আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা!

এমনিতে ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে কাঁটাছেড়া করাই যায়। ব্যাটিং ব্যর্থতায় আমরা হেরেছি, এটি সবচেয়ে বড় সত্যি। উইকেট-পরিস্থিতি যেমনই থাকুক, ২২২ রান করতে না পারা সোজাসুজি ব্যর্থতা। সিম্পল।

তবে ব্যর্থতার অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে বেশ কিছু ব্যাপার। প্রথমত, টস। উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সবচেয়ে ভালো ছিল প্রথম এক-দেড় ঘণ্টা। ওই সময়টায় বল ব্যাটে এসেছে মোটামুটি ভালো। পরে খুব ধীরগতির হয়ে যায়। বাউন্স আনইভেন হতে থাকে। রান করা কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রীলঙ্কা ম্যাচের সেরা ব্যাটিং কন্ডিশনটুকু পেয়েছিল। সে সময়ে ভিত্তিটা শক্ করেছে। ম্যাচের পর দিনেশ চান্দিমাল বলেছেন, “উইকেট দেখার পরই প্রার্থনা করেছি, টসটা জিততেই হবে।” বাংলাদেশের ব্যাটিং ইনিংস জুড়েই উইকেট ছিল কঠিন।

টস একটা বড় ব্যবধান গড়ে দেওয়া ক্রিকেটে এই প্রথম নয়। টস হার অজুহাতও নয়। তবে একটা টকিং পয়েন্ট অবশ্যই।

তার পর সাকিবের চোট। ইনিংসের পরের ভাগে উইকেট বেশি স্পিন উপযোগী হবে ভেবেই সাকিবের ওভার রেখে দিয়েছিলেন অধিনায়ক। চোট পাওয়ার পরের ওভার থেকেই সাকিবের আবার বোলিংয়ে আসার কথা ছিল। অধিনায়কের বিশ্বাস, সেক্ষেত্রে হয়ত শ্রীলঙ্কার রান আরও ১০-১৫ কম হতে পারত।

ব্যাটিংয়ে সাকিবকে কতটা মিস করেছে দল, সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আবারও বলছি, এটাও অজুহাত নয়। সাকিবকে ছাড়া আমরা পূর্ণ শক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজ হারিয়েছে ২০১২ সালে, নিউ জিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করেছি ২০১৩ সালে। এখন তো আরও বেশি করে পারা উচিত ছিল। সাকিবের জন্য হলেও পারা উচিত ছিল। কিন্তু অন্যরা পারেনি। সাকিবের অভাব অনুভূত হয়েছে, এটিই বাস্তবতা।

সাকিবের অনুপস্থিতিতে ড্রেসিং রুমে সংশয়ের যে চোরাস্রোত ছিল, সেটিকে আত্মবিশ্বাসের প্লাবনে রূপ দিতে পারত ব্যাটিংয়ে দলের ভালো শুরু। পারতেন তামিম। হয়েছে উল্টো। তামিম শুরুটা ভালো করতে পারেননি। মিঠুন-সাব্বিররা পারেননি সময়ের দাবী মেটাতে। সংশয়ের স্রোতই তাতে আরও তীব্রতা পেয়েছে।

নতুন বলে একের পর এক শর্ট বল করেছেন লঙ্কান পেসাররা। টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচগুলোতেও বাংলাদেশের বিপক্ষে একই পরিকল্পনা ছিল প্রতিপক্ষ দুই দলের। বাংলাদেশ কখনও ভালোভাবে সামলেছে, কখনও পারেনি। ফাইনালও সেই না পারার দিন। অধিনায়ক বলেছেন, ব্যাটসম্যানদের এক্সিকিউশন ঠিকমত হয়নি। শর্ট বলে জোয়ার আসবে জেনেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জোয়ারে বাধ দিতে পারেননি কেউ।

মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে মুশফিকের জুটি জমে গিয়েছিল। মুশফিককে আমি সবসময় বলি, আমাদের ওয়ানডে ফরম্যাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যান। মুশি নেমেই যেভাবে খেলার মোমেন্টাম বদলে দেন, বা মোমেন্টাম পক্ষে থাকলে যেভাবে সেখানে বাড়তি দম দেন, সেটি আমাদের অনেক জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছে। কিন্তু মুশি আউট হলেন বাজে ভাবে।

সুইপ করতে গিয়ে একবার অল্পের জন্য বেঁচেছেন রিভিউয়ে। আবার রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে আউট হতে হতে হলেন না। পরের বলেই আবার সুইপ করতে গিয়ে আউট। সুইপ শট তিনি অসাধরণ খেলেন। তার রান প্রসবা শট এটি। সবই ঠিক আছে। কিন্তু সন্দেহ জাগছে, তার সুইপ শটে ইগো যোগ হচ্ছে না তো? দু-একবার ঠিকমত সুইপ না লাগলে জেদ চেপে যায়, সুইপই করতে হবে। বোলার সেটিকেই কাজে লাগায়। এমন জেদ চেপে বসছে না তো?

