আমার মা

মেয়েটার বয়েস উনিশ-বিশ হবে হয়তো; চমৎকার দেখতে। পরিপাটি পোশাক আর লাল লিপস্টিকে বেশ মানিয়েছে মেয়েটাকে। বোধকরি তুরস্ক থেকে এসছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল

– Anything wrong? (কোথাও কি কোন সমস্যা হয়েছে?)

আমি মা’র দিকে তাকিয়ে দেখি মা’র চোখে জল। মা’ও হয়তো আমার দিকে তাকিয়ে একই দৃশ্য আবিষ্কার করেছে! দু’জন’ই চোখের জল লুকোনর চেষ্টা করছি। আমি মেয়েটাকে বললাম

– না, কোথাও কোন সমস্যা হয়নি। টিকেটের সঙ্গে হুইল চেয়ার অর্ডার করেছো তো?

– হ্যাঁ করে দিয়েছি।

আমার মায়ের দেশে ফেরত যাওয়ার সময় হয়ে এসছে। অন লাইনে টিকেট না কিনে সরাসরি গিয়েছিলাম এয়ারলাইন্স অফিসে। সঙ্গে মা’কে নিয়ে গিয়েছিলাম।

আমি মা’কে জিজ্ঞেস করলাম

– তুমি কাঁদছিলে কেন?

মা উল্টো আমাকে প্রশ্ন করল

– তুই কাঁদছিলি কেন?

আমি উত্তর না দিয়ে রাস্তায় নেমে এসছি। চমৎকার রোদ উঠেছে আজ। সঙ্গে মৃদু-মন্দ বাতাস। আমি আমার মা’র হাত ধরে হাঁটছি। মা আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। আচ্ছা আমি যা ভাবছি মা’ও কি তাই ভাবছে? এই জন্য’ই কি শক্ত করে হাত ধরে রেখেছে?

আমার মা জটিল রোগে আক্রান্ত। এই রোগ ভালো হবার নয়। স্রেফ চেষ্টা করে যাওয়া। ভাবছিলাম আমি একা মানুষ। ইউনিভার্সিটির চাকরি করে, শেষমেশ মা’র দেখভাল করতে পারবো কিনা। যখন’ই সময় পেয়েছি, দিনরাত চেষ্টা করে গেছি। এইসব যখন ভাবছি, মা বলল

– তুই এক’ই সঙ্গে আমার ছেলে এবং মেয়ে। উপরওয়ালা তোকে আর কিছু দিয়ে না পাঠাক ধৈর্য দিয়ে পাঠিয়েছে।

আমি মা’র দিকে তাকিয়ে বললাম

– এসব বলছ কেন মা? থাক না হয় …

আমার চোখটা মনে হয় আবার কেমন ঝাপসা হয়ে এসছে। মা আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। শেষবার যখন দেশ থেকে এসছিলাম, বাবার শরীর খুব খারাপ ছিল। আর দেখতে পারিনি বাবা’কে। আচ্ছা, আমি যা ভাবছি মা’ও কি তাই ভাবছে?

আমার অক্ষর জ্ঞানহীন মা, তাঁর পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন আমাদের ছয়-ভাই বোনকে মানুষ করতে করতে। নিজে পড়াশুনা করেনি, কিন্তু আমাদের সব ভাই-বোনকে পড়াশুনা করিয়েছে। আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রী নিয়েছি। আমার মনে আছে একবার এখানে এক বিদেশি ভদ্রলোক আমার মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলো

– আপনি আপনার ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে কিছু লেখাপড়া কেন শিখে নেন’নি।

আমার মা উত্তরে বলেছিলো

– আমার তার দরকার হয়নি। কারণ আমি আমার ছেলে-মেয়েদের চোখ দিয়েই পড়তে পারি।

ওই ভদ্রলোক আমাকে এসে বলেছিলো

– তুমি তোমার মা’কে বলে দিও তিনি তাঁর ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে পেরেছেন। এতোটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমি এই জীবনে কেউকে উত্তর দিতে দেখিনি।

এই পর্যায়ে এসে মনে হচ্ছে- সত্যি’ই কি মানুষ হতে পেরেছি? গতবার যখন মা এসছিলো, নিজের দুঃখ-কষ্ট মা’কে বুঝতে দেইনি একটু। সাধ্যমতো সেবা করে গিয়েছি। এবারও চেষ্টা করেছি। তবে নিজের কষ্ট গুলো আর লুকিয়ে রাখতে পারিনি। এইসব যখন ভাবছি মা বললেন।

– তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আয় বুকে আয়।

আমি খুব অবাক হলাম! কিছুক্ষণ আগেই ভাবছিলাম- মা’কে যদি একটু জরিয়ে ধরতে পারতাম। জরিয়ে ধরার পর মা খুব মৃদু স্বরে বললেন

– তোর মনে হয় খুব কষ্ট হচ্ছে। কারো বাবা-মা’ই আজীবন বেঁচে থাকে না। তুই একদম কষ্ট পাবি না।

মা’রও নিশ্চয় কষ্ট হচ্ছে। অথচ আমার কষ্ট হবে ভেবে, মা দিব্যি নিজের কষ্ট গুলো লুকিয়ে এখন আমার কষ্টের কথা ভাবছে। খুব বলতে ইচ্ছে করছে- মা তুমি চলে গেলে আমি কার সঙ্গে নিজের কষ্ট গুলো ভাগাভাগি করবো!

আমি আর মা পুরো ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছি। মা আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। আহা, মায়াময় ছোট্ট এই শহরটার এই সময়টুকু’কে যদি ধরে রাখা যেত…

– ফেসবুক থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।