আরো এগিয়ে যান, কিং খান

নব্বই দশকের প্রথম ভাগ, বলিউড পার করছে সুবর্ণ সময়। হিন্দি সিনেমার ড্রিম গার্ল খ্যাত হেমা মালিনী, তাঁর প্রযোজিত ছবিতে সিরিয়ালের এক অভিনেতা কে নায়ক রুপে নিয়ে আসেন চলচ্চিত্রের পর্দায়, একই সমত চুক্তিবদ্ধ হন ‘রাজু বান গ্যায়া জেন্টালম্যান’ ছবিতে।

ছবির নায়িকা তখনকার হার্টথ্রুব জুহি চাওলা প্রথম দর্শনেই তাকে নাকচ করে দেন, তিনি বলেন, ‘এই রকম এলোমেলো চুল, লিকলিকে শরীর – একে দিয়ে চলবে না।’ বছর ঘুরতেই তৃতীয় চুক্তিবদ্ধ হওয়া ছবি ‘দিওয়ানা’ প্রথম মুক্তি পায়। ছবির সাফল্য আর নবীন হিসেবে আলোচিত হন, পুরস্কারও ঘরে তোলেন।

সেলুলয়েডের পর্দায় দুই সিনিয়র দুই খানের ফিরিয়ে দেওয়া সুপারহিট ছবি বাজিগর ও ডর করে রাতারাতি সেই অভিনেতা হয়ে যান বলিউডের জনপ্রিয় তারকা। সাফল্যের সূর্য সেই যে উদয় হয়েছে,তা আজো অস্ত যায়নি। হিন্দি সিনেমায় নিজের নাম সমুজ্জ্বল করেছেন, সুপারস্টার খেতাব পেয়েছেন। বনে যান বলিউড বাদশাহ। সিনেমায় তিনি কখনো ‘সাত্তার মিনিট,সাত্তার মিনিট হ্যায় তুমহারে পাস’ বলা কবির খান, কখনো নাসার কর্মকর্তা মোহন হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন।

সীমান্ত পেরিয়ে ভালোবাসার জয়গান গাওয়া বীর প্রতাপ সিং কিংবা সর্ষের ক্ষেতের মাঝে দুই হাত প্রসারিত করে ‘তুঝে দেখা তু হ্যায় জানা সানাম’ গেয়ে রোমান্টিক জগতে নিজেকে করেছেন অনন্য।শরৎ সাহিত্যের ‘দেবদাস’ হয়েছেন,আবার হয়েছেন যোদ্ধা অশোকা। তিনি বলিউডের অত্যন্ত জনপ্রিয় নায়ক কিং খান খ্যাত ‘শাহরুখ খান’।

আশির দশকের শেষে ‘ফৌজি’ সিরিয়াল দিয়ে অভিনয় জগতে আসেন শাহরুখ, ‘সার্কাস’ সিরিয়ালে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার মাধ্যমে নজরে পড়েন হেমা মালিনীর। ‘দিল এশনা হ্যায়’ ছবিতে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করলেন, প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি ‘দিওয়ানা’।

প্রথম ছবির সাফল্যের পর বাজিগর ও ডরের মত সাড়া জাগানো ছবিতে অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্টিত করেন। এই সময়ে তাঁর অন্যান্য ছবিগুলোর মধ্যে চমৎকার, আর্মি, রাজু বান গ্যায়া জেন্টালম্যান, রাম জানে, কাভি হাঁ কাভি না,আনজাম অন্যতম।

সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র মত ইতিহাস সৃষ্টিকারী ছবি দিয়ে। এই ছবির পর রোমান্টিক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্টিত হন, একই বছর উপহার দেন ‘করন অর্জুন’-এর মত হিট ছবিও। এরপর ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ও ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’ ছবির সাফল্যে, নব্বই দশকে পার করলেন সুবর্ণ সময়, সঙ্গে আরো রয়েছে কয়লা, দিল সে, ইয়েস বস, বাদশাহর মত সিনেমা।

নব্বই দশকের জয়রথ নিয়ে এর পরের দশকে শুভ সূচনা করেন ‘মোহাব্বতে’ সিনেমা দিয়ে, সঙ্গে রয়েছে বিশেষ ছবি ‘হে রাম’ ও তারকাবহুল ছবি ‘কাভি খুশি কাভি গাম’। এরপর দেবদাস, কাল হো না হো ও বীরজারা এই ছবি তিনটি যুক্ত হল বর্ণিল ক্যারিয়ারে সফল পালক। ম্যায় হু নার পর ‘স্বদেশ’-এর মত সিনেমা, এই সিনেমায় নিজেকে পরিক্ষীত করলেন।

