আসুন, ট্রলই করি

অনন্ত জলিল— ঢাকাই চলচ্চিত্রের এসময়ের সবচেয়ে আলোচিত নায়ক। ২০১০ সালে ‘খোঁজ: দ্য সার্চ’ ছবির মধ্য দিয়ে দেশীয় চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তাঁর। প্রথম ছবি থেকেই নানাভাবে আলোচনার শীর্ষে তিনি।

সিনেমাতে আসার আগে পরপর তিনবার তাঁর প্রতিষ্টান রপ্তানিতে শীর্ষস্থান হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক নিয়েছিলেন। ‘খোঁজ – দ্য সার্চ’ এর গান খুব আলোচিত হয়েছিল, যদিও ছবিটা তেমন চলেনি। অনন্ত ওই সময় বিশাল বাজেটে ছবি নির্মান করতেন। তবে অভিনয় যথেষ্ট দূর্বল হওয়ায় ট্রলের পাত্র হতেন। ২০১২ সালে ‘মোস্ট ওয়েলকাম’ সুপারহিট হওয়ায়,বেশ আলোচিত হয়েছিলেন।

এরপর নি:স্বার্থ ভালোবাসা,মোস্ট ওয়েলকাম ২ নির্মান করেন। বলা যায়, এখন সিনেমা থেকে একটু দূরেই আছেন তিনি। বেশিরভাগ দর্শক তাকে ফিল্ম স্টার হিসেবে চিনলেও তিনি একাধারে সফল গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, সমাজসেবী ও শিক্ষানুরাগী।

অথচ, তার ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে সোশাল ওয়েবসাইটে হাসাহাসি, ট্রল কিংবা ব্যঙ্গ রসাত্মক গল্প-সল্প করাটা যেন সবার ফ্যাশন আর স্মার্টনেসের বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেনে না জেনে দিন-রাত এই মানুষটিকে নিয়ে আমরা কত হাসি ঠাট্টা করি, তার হিসেব নেই। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, তিনি সব কিছু জেনে শুনেও এসবে কখনো কান দেয়ার চেষ্টা করেন না, বরং নিজের কাজটা করে যান ঠিক মতই। সিনেমা স্টার হিসেবে হল বিমুখ দর্শককে হলে ফেরান। গার্মেন্টস মালিক হিসেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মীদের পাশে থাকেন। সমাজসেবী হিসেবে গরীব, দুস্থ ও বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান।

স্যাটেলাইটের আগ্রাসনে উচ্চবিত্ত এমনকি গ্রাম্য মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীও বাংলা ছবি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল অনেক আগেই। চলচ্চিত্র শিল্পে তখন একমাত্র ভরসা ছিল দেশের নিম্নবিত্ত শ্রেণী। ৩৫ মিমি ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণ, ঘোলাটে প্রিন্ট ও অস্পষ্ট সাউন্ড সিস্টেমে বিরক্ত হয়ে নিম্নবিত্তও ধীরেধীরে হল বিমুখ হয়ে যেতে লাগল। এ রকম এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শোনা গেল একটি নাম— অনন্ত জলিল। তিনি গতানুগতিক বাংলা চলচ্চিত্রকারদের পথে না হেঁটে নিজস্ব পথে হাঁটা শুরু করলেন। বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল চলচ্চিত্র এসেছে মূলত তার হাত ধরেই।

বলা যায়, অনন্ত জলিলের আগমনে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক ধরণের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। তার আসার আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এত কম সময়েই বাংলা চলচ্চিত্র টেকনিক্যালি এত এগিয়ে যাবে। চিরাচরিত সেই বড়লোক আর গরীবের ভালবাসার কাহিনী, স্বল্প বাজেট, ফোর্থ ক্লাস প্রিন্ট, বিরক্তিকর মারামারির দৃশ্যকে ছাপিয়ে ভাল প্রিন্ট, ভাল গল্প এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যয়বহুল ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের মত এ রকম অসম্ভব চিন্তা শুধু তার মাথা থেকেই এসেছে।

গাঁটের পয়সায় খরচ করা করে ভালো অ্যাকশন, সিনেমাটোগ্রাফি, কালার গ্র্যাডিং এবং ভালো প্রিন্টের ছবি বানালেন। এখানে কিন্তু টাকা খরচের পরিমান কম নয়। এত টাকা ইনভেস্ট করে টেকনিক্যালি সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে অনন্ত জলিল কতটুকু প্রফিট পাচ্ছেন, তা হয়ত জানা নেই। কিন্তু এটুকু জানি এতে অভাবনীয় লাভ হচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের।

