আমার সব সিনেমাগুলোই ‘বায়োগ্রাফিক্যাল’: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

ঢাকার নিকটবর্তী নাখালপাড়া’র একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী’র জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি মাড়ানো হয়নি তার। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্প্রদায় ও পরিপার্শ্বিক উপজীব্য থেকেই মূলত তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তিনি এমন একটি এলাকায় বেড়ে ওঠেছেন, যেখানে টিভি ও সিনেমাকে নিষিদ্ধ মনে করা হত। তার বাবা টেলিভিশনকে বলতেন—‘শয়তানের বাকসো’। অতএব, মানুষের জীবন-ই তার প্রিয় পাঠ্যপুস্তক হয়ে ওঠে।

২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ফারুকীর সিনেমা ‘টেলিভিশন’র গল্পে দেখা যায়—একজন ধর্মপ্রাণ বয়স্ক মানুষ, যিনি তার পুরো জীবনজুড়ে টিভি দেখার বিরোধিতা করে এসেছেন, এবং এটিকে পাপকাজ বলে মনে করতেন। অথচ ছবির শেষের দিকে, তিনি টিভিতে সরাসরি হজ্বের দৃশ্য দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। যে টিভি নিয়ে সারা জীবন বিরোধিতা করেছেন তিনি, সেই টিভি দিয়েই আবার অতৃপ্ত হজ্বের বাসনা পূরণ করেন!

২০১৩ সালে আসে তার আরেকটি সিনেমা ‘পিঁপড়াবিদ্যা’। একজন সেলসম্যানকে ঘিরে গল্প আবর্তিত হয়েছিল, যে তার সেকেন্ড-হ্যান্ড মোবাইল ফোনে একজন বিখ্যাত চিত্রনায়িকার ব্যক্তিগত ‘গোপন’ ভিডিও দেখতে পায়। তারপর থেকে ওই অভিনেত্রীর কাছে থেকে সে বিভিন্ন অন্যায় সুযোগ সুবিধা নেওয়া শুরু করে— এ চলচ্চিত্র দুটির মূল উপজীব্য নির্মাতার আশেপাশে হরহামেশা ঘটে যাওয়া কাহিনী থেকেই নেওয়া।

তার নতুন সিনেমা—‘নো বেড অব রোজেস’। ছবির মূল চরিত্র জাবেদ হাসান নামের একজন চলচ্চিত্রকার। চরিত্রটি প্লে করেছেন বিখ্যাত অভিনেতা ইরফান খান। অভিযোগ ওঠেছে, সিনেমাটির গল্প প্রয়াত লেখক ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব হুমায়ূন আহমেদের জীবন থেকে ধার করা।

হুমায়ূন আহমেদ—বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবন ও বাস্তবতা নিয়ে জাদুকরী লেখনীর সুবাদে তিনি খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল কিছুটা বিতর্কিত। তিনি এমন একজন অভিনেত্রীকে বিয়ে করেছিলেন, যে-তার মেয়ের বান্ধবী ছিল। যাই হোক, এই সিনেমাটি বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রণালয় কর্তৃক কিছুদিন আগে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যদিও নির্মাতা ফারুকী বায়োপিকের প্রশ্নে বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার নতুন সিনেমা ‘ডুব: নো বেড অব রোজেস’ নিয়ে কথা বলেছেন ভারতীয় গণমাধ্যম ‘প্লাটফর্ম’র সঙ্গে। ইরফান খানের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা ও বাংলা সিনেমার বর্তমান অবস্থান-সহ নানা বিষয় উঠে এসেছে ওই আলাপচারিতায়।

‘মডার্নিজম’ ও ‘রিয়েলিজম’ এ পরিভাষা দুটো সচরাচর আপনার কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, আপনি কি এগুলো নির্দিষ্ট করে বলবেন? যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে আপনার কাজে বাস্তবতা ও আপাত-বাস্তবতার সংযোগ স্থাপনে কিসে আপনাকে তাড়িত করে?

