আমি সেই বাবা, যে আয় করেও পরিবারের সম্মান পাই না: রোহিত শেঠি

রোহিত শেঠি, ভারতের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল পরিচালক, তাঁর বিখ্যাত ‘গোলমাল’ সিরিজের চতুর্থ কিস্তি ‘গোলমাল অ্যাগেইন’ নিয়ে আবারো বড় পর্দায় ফিরেছেন এবছরই। দর্শকদের মাঝে রোহিতে’র কমেডি ঘরানার বাণিজ্যিক সিনেমাগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও চিত্রসমালোচকদের কাছে এগুলো নিতান্তই ‘ব্রেইনলেস’ সিনেমা। আর তাঁর কথা অনুযায়ী তিনি সিনেমা তৈরি করেন শুধুই দর্শকদের জন্য, সমালোচকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তাকে খুব একটা ভাবায়না।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ‘গোলমাল অ্যাগেইন’, সালমান খানের সাথে কাজ করার সম্ভাব্যতা, বলিউডে দুই নায়ককেন্দ্রিক সিনেমার স্বল্পতাসহ আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ইনইউথ.কমের সাথে খোলামেলা কথা বলেন রোহিত শেঠি। সেই সাক্ষাৎকারের কিয়দংশ তুলে ধরা হল অলিগলি.কমের পাঠকদের জন্য।

‘গোলমাল ৩’ এবং ‘গোলমাল অ্যাগেইন’-এর মাঝে এত দীর্ঘ বিরতি কেন?

‘গোলমাল ৩’ শুটিংয়ের সময় প্রথম আইডিয়াটা মাথায় আসে, কিন্তু কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। তবে মৌলিক গল্পটি তৈরিই ছিল, এরই মাঝে আমরা ‘সিঙঘাম’-এর কাজ শুরু করি। এরপর ‘বোল বচ্চন’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’-সহ আরও অনেকগুলো সিনেমা করলেও এটির কাজ আর এগোয়নি। ‘সিঙ্ঘম রিটার্নস’ নির্মাণের পর গল্পটি নিয়ে আবার কাজ করা শুরু করি। শুরু থেকেই ‘হরর কমেডি’ ঘরানায় ছবিটি নির্মাণের ইচ্ছা ছিল।

‘হরর কমেডি’ ঘরানার ছবি নির্মাণে আগ্রহী হলেন কিভাবে?

আমার মুখাবয়ব, যখনই আমি আয়নায় নিজেকে দেখি, আমার মনে হয় একটি হরর কমেডি ছবি বানাতে হবে (হাসি)। বলিউডে বেশ অনেকদিন ধরেই ‘হরর কমেডি’ ঘরানায় বড় মাপের কোন কাজ হয়নি। দক্ষিণী সিনেমায় এই জনরা-তে নির্মিত বেশকিছু সিনেমা সফলতা পেলেও বলিউডে খুব কম কাজ হয়েছে। তাই আমার মনে হয়েছে, এই ধরনের কাজ দর্শক গ্রহণ করবে। এমনকি আমাদের ছবির ট্রেইলারে থাকা ভৌতিক উপাদানগুলো দর্শকদের মাঝে সারা ফেলেছে।

‘গোলমাল’ সিরিজকে চতুর্থবারের মতো দর্শকদের সামনে নিয়ে আসার মিশনটি কতটা কঠিন ছিল?

‘গোলমাল অ্যাগেইন’-এর কাহিনী লিখতে সিরিজের অন্যান্য পর্বগুলোর চেয়ে অনেক বেশী কষ্ট করতে হয়েছে। কাহিনী লিখতে প্রায় ৩ বছর লেগেছে। কাহিনীর সাথে সাথে টেকনিক্যাল দিকগুলোকেও উন্নত করার চেষ্টা করেছি। আমার চাওয়া, দর্শক যেন কোনোভাবেই সাত বছর আগের ‘গোলমাল ৩’ এর সাথে এর মিল খুজে না পায়। আমরা শুধু সিরিজ আর ক্যারেকটার গুলোর জনপ্রিয়তার ফায়দা লুটতে চাইনা, বরং দর্শকদের একটি ভালো কাজ উপহার দিতে চাই।

মাল্টিস্ট্যারার ছবি নির্মাণের জন্য বলিউডের খ্যাতি রয়েছে, কিন্তু বর্তমানে এই ধরণের কাজ কম হচ্ছে কেন?

আমিও ঠিক জানিনা কেন এই ধরণের ছবি আরও বেশী নির্মিত হচ্ছেনা। বাণিজ্যিক দিক থেকেও এই ধরণের ছবিগুলোর লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে, কেননা দর্শকরা প্রিয় তারকাদের একত্রে কাজ করতে দেখতে ভালবাসে। অজয় দেবগণ, অক্ষয় কুমার, সুনিল শেঠি নিয়মিতই মাল্টিস্ট্যারার ছবিতে কাজ করছেন। আশা করি, নতুন প্রজন্মের অভিনেতারাও দুই নায়ককেন্দ্রিক বা মাল্টিস্ট্যারার ছবিতে কাজ করবেন। কারণ, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শক এই ধরণের কাজের জন্য মুখিয়ে থাকে।

আপনি কি মনে করেন, নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীরা বলিউডের মৌলিকত্ব সম্পর্কে কম ধারণা রাখেন?

