আমাদের একজন সুপারম্যান আছেন

ধারাভাষ্যে সম্ভবত তখন নাসের হুসেইন। ৯৮তে দাঁড়িয়ে তিনি, ভয়-ডর ভুলে এ্যাডাম মিলনের শর্ট বলটাকে কিপারের মাথার উপর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সীমানা দড়ির ওপারে। ছয়।
মাক্রোফোনে গমগম কন্ঠে বলে উঠলেন নাসের, ‘হি ইজ দ্য সুপারস্টার অব বাংলাদেশ ক্রিকেট। এন্ড হি প্লেইড লাইক এ সুপারস্টার, টুডে।’

টিভি সেটের এপ্রান্তে আমাদের চোখের জল আটকে রাখা দায়! তিনি শুধু সেদিন নয়, আরো অনেকবার আমাদের চোখে এমন বাঁধভাঙা জলের উপলক্ষ্য সৃষ্টি করেছেন। আনন্দে আত্মহারা হওয়ার উপক্রম হয়েছে আমাদের।

আমরা তাঁর অতিমানবীয় কীর্তির স্বীকৃতি দিতে তাঁকে আমাদের ‘সুপারম্যান’ অভিধায় ভূষিতও করেছি। আজকের গল্পটা আমাদের সুপারম্যানের তেমনই কোনো এক ‘সুপারম্যান’ শো নিয়ে। পুরো লেখায় কোথাও আমরা তাঁর নাম নেবো না, বলবো না কোন সময়ের কোন ম্যাচের গল্প বলা হচ্ছে; আমরা শুধু তাঁর কোনো এক সময়ের অতিমানবীয় কীর্তির স্মৃতিচারণা করবো।
_________

১১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে কাঁপছে দল।

মধ্যমাঠে প্রবেশ করলেন হ্যাংলা পাতলা গড়নের, মোটামুটি মানানসই উচ্চতার তিনি। অপরপ্রান্তে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন দলনায়ককে। যিনি দিন কয়েক আগে সংবাদ সম্মেলনে হাসির খোরাক হয়েছিলেন। দূর্বল দলের বিপক্ষে পরাজয়ের পর দলপতি যদি জানান, বোনাস পয়েন্ট সহ অপেক্ষাকৃত শক্তিধর দলকে হারিয়ে ফাইনাল খেলবে তাঁর দল, তবে হাসির খোরাক তিনি হতেই পারেন। তবে এটাও সত্যি যে, দলনায়ক এক্ষেত্রে ছেলেদের ভেতরে জয়ের মনোভাব ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন হয়তো। নইলে ওই নবীন ছোকরা, অমন অতিমানবীয় শক্তি কোথায় পান? বিশ্বমানের বোলারদের ছেলেখেলা করার সাহস তাঁর আসেই-বা কোত্থেকে?

এসেই ছোকরা পেলেন লেগ বাই। ওভার শেষ। পরের ওভার আবার খেলতে হবে তাঁর।

২৫ ওভারেরও কম সময়ে তাড়া করতে হবে ১৪৮ রান, তাহলেই মিলবে ফাইনালের টিকেট। তাই কেবল জয় পেলেই হবে না, জয়টা পেতে হবে সম্ভব দ্রুততম সময়ে!

চারটি বল ডট দেয়ার পর কুলাসেকারাকে কাভার দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সীমানা দড়ির প্রান্তে। রানের খাতা খুললেন ‘চার’ মেরে। তিনি কি বুঝে গেছেন আজ তাঁর দিন? কোনো অশরীরি কি ভর করেছে তাঁর উপর? শেষ বলে ‘তিন’ নিয়ে আবারো স্ট্রাইকে গেলেন তিনি। দলনায়ক তাঁকে সাহস দিচ্ছেন নাকি তিনি দলপতিকে দিচ্ছেন অভয়?

পরের ওভারে থুশারাকে পর পর দুই বলে চার মেরে সত্যিকারের আগ্রাসন দেখালেন তিনি। দুটোই পুল করেছেন। যেন জানিয়ে দিলেন ওইসব শর্ট বলের মারণাস্ত্র দিয়ে কাজ নেই বাপু, অন্য পথ দেখো গে! পরের ওভারে আবার কুলাসেকারা। বাছাধন বড় বেশি জ্বালাতন করছে। পরপর দুই চারে তাঁকে আক্রমণ থেকেই সরিয়ে দিলেন তিনি। তাঁর অধিনায়ক কি নির্ভার হলেন একটু?