— ‘মডার্নিজম’কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তা আমি জানি না। তবে আমি বলতে পারি—কেন আমার ফিল্ম বাস্তবতা ও আপাত-বাস্তবতার মাঝে একটা যোগসুত্র স্থাপন করে। আমরা আসলে একই সময়ে দুটি জগতে বাস করি। একটি হচ্ছে বাস্তবজগত, যা আমরা চারদিকে দেখতে পাই। অন্য জগতটি হচ্ছে, আমাদের মাথায়, স্মৃতিতে, স্বপ্ন ও ফ্যান্টাসিতে। দুটি জগতই আমার কাছে সমানভাবে বিরাজমান। সম্ভবত এই জন্যই আমার ফিল্মে বাস্তবতা ও আপাত-বাস্তবতার একটা মিলন ঘটে থাকে।

বাংলাদেশী সিনেমার পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি আপনার কাজে দেখা যায়। এই প্রয়াসটা কী সচেতনভাবেই?

— আমাদের চলচ্চিত্রে আমি কিছুটা পরিবর্তন আনতে পেরেছি কি না, আমার জানা নেই। ওই অর্থে সচেতনভাবে কোনো চেষ্টা ছিল না আমার। আমি সবসময় আমার গল্প আমার মত করে বলার চেষ্টা করেছি। আমি সবসময় মনের কথা শোনতে চেয়েছি। আমি আমার মত হতে চেয়েছি। বাকিটা কাজের ফলাফল, আমি মনে করি। আর হ্যাঁ, আমি সবসময় চাই আমাদের নির্মাতা তাদের নিজের মত করে গল্প বলুক, অন্ধভাবে অন্য কাউকে অনুসরণ না করে।

আপনি কোথা থেকে অনুপ্রেরণা পান?

— মানব মনের কৌতুহল থেকে।

বাংলাদেশে বর্তমানে যে-সব চলচ্চিত্র তৈরী হচ্ছে, সেগুলোর ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

— আমরা এখনো ওই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আমরা মনে করি না যে, বিশ্ব-চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে আমরা এখনো উল্লেখ্যযোগ্য শক্তি হতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। যদি তা আমরা ভালভাবে উদ্ভাবন করতে পারি, তাহলে প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ টি মানসম্মত চলচ্চিত্র তৈরী করতে পারব, এবং একটি ভাল পর্যায়ে যেতে পারব।

‘নো বেড অব রোজেস’ সিনেমায় ইরফান খানের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

— এটা খুবই সহজ ছিল। আমার কখনোই মনে হয়নি যে আমি একজন মেগাস্টারের সঙ্গে কাজ করছি। শুরু থেকেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করতে ব্যস্ত ছিলেন। আমরাও সবাই সিনেমাটির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিলাম। এটা একটা অভিযানের মত ছিল, এবং আমরা চুড়ান্ত সীমায় পৌঁছানোর জন্য ওঠেপড়ে লেগেছিলাম। সিনেমায় তার অভিনয়টা ছিল একেবারে প্রাণবন্ত। আমি খুশি হয়েছি যে, ‘হলিউড রিপোর্টার’ ও ‘স্কিন ডেইলি’ তে বড় বড় সমালোচকরা তার অভিনয়ের ব্যাপক প্রশংসা করেছেন।

সিনেমার প্রায় সব ইন্টার্ভিউতে তিনি আপনাকে নিয়ে ইতিবাচক কিছু বলেছেন। ছবিটির এই চরিত্রে তাকে রাজি করানোর সময় আপনাদের কেমন কথোপকথন হয়েছিল?