আমি বরুণের সাথে কাজ করেছি এবং তার সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। আমি মনে করি, নতুন প্রজন্মের অন্যতম অভিনেতা হিসেবে সে বলিউড নিয়ে বেশ ভালো জ্ঞান রাখে। সবধরনের ছবি করার মাধ্যমে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। এছাড়াও রণবীর সিং-এর সাথে আমি একটি ছবি করছি। এই দুজনের সাথে কাজ করার সুবাদে আমি বলতে পারি, তারা বলিউড সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা রাখে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করে। তাই নতুন প্রজন্মের তারকারা বলিউড নিয়ে অন্ধকারে আছে এটি বলা অত্যুক্তি বৈ কিছু নয়।

সালমান খানকে আপনার সিনেমায় দেখতে চাই…

আসলে এটা অনেকেরই চাওয়া। সালমান অনেক বড় মাপের একজন সুপারস্টার। তাই সঠিক স্ক্রিপ্টের অপেক্ষায় আছি। ভালো স্ক্রিপ্ট পেলে অবশ্যই কাজ করব।

‘সিঙ্ঘম’ এবং ‘দাবাং’ নিয়ে একটি ক্রসওভার সিনেমা বানানোর কোন  ভাবনা আছে কি?

একটা ভাবনা অবশ্যই আছে, তবে এখনই কিছু বলতে চাইনা। এরকম কাজ পশ্চিমের ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে হরহামেশাই হচ্ছে। আমাদেরও ক্রস-ব্র্যান্ডেড সিনেমা বানানো উচিত। তবে এখনো কোনো স্ক্রিপ্টের কাজ শুরু করিনি, তাই এই ধরণের সিনেমা কবে নাগাদ দর্শকরা দেখতে পাবেন, সেটি বলা অসম্ভব।

‘রাম লক্ষণ ২.০’-এর কাজ কতদূর এগিয়েছে?

স্ক্রিপ্টের খসড়া তৈরি হয়েছে, আমি ছবিতে দুজন বড় মাপের নায়ককে নিয়ে কাজ করতে চাই। ছবিটি অবশ্যই তৈরি করব, তবে কবে নাগাদ মুক্তি পাবে বা কারা অভিনয় করছেন সেগুলো এখনো ঠিক হয়নি।

বাণিজ্যিক দিক থেকে ভারতের সবচেয়ে সফল পরিচালকদের মধ্যে আপনি অন্যতম, প্রত্যাশার চাপ কতটা অনুভব করেন?

চাপ অবশ্যই আছে, আর সেই চাপকে কঠোর পরিশ্রম দিয়ে মোকাবেলা করতে চেষ্টা করি। ‘গোলমাল অ্যাগেইন’ এর দর্শক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশ স্নায়ুচাপে ভুগছি, তবে ছবির বিষয়বস্তুর উপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ছবিটি নির্মাণ করতে অনেক পরিশ্রম করেছি, বাকিটা দর্শকের হাতে।

‘গোলমাল’ সিরিজের পঞ্চম কিস্তি নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

‘গোলমাল অ্যাগেইন’ এর সফলতার উপরই সবকিছু নির্ভর করছে। মানুষ যদি এটি পছন্দ করে, তাহলে অবশ্যই ‘গোলমাল ৫’ নির্মাণ করব। ‘গোলমাল অ্যাগেইন’ এর পরিচালক হিসেবে বলতে পারি যে, ‘গোলমাল’ সিরিজের ভক্তদের ছবিটি অবশ্যই ভালো লাগবে। আমার ছবির ভক্তদের মাঝে একটি বড় অংশই হচ্ছে শিশু-কিশোর, আমি তাদের হতাশ করতে চাইনা।

এ বছর ব্যবসাসফল ছবির সংখ্যা হাতে-গোনা, তবে সম্প্রতি ‘জুড়ুয়া ২’ বক্স অফিসে সাফল্যের দেখা পেয়েছে। এটাকে কিভাবে দেখেন?

আমরা (আমি এবং অজয়) ‘জুড়ুয়া ২’ এর সফলতাই চেয়েছিলাম, কেননা এটাই শুরু। দৃশ্যপটের পরিবর্তনের জন্য শুরুটা খুব জরুরী, ‘জুড়ুয়া ২’ সেই কাজটাই করেছে। ‘জুড়ুয়া ২’ এর মাধ্যমে দর্শক আবার সিনেমাহলে ফিরে এসেছে। এটি ‘গোলমাল অ্যাগেইন’ কেও সাফল্য পেতে সাহায্য করবে।

বক্স অফিসে আপনার ছবিগুলো বরাবরই সফল হলেও, গণমাধ্যমের একটি অংশ সবসময়ই আপনার ছবির সমালোচনায় মুখর থাকে। এ বিষয়টিতে আপনার মন্তব্য কি?

আমার অবস্থা হচ্ছে পরিবারের সেই বাবাটির মতো, যে পরিবারের উন্নতির জন্য সব কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করে নেয়, পরিবারের জন্য আয় করে। তবুও পরিবার তাকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়না। আমি চাই, দর্শক সিনেমাহলে আসুক, ছবি দেখুক। ছবি কত আয় করল সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটিই শেষ কথা নয়। ছবিটি কত সংখ্যক মানুষ দেখছে, সেটির ভিত্তিতে ছবির বিচার হলেই গণমাধ্যমের রুঢ় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে।

কোন তারকার সাথে কাজ করতে মুখিয়ে আছেন?

অমিতাভ বচ্চনের সাথে কাজ করতে চাই। ভালো স্ক্রিপ্টের অপেক্ষায় আছি। আশা করি, দর্শকদের দারুণ একটি কাজ উপহার দিতে পারব।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।