভালো উইকেট কাজেই অভিযোগের জায়গা তো দেখি আর।

বিজয়কে আর সুযোগ দেওয়া হবে কিনা?

আসলে নিশ্চিত না। এখনো তো কেবল খেলাটা শেষ করে আসলাম। এটা নিয়ে ভাবার বিষয় আছে। বিজয়কে নিয়ে ত অনেক কথা হয়েছে, সে ঘরোয়া সব পর্যায়ে রান করেছে, বিপিএল বলেন, ফার্স্ট ক্লাস বলেন। আপনারাই তাকে এক্সপোজ করেছেন। তার উপর পূর্ণ আস্থা ছিল। তাকে নিয়মিত খেলিয়ে যাচ্ছি। সে যতক্ষণ আছে অবশ্যই আমরা তাকে ব্যাকআপ করছি। কঠিন সময় যেতে পারে। এমন না যে ফার্স্ট ক্লাসে রান করে এসেই আপনি আন্তর্জাতিক ম্যাচে রান করবেন। আমাদের ফার্স্ট ক্লাসের সঙ্গে একটা গ্যাপ অবশ্যই আছে।

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী থাকার কারণেই কি দলের এই পতন?

সত্যি কথা বলতে কি কাল রাতে বলেন না আজকেও সবাই যখন একসঙ্গে ছিলাম। কাল রাতেও যখন মিটিং হয়েছে। কারো ভেতর এমন দেখিনি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এমন থাকার (অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী) সুযোগ ছিল না,শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তো না-ই। যেটা বলতে পারেন আমরা খুবই বাজে ক্রিকেট খেলেছি। আমার কাছে মনে হয় এটা বলাই ঠিক। আবার এটা বলতে পারি যে একটা বাজে দিন গিয়েছে। আমি বলব বাজে ক্রিকেট খেলেছি।

সাকিব ওপরে খেলায় মিডল অর্ডারে কি গ্যাপ হয়ে গেছে?

এটা তো ধরেন আমি মনে করি তাদের জন্য সুযোগ। রিয়াদের কথা যদি ধরি সে অনেক দিন খেলেছে। সাব্বির রুম্মানও আজ ৫০টা ম্যাচ খেলে ফেলল। তাদের যে সামর্থ্য নাই তা না। টপ অর্ডারে আমরা যেটা আশা করিছে সেটা আজকে হয়নি বলে বেশ এক্সপোজড হয়েছে মিডল অর্ডার। অবশ্যই এতটা এক্সপোজড হবে কারোরই ভাবনাতে ছিল না। সাকিব তো ১০-১১ বছর পাঁচে খেলেছে এটা ঠিক। কিন্তু আমরা যেটা চেয়েছি তার প্রতিফলন আমরা প্রথম তিন ম্যাচে পেয়েছি। মিডল অর্ডারের দায়িত্ব সেটা নেওয়া। এমনত না যে সাকিবকে ঘিরেই খেলে যাব।  তাহলে তো সাকিবই থেকেই যাচ্ছে।

কোন মুহুর্তে মনে হয়েছিল ম্যাচটায় বাংলাদেশ জিততে পারবে না?

রিয়াদ যখন আউট হলো তখন মনে হচ্ছিল ২০০ রান করার সামর্থ্য আছে। মুশফিক আর রুম্মান যখন ব্যাট করছিল। তাদের দুজনেরই বড় ইনিংস খেলার সামর্থ আছে। একটা পর্যায়ে গিয়ে যখন ৭-৮ উইকেট পড়ে যাচ্ছে তখন বুঝতে পারছিলাম কতই বা আর করা যাবে। ভালো ইনিংস খেললে ১৩০-১৪০ বা ১৫০। এই রান করে এই উইকেটে খুব কঠিন হতো। ২০০-২২০ করলে ফাইট করা যেত। সত্যি কথা বললে চাইছিলাম ম্যাচটা হারলেও শেষ দিকের ব্যাটসম্যানরা রান করুক যাতে ফাইনালে আত্মবিশ্বাসটা থাকে।

নিয়মিত বোলারদে বল না দেওয়া কি একটা স্ট্র্যাটেজিক্যাল সিদ্ধান্ত?

শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আগে নাসির শুরু করেছিল, সাকিব করে না। শ্রীলঙ্কার শুরুর দু’জন ব্যাটসম্যান বাঁ-হাতি। কিন্তু আমি আমার মূল বোলারদের ব্যবহার করতে চাইনি, এক্সপোজ করতে চাইনি। যেহেতু ফাইনাল আমাদের খেলতে হবে। আবুল হাসানের সুযোগ ছিল। ওকে বেশি ওভার দিতে চেয়েছি। মুস্তাফিজকে আনার কারণ ছিল সে ৪৯ উইকেটে ছিল। একটা উইকেট পেলে ৫০ হতো। ওর ইচ্ছাতেই ওকে এনেছি। না হলে হয়তবা তাকেও আনতাম না। রুবেলকে তো করাইনি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।