আমি নিজের কাছে সৎ থাকতে চাই: মুশফিক

সর্বশেষ ২০০৬ সালের পর প্রথমবারের মত টেস্ট সিরিজ খেলতে বাংলাদেশ সফরে আসছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। প্রায় ১১ বছরের ব্যবধান। এর মধ্যে পাল্টে গেছে অনেককিছু। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব ক্রিকেটের বড় শক্তি। এমনকি দেশের মাটিতে নিজেদের দিনে দলটি এখন যে কাউকেই হারিয়ে দিতে সক্ষম। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে তাই জয় ছাড়া অন্য কিছুই ভাবছেন না অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। ক্রিকেট বিষয়ক ভারতীয় গণমাধ্যম ক্রিকবাজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যাটিং, উইকেটকিপিং, অধিনায়কত্বসহ নানা বিষয় বাদেও অস্ট্রেলিয়া সিরিজ নিয়ে কথা বলেছেন মুশফিকুর রহিম।

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ অনেক বেশি উন্নতি করা একটি দল। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে সেটা দেখা যাচ্ছে না। দলে কোন লেগ স্পিনার অথবা সত্যিকারের ফাস্ট বোলার নেই গত ছয় বছর যাবত আপনি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ সময়ে কতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

– আপনি যেটা বললেন, তেমন ধরনের খেলোয়াড় না থাকলে টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরমেন্স করাটা বেশ কঠিন। আপনি কত ভাল খেলেন সেটা কোন বিষয় নয়, একটা টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে ২০ উইকেট নেয়ার মত খেলোয়াড় আপনার দলে থাকতে হবে। যে কোন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই এটা দরকার। যেহেতু আমাদের সত্যিকারের একজন লেগ স্পিনার কিংবা সত্যিকারের ফাস্ট বোলার নেই তাই সম্ভবত এ দিক থেকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। তবে একই সঙ্গে আমরা গত দুই-তিন বছরে মুস্তাফিজ এবং মিরাজের মত খেলোয়াড় তৈরী করতে পেরেছি। আগামী দুই-তিন বছর তারা ভাল খেলতে পারলে আশা করি এটা ভাল একটা টেস্ট হতে আমাদের জন্য সহায়ক হবে। অন্য ফর্মেটে আপনি দুই ঘন্টা ভাল খেলতে পারলেই ম্যাচ জিততে পারবেন। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচ জিততে আপনাকে পাঁচ দিন, সেশন বাই সেশন ভাল খেলতে হবে। এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের সম্ভবত এক/দুই বছর সময় লাগবে এবং এরপর আমরা শক্তিশালী একটা দলে পরিণত হতে পারি।

বাংলাদেশ দলের অন্যতম এক জন ব্যাটিং স্তম্ভ হিসেবে আপনাকে বিবেচনা করা হয়। তবে একজন অধিনায়ক হিসেবে ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে আপনি কার উপড় ভরসা করেন?

– আমি সব সময়ই আমার ওপেনারদের দিকে তাকিয়ে থাকি। এক কথায় বলতে গেলে তামিম ইকবাল অসাধারণ। গত তিন-চার বছর যাবত সে যেভাবে ব্যাটিং করছে এবং ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে বিশ্ব ক্রিকেটে তা খুব বেশি দেখা যায় না। তার মত একজন দলে থাকাটা আমাদের জন্য এক ধরনের অনুপ্রেরণা। দলে আছেন সাকিব, মাহমুদুল্লাহ। এছাড়া সৌম্য এবং মোসাদ্দেকের মত তরুণ খেলোয়াড়রাও খুব পিছিয়ে নেই। মাঝে মুমিনুল হক এবং সত্যি কথা বলতে গেলে টেস্ট খেলুড়ে বেশ কিছু দলের চেয়ে আমাদের ব্যাটিং ইউনিট ভাল। টেস্ট কিংবা অন্য যে কোন ফর্মেটেই আমাদের শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানই বেশ ধারাবাহিক। আমি মনে করছি প্রত্যেক খেলোয়াড়ই ব্যক্তিগতভাবে অনেক উন্নতি করেছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে এটা দলের জন্য সহায়ক হবে। আমাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমরা টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ খুব বেশি পাই না এবং যখন খেলতে নামলে কঠিন হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া দল আসায় আমি অত্যন্ত খুশি এবং আমরা এজন্য প্রস্তুত। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য আমাদের প্রস্তুতি খুবই ভাল ।

আপনার দলের সবাই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবার টেস্ট খেলতে যাচ্ছে। আপনার প্রত্যাশা কি?