অমিতাভ বচ্চনের বিখ্যাত সিনেমা ‘ডন’ এর রিমেকে নিজের চিরাচরিত ইমেজ ভেঙে উপস্থিত হলেন।যথারীতি এইখানেও তিনি সফল। এর ঠিক পরের বছরেই ‘চাক দে ইন্ডিয়া’র মত ছবি, ক্যারিয়ারে সাফল্যর গ্রাফ জ্বলজ্বল করে উঠছে, সঙ্গে তো রয়েছে ‘ওম শান্তি ওম’-এর মত ছবি। অন্যরকম প্রেমের ছবি ‘রাব নে বানা ডে জোড়ি’র পর ভিন্নধর্মী ছবি ‘মাই নেম ইজ খান’। এই ছবির ‘রিজওয়ান খান’ এক কথায় অনবদ্য।

প্রায় দুই দশকের সাফল্যের পর যাত্রা করলেন এই দশকে। শুরুতেই ‘রা-ওয়ান’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, ছবি ব্যবসা করলেও প্রত্যাশা পূরন হয় না, একই বছর ‘ডন ২’ তে অবশ্য প্রতিভার আলো ছড়িয়েছিলেন। এরপর একে একে মুক্তি পেলো যাব তক হ্যায় জান, চেন্নাই এক্সপ্রেস, হ্যাপি নিউ ইয়ার, দিলওয়ালে।

সিনেমা ব্যবসা করছে ঠিক, কিন্তু দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে শাহরুখের সেই সুবর্ণ সময় গুলো। ‘গৌরব’ হয়ে ফ্যান ছবিতে নিজেকে আবার পরিক্ষীত হলেও ব্যবসায়িকভাবে প্রত্যাশা পূরন হলো না, ‘ডিয়ার জিন্দেগি’তে অবশ্য দর্শকরা প্রশংসা করেছিল। এই বছর ‘রাইস’ মোটামুটি সাড়া জাগালেও ‘জাব হ্যারি মেট স্যাজাল’ সুপারফ্লপ।

ক্যারিয়ারে অমাবস্যা যেন কাটছেই না। এই অমানিশা কাটিয়ে নিজেকে আবার সফল প্রত্যাবর্তন করবেন, এটাই প্রত্যাশা। শাহরুখ খান – কাজল জুটি, বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি। এছাড়া জুহি চাওলা, মাধুরী দীক্ষিত, রানী, ঐশ্বরিয়া, প্রীতি থেকে প্রিয়াঙ্কা, কারিনা, দীপিকা, আনুশকা সবার বিপরীতেই অভিনয় করেছেন।

তরুণ শাহরুখ ও স্ত্রী গৌরী

অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক রুপে সফল তিনি। প্রথম প্রযোজিত ছবি ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ অবশ্য সাড়া ফেলতে পারেনি। দ্বিতীয় ছবি ‘অশোকা’ও ফ্লপ, এরপর ‘চলতে চলতে’ হিট। ম্যায় হু না দিয়ে রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট সংস্থা চালু করেন, এইখান আরো নির্মিত হয় কাল, ওম শান্তি ওম সহ আরো কয়েকটি ছবি।

তিনি এক গানে প্রায় ৩১ জন তারকার সমাগম ঘটান, যা বিরল। তাঁর সহ প্রযোজনায় শীঘ্রই মুক্তি পাবে ‘ইত্তেফাক’। এছাড়া আইপিএলের মাঠে ‘কলকাতা নাইট রাইডার্স’-এর মালিক তিনি। ‘কোওন বনেগা ক্রোড়পতি’র এক আসরে উপস্থাপনাও করেছেন।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে ২০০২ সালে পদ্মশ্রী পান। ফিল্মফেয়ারের আসরে সর্বোচ্চ আটবার সেরা অভিনেতার পুরস্কার সহ মোট ১৪ টি পুরস্কার পান, এছাড়া পেয়েছেন আরো বহু পুরস্কার। স্কটল্যান্ড থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন, আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রেও নিজেকে প্রভাবশালী তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তবে অধরা থেকে গেছে জাতীয় পুরস্কার, এটাও দ্রুত ধরা দেবে আশা করি। ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন গৌরী খানকে, দুই যুগের ও বেশি সময় ধরে সংসার করে যাচ্ছেন। সুখী এই দম্পতির রয়েছে তিনটে সন্তান। ব্যক্তিজীবন ও চলচ্চিত্র জগতে নিজেকে আরো বর্ণিলতর করুক, এই প্রত্যাশা রাখি।

১৯৬৫ সালের দুই নভেম্বর দিল্লীতে জন্ম হয় এই মহান তারকার। সিনেমাতে আসার আগেই মা-কে হারিয়েছেন। মা সাফল্য দেখে যেতে পারেননি, এই আক্ষেপ শাহরুখের সব সময়কার।

বলা হয়, অমিতাভ বচ্চনের পর তার মাপের অভিনেতা নাকি আসেনি বলিউডে। যদিও, সাম্প্রতিক সময়ে নামের সাথে খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না তিনি। কিন্তু, নামটা যখন শাহরুখ খান, হতাশার অন্ধকার কাটতে আর কতক্ষণ। আরো এগিয়ে যান, কিং খান!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।