— ওটা সত্যিই চমৎকার অভিজ্ঞতা ছিল। প্রথম দিন থেকেই আমরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছি। আসলে, প্রথম দিন আমি যখন তার সাথে দেখা করি, তখন চরিত্রটির মনস্তত্ত্ব ও লক্ষ্য নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছিলাম। অবশ্য তার আগেই তিনি সিনেমাটির স্ক্রিপ্ট পড়ে ফেলেছিলেন, এবং আমার একটি সিনেমা ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ও  দেখেছিলেন, যেটা তার খুব মনে ধরেছিল। যাই হোক, এটা প্রত্যাশা ছিল যে মুম্বাইয়ে আমাদের প্রথম দেখায় চরিত্রটি সম্পর্কে আলোচনা করব, কিন্তু, আমাদের ওই কথা অনুযায়ী কিছুই হয়নি। তার পরিবর্তে আমরা মুম্বাইয়ের ‘কুর্তা শপ’, আমার মা-বাবা ও তাদের চিন্তাধারা, এবং কিছু বাংলা খাবার ও জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে এলোপাথাড়িভাবে আলোচনা করেছিলাম। পরে স্কাইপে আরো অনেক কথা হয়েছে, সেখানে আমি ব্যাখ্যা করেছি কে এই চরিত্র, তার চিন্তাধারা কেমন ছিল, সে দেখতে কেমন ছিল এবং সে কেমন আচরণ করত। ইরফান খানের সঙ্গে কাজের সৌন্দর্যটা তার কৌতুহলের মধ্যে নিহিত। তার কৌতুহলগুলো একটা শিশুর মত, যেটা তাকে আজকের এই অভিনেতা বানিয়েছে।

সিনেমার এরকম শিরোনামের তাৎপর্যটা কী?

— আমরা দুইটা ভার্সনের জন্য ভিন্ন দুইটা শিরোনাম নির্ধারণ করেছি। বাংলা ভার্সনের নাম—‘ডুব’। আন্তর্জাতিক ভার্সনের নাম ‘নো বেড অব রোজেস’। যেহেতু আমরা সবাই জানি জীবন পুষ্পশয্যার নয়।

একটা পরিবারের উত্থানপতনের গল্প এটা। গুঞ্জন  আছে, এই গল্পের সঙ্গে একজন খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকারের জীবনীর বিশেষ মিল রয়েছে। এবং বাংলাদেশে এটা ব্যান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল..

— আমাদের চারপাশের জীবন থেকে আমরা অনুপ্রেরণা পাই। আপনি একটা গল্পকে আঁকড়ে ধরতে পারবেন না, যদি না সেটা কোনো জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তির সাথে সংশ্রব থাকে। আমার সব সিনেমার গল্পই বাস্তব-জীবন ও বাস্তব-মানুষ থেকে অনুপ্রাণিত। এটাও তার ব্যতিক্রম নয়। যাই হোক, আমি সবসময় বলতে ভালবাসি যে, আমার সব সিনেমাগুলোই ‘বায়োগ্রাফিক্যাল’।

সেন্সরশিপ এবং সিনেমা নিষিদ্ধ নিয়ে আপনার মতামত কী?

— কোন সিনেমা মানুষের দেখা উচিৎ বা উচিৎ না, এটা কারো নির্ধারণ করে দেওয়া ঠিক নয়। মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন, তারা কোনটা দেখতে চায় কিংবা কোনটা পছন্দ-অপছন্দ করে।

স্ক্রিপ্ট লেখার ক্ষেত্রে আপনার কি নির্দিষ্ট কোনো সৃজনশীল প্রক্রিয়া আছে?

— স্ক্রিপ্ট লেখার সময় আমি সহকারী পরিচালকদের নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় বসি। এ সব আলোচনা ও তর্কবিতর্ক একটা স্ক্রিপ্টের জন্ম দেয়। অবশ্য একটা শারীরিক প্রক্রিয়াও রয়েছে, আমার মনে হয় স্ক্রিপ্ট লেখার সময় আমি প্রচণ্ড জ্বরের যন্ত্রণায় ভুগি, এবং যখন লেখা শেষ হয়ে যায়, তখনই এটি ভাল হয়ে যায়!

এই সিনেমা থেকে দর্শকদের কী নেওয়ার আছে?

— জীবন মোটেও পুষ্পশয্যার নয়। এটা না সাদা না কালো। এটা অতিশয় সুক্ষ্ম, এবং আমরা সমালোচনার ঊর্ধে নই।

শেষ প্রশ্ন, নতুন করে কি কোনো সিনেমায় কাজ করছেন?

— হ্যাঁ, আমার নেক্সট ছবি নিয়ে কাজ করছি, আর সেটা হবে আমার নির্মিতব্য ‘ট্রিলজি’র প্রথম সিনেমা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।