– ইংল্যান্ড আসার সময় কেউই আমাদের গণনায় ধরেনি কিংবা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করতে পারব সেটাই ভাবেনি, জয়তো অনেক দূরের কথা। স্পিনের বিপক্ষে তারা কতটা দুর্বল সেটা কোন বিষয় নয়, উপমহাদেশের মাটিতে তাদের রেকর্ড খুবই ভাল। এর আগে আমরা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ দিন লড়াই করতে পারতাম না। কিন্তু গত দুই তিন বছরে আমাদের দলে কিছু মেধাবী খেলোয়াড় এসেছে, যারা বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়ী হতে আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। পাঁচ দিনই আমরা ভাল ক্রিকেট খেলতে পারি – এখন সে আত্মবিশ্বাস এখন আমাদের মধ্যে আছে। আমরা যদি হোম কন্ডিশন ভালভাবে কাজে লাগাতে পারি এবং আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী খেলতে পারি তবে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অসম্ভব নয় বলে আমি মনে করি। সত্যি বলতে আমরা আমাদের সেরাটা খেলতে পারলে বিশ্বের যে কোন দলকে হারানোর ক্ষমতা আমাদের আছে। একটা সময় ছিল আমাদের জিততে হলে নিজেদের ভাল খেলতে হতো আর প্রতিপক্ষকে খুব খারাপ খেলতে হতো। কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আমরা কিছু ওয়ানডে খেলেছি। কিন্তু কোন টেস্ট ম্যাচ খেলিনি। এটা হবে বড় একটা সিরিজ। আমরা সব সময়ই শুনে আসছি যে অস্ট্রেলিয়া আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে। তাদের বিপক্ষে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে খেলতে আমরাও প্রস্তুত।

এত কঠোর পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা কিভাবে পেলেন?

– সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হচ্ছে আপনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের বাস। তবে আমরা মাত্র গুটি কয়েক জন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাচ্ছি। আমি এখনো মনে করি আমার চেয়ে অনেক বেশি মেধাবী ক্রিকেটার আমাদের দেশে আছে। কিন্তু আমাদের হাতে যা আছে তা নিয়েই আমাদের খেলতে হবে এবং দিনকে দিন উন্নতির চেষ্টা করতে হবে। আমি নিজের কাছে দায়বদ্ধ। আমি সব সময়ই একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে কাজ করতে চেষ্টা করি এবং ফল নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি না। কেননা এটা আমার হাতে নেই। ভাল খেললেই উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এটা আমার কাজ এবং এ উদ্দেশ্যেই আমাকে বাছাই করা হয়েছে। আমি নিজের কাছে সৎ থাকতে চাই, এটাই আসল কথা।

সমালোচনাকে আপনি কিভাবে নেন?

– ভাল খারাপ দু’টিই থাকে। খারাপ সময় পার না হওয়া পর্যন্ত যত ভালই করেন না কেন আপনাকে সন্তুষ্ট করবে না। আমি সব সময়ই এটাকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে চেষ্টা করি। আমরা পেশাদার ক্রিকেটার। তাই যে কোন বিষয়কে সেভাবেই গ্রহণ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি যখন আপনি কাউকে বেশি পছন্দ করবেন, তখন তার কাছে চাহিদাও বেশি থাকবে। মাঝে মধ্যে আমরা প্রত্যাশা পুরণ করতে ব্যর্থ হই। কিন্তু আমি নিশ্চিত করতে চাই যে আমরা সবসময় সেরাটাই দেয়ার চেষ্টা করি।

টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে আপনার প্রত্যাশা কি?

– আমার মনে হয় ওডিআই ক্রিকেটে আমরা ভাল করেছি, কারণ আমাদের মধ্যে একটা স্বপ্ন ছিল। সেটিই আমাদের ভাল করার অনুপ্রেরণা যোগাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি টেস্টে আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। তবে এখানে প্রতিভার কোন ঘাটতি নেই। আমাদেরকে বিদেশের মাটিতে গিয়ে ভাল খেলতে হবে। সেটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যখন বাইরে যাই তখন দরকার হবে ঘরের মাঠের মত পুনরাবৃত্তি করার। নিউজিল্যান্ডে আমরা ভাল করতে পারিনি। বিশেষ করে দলবদ্ধভাবে। যদিও কয়েকটি দারুণ একক পারফর্মেন্স ছিল। এখন আমাদেরকে আরো একাতাবদ্ধ পারফর্মেন্স নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দিন শেষে এটি হচ্ছে দলগত একটি খেলা। দলের জন্যই আপনাকে খেলতে হবে। আমরা এখন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের অপেক্ষায় রয়েছি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাব। এই দু’টি শীর্ষ দলের সঙ্গে খেলার পর আমরা আশাকরি ভাল একটি চেহারা লাভ করব।

আপনার উইকেট কিপিং নিয়ে অনেক কথা উঠছে?

– আমি আগেও বলেছি যে উইকেট কিপিংয়ের ফলে আমার উইকেট সম্পর্কে ভালভাবে বুঝতে সুবিধা হয়। যেটি আমাকে ব্যাটিংয়ের সময় সহায়তা করে। একই সময় আমাকে দলের জন্য করণীয়ও ঠিক করতে হয়। এই কাজে আমি খুশি। চেষ্টা করব টিম ম্যানেজমেন্ট আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে সেটি আরো বেশি করে পালন করতে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।