কারণ, অনন্তর টাকা ঢালা মানেই দেশের অন্যসব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে দেওয়া। এখন যা তা চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেই হবে না, বরং টেকনিক্যালিও যেতে হবে অনন্তর সিনেমার কাছাকাছি! আর, অনন্ত জলিলের সেই দেখানো পথেই হাঁটছেন জাজ মাল্টিমিডিয়া-সহদেশের অন্যান্য পরিচালক-প্রযোজকরা।

এই তো গেল সিনেমার কথা। সিনেমার বাইরেও অনন্ত জলিলের আরেকটি বড় পরিচয় আছে, তিনি একজন সফল গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে সাড়ে ২৮ বিঘা জমির ওপর তৈরি করেছেন এজিআই গ্রুপ। এখানে পাঁচ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও অবদানের জন্য অনন্ত দুইবার সিআইপি নির্বাচিত হয়েছেন।

জেনে অবাক হতে হয়, বছর খানেক আগে দেশে যখন প্রায় সব গার্মেন্টসে শ্রমিক ধর্মঘট হয়, জ্বালাও পোড়াও হয়, আন্দোলন হয়, তখন অনন্ত জলিলের গার্মেন্টস পাহারা দেয় খোদ সেই গার্মেন্টসের শ্রমিকরাই! কারণ একটাই, ওদের গার্মেন্টস মালিক একজন বড় মাপের মানুষ। সুখে দুঃখে সব সময় ওদের পাশে ছিলেন। ঠিকঠাক বেতন বোনাস দিয়েছেন।

অনন্ত জলিল শুধু চলচ্চিত্রের পর্দায়ই নয়, বরং বাস্তবের একজন সত্যিকার নায়ক হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারবার। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা আনোয়ার হোসেনে থেকে শুরু করে রাজধানীর একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র রাসেল, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ ছাত্র ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত আহনাফ, ১২ বছরের শিশু সুজনকে নিজ খরচে ভারতে পাঠানো সহ আরও কতশত জনের পাশে যে তিনি সাহায্যের নেশায় ছুটে গিয়েছেন, তার হিসেব নেই। এছাড়া দেশের ফিল্ম সংশ্লিষ্ট লোকেদের খারাপ সময়ে পাশে থেকে সাহায্য করেছেন, কত বড় বড় অভিনেতা আছেন, যাদের অসুস্থতার সময়ে তাদের সহকর্মীরা পাশে দাঁড়ায়নি। শুধু এই একটি মানুষই সব সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন।

সম্প্রতি, দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বন্যার্তদের ত্রান সহায়তা দিতে তিনি হেলিকপ্টারযোগে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে পৌঁছে যান। সেখানে তিনটি ইউনিয়নের বন্যা কবলিত প্রায় ২৪’শ পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেন। চিলমারীর হেলিপ্যাডে অবতরণ করার পর অনন্ত জলিল বলেন, ‘বন্যা কবলিত মানুষদের সহায়তা করতে অামি এসেছি। এটা কোনও দয়া নয়, এটা দুর্গত মানুষদের অধিকার।’

সর্বশেষ অনন্ত জলিল যা করলেন, সেটা দেশের প্রতিটা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। দুই ঘাতক বাসের চাপায় হাত হারানো ও মারা যাওয়া রাজীব হোসেনের দুই ভাই আবদুল্লাহ হৃদয় (১৪) এবং মেহেদী হাসান বাপ্পীর (১৫) পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ চালানোর দায়ভার নিচ্ছেন অনন্ত।

আজকে অনন্তকে নিয়ে যারা ট্রল করছেন, হাসি-ঠাট্টা করছেন, তারা একবারও ভেবে দেখেছেন কি, বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় পরিবর্তনে কিংবা বিপদে-আপদে দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাওয়া মহান হৃদয়ের অধিকারী এই অনন্ত জলিলের কোন অবদানকে আমরা অস্বীকার করব? পর্দায় তো আমরা অনেক নায়ককেই দেখেছি। বাস্তবের এমন সুপারহিরোদের দেখা রোজ রোজ মেলে না!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।