ম্যাথুসকে স্বাগত জানালেন চার মেরে, ডীপ মিড উইকেট দিয়ে ছয় মেরে বঙ্গ-আগ্রাসনের স্বরুপটাও তাঁকেই দেখানোটা কর্তব্য ভাবলেন বোধহয়! ইনিংসের প্রথম ছয়।

দু’প্রান্তে বোলিং করছেন সময়ের অন্যতম সেরা দুই স্পিনার। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতে আছে ভেবে দুজনকেই রয়ে সয়ে খেলতে থাকলেন দলনায়ক ও তিনি। একের উপরই খেলতে থাকেন, সুযোগ পেলে দুই। ষোল তম ওভারের শেষ বল, ইতিহাসের অবিসংবাদিত গ্রেট স্পিনারের বলটাকে ঠেলে দিয়ে পঞ্চাশ পূর্ণ করলেন তিনি। মাত্র ৪৫ বলে। দলের রান তখন ৮৪। ফাইনালে খেলতে হলে পরের ৮ দশমিক ৫ বলে করতে হবে ৬৪ রান। খুব কঠিন কি?

তাঁকে দেখে কেমন নিশ্চিন্তই না লাগছে! মনে হচ্ছে তিনি যতক্ষণ আছেন, ততক্ষণ যত রানই লাগুক, সব নাগালের মধ্যেই! সেই বিশ্বাসকে পোক্ত করতেই হয়তো পঞ্চাশ করার পরের বলটিকেই পাঠালেন সীমানার ওপারে। বোলার, ‘রহস্য’ স্পিনার অজন্তা মেন্ডিস। অনেকক্ষণ তাঁকে সম্মান দেখানো হয়েছে, আর নয়। এমন কিছু কি ভাবছিলেন তখন?

ওভার দুয়েক পরে অধিনায়ক তাঁর হাতে সব ভার সঁপে দিয়ে ফিরে গেলেন। ভাঙল ৯১ রানের জুটি। জয়ের জন্য তখনো চাই ৪৬ রান, বোনাস পেতে করতে হবে তা ৩৬ বলের মধ্যে।

মুরালিধরনকে তো আর হুটহাট মারা যায় না, একজন চ্যাম্পিয়ন বোঝে ও জানে কীভাবে আরেকজন চ্যাম্পিয়নকে খেলতে হয়। সামলাতে হয়। তিনি ভালোই সামলালেন মুরালীকে। সেই ওভার থেকে চাতুর্য্যের সঙ্গে বের করে নিলেন ৯ রান।

২৯ বলে ৩৬ দরকার। কুলাসেকার তো আর মুরালী নন, সুতরাং তাঁকে খেলাই যায়। খেললেন, পেটালেন। এক ছয় আর এক চারে সে ওভার থেকে এলো ১৪। পরের ২৩ বলে ২২ হলেই হয়ে যায় ফাইনালের টিকেট। দলের জয় নিয়ে তখন আর দুশ্চিন্তা নেই, দুশ্চিন্তা যা হচ্ছে তা ওই হ্যাংলা পাতলা গড়নের ছোকরার জন্য। অসাধারণ আনন্দদায়ী এক ইনিংসে তাঁর স্কোর ৭৯, ২২ এর ২১ করতে পারলেই কেল্লাফতে। কিন্তু তিনি পারবেন কি?

পরের ওভারে ১ রান দিয়ে আর ১ উইকেটে নিয়ে অজন্তা মেন্ডিস বুঝিয়ে দিলেন, ফাইনালে যাওয়ার রাস্তাটা এতটা সহজ নয়! কিন্তু যেখানে আছেন তিনি, সেখানে তাঁকে আর তাঁর দলকে ফাইনালে যেতে আটকানোর সাধ্য কি মেন্ডিসের? তা যতই বোলিংয়ে রহস্য-টহস্য থাকুক না কেন!

তিনি বুঝলেন, এবার সময় এসেছে চ্যাম্পিয়নকে ফেয়ারওয়েল দেয়ার। মুরালীধরনকে কাভার আর মিড অফ দিয়ে দু-দুটো চারে ১০ রান নিয়ে ১৭ বলে ২১ রানের সমীকরণটা তিনি নিয়ে এলেন ১১ বলে এগারোয়। তাঁর স্কোরও ৮৯। তাঁর আর দলের দরকার ঠিক ১১, বোনাস পেতে বলও আছে ১১। পারবেন তো তিনি?

মেন্ডিসের বলে সিঙ্গেল নিয়ে যখন প্রান্ত বদল করছেন তখন তাঁর স্কোর ৯২, দলের প্রয়োজন ৭, বল আছে ৯টি।

কিন্তু তাঁর অপর প্রান্তের সঙ্গীটি খুব বেশী সময় নেয়া উচিৎ ভাবলেন না। প্রথমে চার, পরের বলে ছয় মেরে খেলাই শেষ করে দিলেন সঙ্গী। তাতে তাঁর কি রাগ হলো? কিংবা অভিমান? সঙ্গীর সাথে তিনিও যেভাবে জয়োচ্ছ্বাসে শামিল হলেন, মুষ্টিবদ্ধ হাত নেড়ে যেভাবে জয় উদযাপনে মেতে উঠলেন তাতে তাঁর কোনো রাগ-অনুরাগ আছে বলে তো মনে হলো না!

