আফ্রিকান লর্ডসের গল্প

যাত্রা শুরু করছে ‘ইস্ট আফ্রিকার লর্ডস’ নামে পরিচিত – রুয়ান্ডার প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, গাহানগা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম।

ইস্ট আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা, আন্তর্জাতিক বিশ্ব রুয়ান্ডার নাম শুনলেই এখনো আঁতকে ওঠে অনেকে। ১৯৯৪ সালের নজিরবিহীন গণহত্যার স্মৃতি ভেসে। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিলো সেই গণহত্যায়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন পরিচালনা করলে ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি ঘটতে শুরু করে। একাধিক বাংলাদেশি কন্টিনজেন্ট সেখানে সুনামের সাথে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয়।

অবস্থা স্থিতিশীল হলে আশেপাশের দেশ কেনিয়া, তানজানিয়া, বৎসোওয়ানা থেকে রিফুজিরা রুয়ান্ডা আসতে শুরু করেন। সেই শরণার্থীদের হাত ধরেই রুয়ান্ডায় ক্রিকেটের গোড়াপত্তন। ১৯৯৯ সালে সেই রিফুজিরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘রুয়ান্ডা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন’ (আরসিএ)। প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পর এই শনিবার  রুয়ান্ডায় উদ্বোধন হতে যাচ্ছে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের।

স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু হয় ২০১২ সালে। ব্রিটিশ চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান ‘রুয়ান্ডা ক্রিকেট স্টেডিয়াম ফাউন্ডেশন’ এবং আরসিএসি যৌথ ভাবে কাজ শুরুর ঘোষনা দেয়, পরামর্শ এবং কারিগরী সহায়তা দেয় বিখ্যাত এমসিসি ক্লাব। স্টেডিয়ামের জন্য রুয়ান্ডা সরকার রাজধানী কিগালিতে ৪.৫ হেক্টর জমি প্রদান করেন।

রুয়ান্ডা ক্রিকেট স্টেডিয়াম ফাউন্ডেশন মূলত একটা এনজিও, যার পেছনে রয়েছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন এবং তার পুত্র। রুয়ান্ডাতে এই এনজিওর জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে আছেন এরিক দুছিনগিজিমানা যিনি আবার রুয়ান্ডা জাতীয় দলের অধিনায়ক।

শুরু থেকে এই প্রজেক্টের প্যাট্রোন হিসেবে কাজ করছেন ক্রিকেটের বরপুত্র ব্রায়ান চার্লস লারা এবং ডেভিড ক্যামেরুন। সম্পুর্ন পাহাড়ি এলাকায় মাটি সমান করে আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সহ নয়ানভিরাম পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে ‘গাহানগা ক্রিকেট স্টেডিয়াম’ যাকে বলা হচ্ছে ইস্ট আফ্রিকার লর্ডস।

এই স্টেডিয়ামে যা যা থাকছে-

– আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট গ্রাউন্ড, একটি এস্ট্রোটার্ফ, একাধিক ঘাসের উইকেট

– প্যাভিলিয়ন, রেস্টুরেন্ট, বার (ক্লাব হাউজ) এবং কনফারেন্স রুম

– আন্তর্জাতিক মানের প্লেয়ারস ড্রেসিং রুম, ম্যাচ অফিশিয়ালস রুম

– ছয়টি ক্রিকেট নেট

– দর্শক ধারনের জন্য মিনি গ্যালারী এবং গ্রীন গ্যালারী (সফট ল্যান্ডস্কেপিং)

– নূন্যতম ৮০ গাড়ির পার্কিং ব্যবস্থা

আফ্রিকার অন্যসব দেশের মত রুয়ান্ডাতেও এইচআইভি/এইডস এর সমস্যা রয়েছে। রুয়ান্ডা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য তরুণদের ভেতর এইডস নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো। যার অংশ হিসেবে গাহানগা স্টেডিয়ামে থাকছে ফ্রি এইডস সনাক্তকরন এবং চিকিৎসা পরামর্শ দেয়ার ইউনিট যারা সারা বছর বিনামূল্যে এসব কাজ করবে।

আগামীকাল স্টেডিয়ামের উদ্বোধন উপলক্ষ্যে নেয়া হয়েছে একাধিক কর্মসূচী। এরই ভেতর গত ২২ তারিখ শুরু হয়েছে ‘ক্রিকেট বিল্ড হোপ টুর্নামেন্ট’, চলেছে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত। মোট আটটি দল এতে অংশ নিয়েছে, উগান্ডা নির্বাচিত দল, রুয়ান্ডা নির্বাচিত দল, কেনিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দল এবং ইংল্যান্ডের পাঁচটি দল যথাক্রমে কটস, ইটন রাম্বলার্স, ক্রিস্টোফার সালে (সারে), গ্রানিজ এবং ইয়র্কশায়ার টি।

এছাড়া ২৮ তারিখ গাহানগা স্টেডিয়ামের উদ্বোধনের পর একটি ফ্রেন্ডলি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ব্রায়ান লারা একাদশ এবং সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভন একাদশের ভেতর। এই সেলিব্রেটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে অংশ নিবেন ইংল্যান্ডের স্যাম বিলিংস এবং সাবেক সাউথ আফ্রিকান স্টার হার্শেল গিবস।

বিভিন্ন দেশের অন্তত ২০০ জন ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যাদের ভেতর আছেন ইংল্যান্ডের নারী দলের অধিনায়ক এবং সাবেক ইংলিশ এবং সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেটাররা। উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিদের ভেতর থাকবেন ডাচেস অব ইয়র্কশায়ার, লন্ডন শহরের শেরিফসহ অনেকেই।

ভবিষ্যতে কাউন্টি দল গুলার প্রি সিজন ক্যাম্পের জন্য রুয়ান্ডা ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার হতে পারে যেমনটা বর্তমানে আবুধাবি হয়ে থাকে।

গৃহ যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠেছে রুয়ান্ডা, বর্তমানে ক্রিকেট সেখানে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গাহানগা স্টেডিয়ামের মাধ্যমে সেখানে এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন করা সম্ভব হবে। ফলে রুয়ান্ডাতে ক্রিকেট আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে আশা করছে আরসিএ। যদি আইসিসি এবং আফ্রিকান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন যথাযথ ব্যবস্থা নেয় তাহলে ফ্লোরিডা, টরেন্টো বা সিঙ্গাপুরের মত রুয়ান্ডাতেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখা যেতে পারে ভবিষ্যতে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।