মাহমুদা সুলতানা-মার্গারিটা মামুনরা আমাদের কেউ নন

একজন সাধারণ আমেরিকান নাগরিকের সাধারণ জ্ঞান খুবই নিম্নপর্যায়ের হয়ে থাকে ।

ব্যাপারটাকে নেতিবাচকভাবে না দেখার জন্য অনুরোধ করছি । ধরুন, রাস্তায় আপনার সাথে একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিকের দেখা হল । তাকে সাধারণ জ্ঞানের কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে দেখুন । অবাক হয়ে দেখবেন, বর্হিবিশ্ব সম্পর্কে তাদের ধারণা আমাদের দেশের ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়া ছেলেদের চেয়ে বেশি নয় ।

তাহলে তারা পৃথিবী শাসন করে কিভাবে ? আর কিভাবেই তারা নিজেদের ‘ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট নেশন’ দাবী করে ? ব্যাপারটা অবাক করার মত না ?

খুব সহজভাবে যদি উত্তরটা দিয়ে দিই, সেটা হবে –‘ তারা গুণের এবং গুণীর কদর করতে জানে’।

প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল দেশ থেকে তারা মেধাবী, গুণী মানুষদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করে । তাদের মেধাকে তারা সম্মান জানায় তাদের মুদ্রার মাধ্যমে, উন্নত জীবনযাত্রার মাধ্যমে । তারা এই গুণী মানুষদের সুযোগ দেয় কাজ করার, নিজের প্রতিভা বিকশিত করার এবং সম্মানিত হওয়ার । এবং একদিন, এই মানুষগুলো – তারা দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করে । তারা আবিষ্কার করে আমেরিকার হয়ে, আমেরিকান মানুষদের জন্য । দেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় হয় তাদের মাধ্যমে, তাদের বংশধরদের মাধ্যমে । একটা চমৎকার নাম আছে পুরো প্রক্রিয়াটির – ব্রেইন ড্রেইন।

আমি নিশ্চিত, আপনার পরিচিত কেউ না কেউ এরকম আছে । যারা প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন সেখানে । যেখানে ধর্ম , গায়ের রং, টাকাপয়সা, জায়গাজমি বা বংশপরিচয় দিয়ে মানুষ বিচার করা হয় না । কাজ এবং যোগ্যতা দিয়ে বিচার করা হয়। এবং এই একটামাত্র কারণেই আমেরিকা উন্নত রাষ্ট্র, উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নয় । এবং কথাটা শুধু আমেরিকা নয়, প্রথম বিশ্বের প্রায় সবকয়টি দেশের জন্যই প্রযোজ্য ।

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মাহমুদা সুলতানা নাসার ‘ইনোভেটর অব দ্য ইয়ার’ পুরষ্কার অর্জনে আমি কেন জানি খুশি হতে পারি নাই ।

অবশ্যই আমি তার ত্যাগ, প্রতিভা, কষ্টকে মোটেই ছোট করে দেখছি না । কিন্তু তার এই মহান অর্জনে যারা ‘বাংলাদেশী’ বলে গর্বিত , তাদের দলে থাকতে পারছি না বলে দু:খিত । মাহমুদা সুলতানা ছোটবেলায় সপরিবারে বাংলাদেশ থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমান । গত এক বছরে দশটির বেশি অবিষ্কার এবং ন্যানোটেকনোলজিতে অসমান্য দখলের জন্য তিনি এই পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হন ।

যদি তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি না জমাতেন, কোথায় থাকতেন ?

২০১৬ সালের অলিম্পিকে অল এ্যারাউন্ড পুরষ্কার জেতেন মার্গারিটা মামুন । তিনি বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত হওয়ায় আবেগের বন্যায় ভেসে যায় সারা দেশ । এই কথাটা একবারও মনে পড়েনা কারো, মার্গারিটার বাবা যদি রাশিয়াতে শিফট না করতেন, অলিম্পিকে স্বর্ণ নয়, বিয়েতে পাত্রপক্ষ কয় ভরি স্বর্ণ দিয়েছে তা নিয়ে সম্ভবত মার্গারিটা ব্যস্ত থাকতেন ।

কথাটা নোংরা শোনালেও সত্যি ।

উইকিপিডিয়াতে গিয়ে দেখেন, মার্গারিটা মামুনের পদকের নামের পাশে রাশিয়া লেখা , বাংলাদেশ নয় । এই অর্জনকে আমি কিভাবে বাংলাদেশের অর্জন বলবো বলুন ?

অথচ এই কৃতিত্ব বাংলাদেশের হতে পারতো । সারা পৃথিবীজুড়ে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদের নানা অর্জন আমাদের জানিয়ে দেয়, আমাদের মাঝে সেই পটেনশীয়াল আছে । আমরা অলিম্পিকে পদক পেতে পারি, আমরা নাসায় যেতে পারি, আমরা নোবেল প্রাইজ পেতে পারি ।

বিশ্বখ্যাত খান একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা সালমান খান একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত। ছেলেবেলায় একবার তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন, তার পূর্বপুরুষের জন্মভূমি দেখার জন্য ।

ইউটিউবের বিখ্যাত তিন প্রতিষ্ঠাতার একজন জাওয়াদ করিম বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত জার্মান। নোবেল বিজয়ী অর্মত্য সেনের আদি নিবাস মানিকগণ্জ জেলায় ।

যুক্তরাজ্যের শ্রেষ্ঠ মানবাধিকার আইনজীবি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আবদুল মুয়ীদ খান ২০১৬ সালে ‘সাইলেক্স প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন ।

তিনি বাংলাদেশে থাকলে হয়তো তার ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ার আগে চিন্তা করতে হতো, এইটা দিলে কি কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হবে ?

প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশী মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের জন্য অসংখ্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান । তাদের ত্যাগে এগিয়ে চলে বাংলাদেশ । তাদের কি ইচ্ছা করে না দেশে বসে পরিবার পরিজনের সাথে এরকম সম্মানজনক কোন চাকুরী করতে ? অবশ্যই করে ।

আমাদের মানুষ আছে উন্নয়নের । আমাদের জনবল আছে কাজের । শুধু আমাদের মানসিকতা নেই । আমাদের মানসিকতা নেই গুণীকে সম্মান দেবার । আমাদের মানসিকতা নেই সব কাজকে সমান মর্যাদা দেয়ার । আমরা মানুষকে সম্মান দিতে শিখিনাই । আর যতোদিন না শিখবো, তৃতীয় বিশ্বের এই দেশটা তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ দিয়েই ভরে থাকবে ।

– শামীম শরীফ সুষম’র ফেসবুক ওয়াল থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।