অবশ্যই সুইপ খেলা তিনি বাদ দেবেন না। উচিতও না। কিন্তু সত্যিই ইগো চেপে বসলে, সেটা কি দূর করা যায়? ধরে নিলাম, ইগো নেই। তবে আরেকটু বাছ-বিচার কি করা যায়? দলের সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রিকেটার, সবচেয়ে বেশি সময় ব্যাটিং অনুশীলন করেন। নিজের ক্রিকেটের প্রত সৎ থেকেই করেন। তিনি আমি নিশ্চিত, তার শটে আমাদের চেয়ে বেশি হতাশ তিনি নিজেই। প্রতিকারও অবশ্যই তিনি আমাদের চেয়ে ভালো বুঝবেন।

ম্যাচ নিয়ে গবেষণা আরও করা যায়। আপাতত ব্যাটিং ব্যর্থতায়ই থামি। আত্মজিজ্ঞাসার প্রশ্ন এসে যাচ্ছে এই ব্যাটিং ব্যর্থতার প্রসঙ্গেই। ফাইনাল হেরেছি। আমরা হতাশ। তবে দুনিয়ার সব শেষ হয়নি। আতঙ্কিত হয়ে যা-তা করার দরকার নেই। তবে প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু কঠিন প্রশ্ন নিজেদেরকে করা এবং উত্তর খোঁজা। প্রশ্ন, দলটা সব মিলিয়ে কতটা সমৃদ্ধ?

দলের ৫ সিনিয়র ক্রিকেটার আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যদিও তাদের নিজেদেরও এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, পরের ধাপে যেতে হবে, নিত্য নতুন চূড়া ছুঁতে হবে। তবে তারাই দলের প্রাণ। দলের শক্তি। তারা একেকটি ধ্রুবতারা। কিন্তু ধ্রুবতারার পাশে মোটামুটি উজ্জ্বল তারাও তো কিছু থাকে। বাংলাদেশ এই দলে এই তারা কারা?

সৌম্য, লিটনদের দেখা হয়েছে। বিজয়, নাসির, সাব্বিরদের দেখা হচ্ছে। আরও কিছু নাম বলা যায়। কতটুকু ফল পাওয়া গেল? ৫ সিনিয়র ছাড়া দলে আছেন বা দলের আশেপাশে আছেন বা যারা বাইরে আছেন, কিন্তু বিকল্প হতে পারেন, তারা আসলে কতটা যোগ্য? প্রশ্ন এসবই।

তাদের অবশ্যই নিখুঁত টেকনিক থাকতে হবে বা দারুণ স্ট্রোক মেকার হতে হবে কিংবা একেকজন ম্যাচ উইনার হতে হবে, তা নয়। তবে যেটা অবশ্যই অবশ্যই লাগবে, মেন্টালি টাফ হওয়া, ভালো টেম্পারামেন্ট থাকা। ক্রিকেট ইজ অল অ্যাবাউট অ্যাডজাস্টমেন্ট। যে যত স্মার্ট ক্রিকেটার, সে তত ভালো অ্যাডজাস্ট করতে পারে। ৫ সিনিয়রের পাশে আমাদের প্রয়োজন মেন্টালি টাফ এবং স্মার্ট কিছু ক্রিকেটার। কজন আছেন এখন দেশের ক্রিকেটে?

যেটিকে বলছি আত্মজিজ্ঞাসা। ক্রিকেটারদের নিজের, দলের, টিম ম্যানেজমেন্টের, নির্বাচকদের, বোর্ডের। উত্তর খোঁজা এবং সমাধান জরুরী…

পুনশ্চ:

ম্যাচ হারার পর দেশের মাটিতেই উইকেট নিয়ে প্রশ্ন তুললে হয়ত ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে অনেকের। সেটিই স্বাভাবিক। তবু প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে। দেশের ক্রিকেটের এটিও এক অবাক বাস্তবতা। আরও একবার বলছি, উইকেট যেমনই হোক, ২২২ রান করা উচিত ছিল। কিন্তু এটার পরেই প্রশ্ন জাগে, এমন উইকেট কেন প্রস্তুত করা হলো?

অধিনায়ক,দলের অন্যরা বলছেন, শুরু থেকেই তারা হাই স্কোরিং উইকেট চেয়েছেন, কারণ নিজেদের বোলিং ইউনিটের ওপর তাদের প্রবল আস্থা। কিন্তু তেমন উইকেট কেন দেওয়া হলো না? প্রথম তিন ম্যাচের পর থেকেই কেন এরকম মন্থর, টু পেসড উইকেটে খেলা হলো?

বলছি না, এমন উইকেট বলেই বাংলাদেশ হেরেছে। টস বাংলাদেশও জিততে পারত। তবু প্রশ্ন থাকে। ফাইনালের হারের পরই শুধু নয়, জিম্বাবুয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় ম্যাচে বড় জয়ের পরও অধিনায়ক বলেছিলেন, এরকম উইকেট আমরা চাই না। তার পরও কেন একইরকম উইকেট? জয়-হার পরের কথা। দেশের মাটিতেও কেন চাওয়া অনুযায়ী উইকেট পাবে না দল?

এই টুর্নামেন্টের আগে কিউরেটর জাহিদ রেজা বাবু ভাইকে মিরপুরে আনার কথা ছিল শুধু এই টুর্নামেন্টের জন্য। শেষ মুহুর্তে সেই উদ্যোগ থামিয়ে দেওয়া হলো কেন? কিভাবে? অধিনায়ক-দলের চাওয়া মত উইকেট দিতে না পারার পরও কি কিউরেটরকে প্রশ্ন করা হয়েছে? জবাবদিহি করতে হয়েছে? বাংলাদেশের ক্রিকেটে একজন কিউরেটর কি এতই শক্তিশালী?

এই প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। যদি বিসিবি চায়, প্রশ্নটিকে ‘প্রশ্ন’ ভাবতে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।