আমি সুচিত্রা তুমি শশী হে

উত্তম কুমারের শেষ শয্যার পাশ থেকে উঠে ফিরে গেলেন কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫২/৪/১ ঠিকানার বাড়িতে। যার নাম এখন ‘বেদান্ত’। সেই যে আড়ালে গেলেন, তারপর ফিরলেন মাত্র একবারই, স্বেচ্ছায়। ১৯৮০ সালের পর ১৯৮২।

রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে।

শেষবার তাকে সিলভার স্ক্রীনে দেখা গিয়েছিল ১৯৭৮ সালে। মঙ্গল চক্রবর্তীর ‘প্রণয় পাশা’ চলচ্চিত্রে তিনি শেষ অভিনয় করেছিলেন। তারপর তিনি দেখতে কেমন হয়েছেন এই কৌতূহল ছিল সবার কাছে। মহানায়কের মহাপ্রয়ানের দিন মধ্যরাতে যান।

তখন কোনো ক্যামেরাম্যান তাঁকে লেন্সবন্দী করতে পারেননি। উপস্থিত গুঁটিকয়েক মানুষ দেখেছিলেন। সবার আড়ালে থাকা তিনি সবার সামনে ধরা দিলেন আবার আচমকাই ১৯৮২ সালে রবীন্দ্রসদনে কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে।

বিগত যৌবনা কিছুটা হলেও ব্যাক্তিত্বে সেদিন রবীন্দ্র সদন ঝলমল করে উঠল। বিদেশি শ্যাম্পু করা এলোচুলে ঝোলা দুলে কাঁচপোকা টিপে অতলস্পর্শী কাজলনয়না সুপারস্টার মিসেস সেন। তাকে দেখতেই ভিড় জমে গেল। যদিও সেদিনকার সকাল  ন’ ঘটিকার শোয়ে সীমিত দর্শকদের আমন্ত্রণ অনুমতি ছিল।

আরেক বিশিষ্ট অতিথি ছিলেন সেদিন কাপুর পরিবারের চিরহরিৎ নায়ক শশী কাপুর। মিসেস সেনকে দেখেই নমস্কার করলেন। শশীকে দেখে আরও হাসিতে ঝলমলিয়ে উঠলেন সুচিত্রা। সেই ভুবনভোলানো হাসি ধরা থাকল ক্যামেরাম্যানদের ছবিতে ছবিতে। শশী কাপুর পরিবারের বলিউডের সবচেয়ে ভদ্র মার্জিত নায়ক ছিলেন তাই সুচিত্রাও শশীকে পছন্দ করতেন। শশীও শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালোবাসায় বরণ করে নিলেন অসূর্য্যস্পর্শাকে।

এখানে যদি আমরা ফিরে যাই ‘সপ্তপদী’র সেই ওথেলো ডেসডিমোনার নাট্যদৃশ্যে ডেসডিমোনার চরিত্রে সুচিত্রার কন্ঠদান করেন শশীজায়া জেনিফার কাপুর। যদিও ডেসডিমোনার পাঠ জেনিফার কাপুর বলুক, সুচিত্রা চাননি। এ জন্য তিন মাস শুটিং বন্ধ ছিল।

নিজের আত্মবিশ্বাস ধাক্কা খাক, সুচিত্রা চাননি। তিনি নিজেই বলতে চেয়েছিলেন ডেসডিমোনার চরিত্রে। কিন্তু ‘সপ্তপদী’ ছবিটা শেষ করার তাগিদ থেকেই। আফটার অল শিল্পী তো। তা ছাড়া প্রযোজক উত্তম কুমার হওয়ায় মেনে নেন সুচিত্রা।

উত্তমের ওথেলো চরিত্রে ইংরাজীতে কন্ঠদান করেন উৎপল দত্ত। সুচিত্রার জেনিফার কাপুর। শশী সুচিত্রা কানেকশন জেনিফার কাপুরের মাধ্যমেও।

শশী সুচিত্রা দুজনে করলেন করমর্দন সৌহার্দ্য বিনিময়।

রাজ কাপুর বোম্বাই থেকে সুচিত্রার বাড়িতে সটান চলে গিয়ে সুচিত্রার পায়ের সামনে বসে গোলাপ দিয়ে বলেন, ‘মিসেস সেন আমার ছবিতে কাজ করুন।’ সুচিত্রা রাজ কাপুরকে তাঁর বাড়ি থেকে বের করে দেবার ক্ষমতা রেখেছিলেন।

সপ্তপদী সিনেমার একটি দৃশ্য

সুচিত্রার এই না করা নিয়ে ঘনিষ্ঠদের কাছে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার পিত্তি জ্বলে গিয়েছিল। ও পুরুষ মানুষ নাকি, মেয়েদের পায়ের কাছে বসে, দূর। আর তাই না বলে দিতে কোন দ্বিধা করিনি।’ সুচিত্রা তাঁর ছোটো ভগ্নীপতি বারীন ধরকে চোখের ইশারা করে বলেন রাজ কাপুরকে বাড়ির বাইরের পথ দেখিয়ে দিতে।

কিন্তু, শশী সেগুলো মনে রাখেননি চলে আসেন সুচিত্রার সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময় করতে। যেখানে আর কে ব্যানারের অফার ফিরিয়ে দেন সুচিত্রা। শশী কাপুর অসম্ভব ভদ্র রাজ কাপুরের মত গায়ে পড়া ছিলেননা বলে সুচিত্রাও ভালোবেসে সেদিন কথা বলেন শশীজির সঙ্গে।

পরদিন সমস্ত খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বহুবছর পর অন্তরালের সুচিত্রা প্রকাশ্যে এলেন হেডলাইন হল এই ছবিগুলি সমেত। ভূপেন হাজারিকা-ও রয়েছেন পেছনে ছবিতে।

শশী কাপুরের প্রয়ানে এই বিশেষ লেখা।  চার ডিসেম্বর, ৭৯ বছর বয়সে মারা যান বলিউডের এই কিংবদন্তি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।