অবশ্য ৬৯ বলে ৯২ করা সেই ছোকরার মুখ-চোখ দেখে তাঁকে বোঝা যায় না কখনোই। তাঁর প্রকাশ ভঙ্গি এতই নির্লিপ্ত যে, তাঁর কোনো মানবীয় বোধ-অনুভূতি আছে বলেই মনে হয় না কখনো কখনো।

চোখে-মুখে হাজার ওয়াটের বাল্বের হাসি আর ব্যাট উপরে তুলে তিনি হেঁটে আসেন সতীর্থদের ঝাঁকের দিকে। সতীর্থরা তাঁকে কাঁধে তুলে নেন, তিনি লজ্জায় নুইয়ে পড়েন, নামতে নামতে নেমেই যান। স্বদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় এক জয় এনে দেয়ার পর, তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা (তখন পর্যন্ত) ইনিংসটি খেলার পর, সতীর্থরা তাঁকে কাঁধে তো তুললেনই, কতবার যে বুকে জড়ালেন!

সতীর্থদের সাথে সাথে সেদিন সমর্থকরাও যেন জেনে গেল, বাংলাদেশ ক্রিকেটে একজন জিনিয়াসের জন্ম হয়েছে। একজন রক্ত মাংসের ‘সুপারম্যান’ পেয়েছে এদেশের ক্রিকেট। যিনি একা হাতে দলকে যে কোনো বিপদ-সংকুল অবস্থা থেকে উদ্ধার তো বটেই, জয়ের বন্দরেও ভেড়াতে পারেন!

__________________

আমাদের গল্পটা শেষ। পরের অংশ চাইলে এড়িয়ে যেতে পারেন আপনি। কারণ, এই অংশটা একজন দর্শকের। সমর্থকের। একজন কিশোরের।
চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক প্রান্তে ত্বি-তল হলুদ রঙা (এখন অবশ্য ছাই রঙা হয়ে গেছে) বিল্ডিং। বিল্ডিংয়ের সামনে বিশাল মাঠ। এক কিশোর বড় মাঠটায় খেলতে যায়। কিন্তু এক বিকেলে ভারী ঝামেলায় পড়া গেল। এই মাঠের ছেলেদের সঙ্গে ম্যাচ খেলবে অন্য এলাকার ছেলেরা। সেখানে না থেকে উপায় কি! যদিও কিশোর খেলছে না, তারপরও দেখা তো চাই তার!

ওদিকে পড়ে গেছে বাংলাদেশের খেলা। মরা-বাঁচা লড়াই। জিতলেই হবে না, লাগবে বোনাস পয়েন্টও। এক দৌঁড়ে মাঠ থেকে বাসায় এসে এক ব্যাটসম্যানকে দেখে চক্ষু চড়কগাছ। আরে, দ্রুত রান তোলার জন্য ফার্স্ট ডাউনে আজ একে পাঠালো নাকি! বড় ভালো করেছে। না, আরেকটু দেখতেই ভুলটা ভাঙল, স্কোর দেখে চক্কর দিয়ে উঠল মাথা। তিন উইকেট হারিয়ে বসেছে বাংলাদেশ। ধুর! এসব কোনো কথা!

কিশোর আবার দৌঁড়ে মাঠে চলে যায়। মাঠে যাওয়াতে কষ্ট আছে বেশ। লাফিয়ে উঁচু দেয়ালে উঠতে হয়, আবার লাফ দিয়ে তা থেকে টপকাতে হয়। কষ্ট হলেও এদিন তাতে কিচ্ছু আসে যায় না তার। এক দৌঁড়ে মাঠ আর আরেক দৌঁড়ে বাসা, মাঠের ম্যাচ আর দেশের ম্যাচ দুটোই দেখতে থাকে। একসময় দৌঁড়াদৌঁড়ি বন্ধ হয়ে যায় তার। একজন তাকে চুম্বকের মতো ধরে রাখে টিভি সেটের সামনে।

সেই কিশোর পুরো ম্যাচ শেষ করে যখন মাঠ পানে গিয়ে সবাইকে অবিশ্বাস্য এক ম্যাচের গল্প বলে, তখনও সে যেন কাঁপছে। কি এক আনন্দ হিল্লোলে ভেতরে বান ডেকেছে আনন্দাশ্রুর!

সেই কিশোর তখনও জানে না, যে সুপারম্যানকে সে চাক্ষুষ করেছে; কিশোরটির তারুণ্য পর্যন্ত পথচলায় এমন ‘সুপারম্যান’ শো অহরহই সে দেখতে পাবে।

এক সময় মানুষকে হয়তো গল্প বলবে, ‘জানো, আমি এক রক্ত মাংসের সুপারম্যান দেখেছিলাম!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।