আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে, ঋতুপর্ণা ছুঁয়েছেন আমাদের

নব্বই দশকে ঘটে যাওয়া জনৈক এক নারী লাঞ্চনার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্যের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মান করলেন চলচ্চিত্র ‘দহন’। এই ছবিতে প্রধান চরিত্র ‘রমিতা’র জন্য বেছে নিলেন সেই সময়ের বাণিজ্যিক ছবির শীর্ষ নায়িকাকে।

সমালোচকদের ভাষ্য ছিল, এই মেয়ে কি পারবে চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে? অবশেষে সেই নায়িকা সব সংশয় কাটিয়ে রমিতা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে সর্বমহলে প্রশংসা তো বটেই, অর্জন করে নিয়েছিলেন অধরা জাতীয় পুরস্কার।  এরপর দহনের রমিতাকে ‘পারমিতা’ করার জন্য বেছে নিলেন অপর্না সেন, তাঁর নির্মিত ছবি ‘পারমিতার একদিন’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে আরো পরিক্ষীত করলেন।

মুক্তধারার ‘নীহারিকা’ থেকে রাজকাহিনীর ‘বেগমজান’ একের পর এক নিজের ক্যারিয়ারে যুক্ত করলেন সফল পালক। বাণিজ্যিক ছবির যেমন শীর্ষ নায়িকা হয়েছেন,তেমন শৈল্পিক ছবিতেও নিজেকে করেছেন প্রতিষ্ঠিত। তিনি ভারতীয় বাংলা সিনেমার অত্যন্ত জনপ্রিয় নায়িকা ‘ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত’।

প্রভাত রায়ের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘শ্বেত পাথরের থালা’য় খল নায়িকা হয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক, এরপর সুজন সখি, নাগ পঞ্চমী, লাঠি, মনের মানুষ, মধু মালতী, ভালোবাসি তোমাকে, খেলাঘর, সংসার সংগ্রাম, আমি সেই মেয়ে, শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ, দায় দায়িত্ব, মায়ার বাঁধন, সিঁদুর খেলা, বাবা কেন চাকর, সন্তান যখন শত্রু, সিঁদুরের অধিকার, তোমাকে চাই সহ একের পর এক হিট ছবিতে অভিনয় করে বাণিজ্যিক ছবির শীর্ষ নায়িকা হয়েছেন।

তবে নিজেকে পরিক্ষীত করেছেন শৈল্পিক ছবিতে। দহন, পারমিতার একদিন, উৎসব, মন্দ মেয়ের উপাখ্যান, আলো থেকে নিশিযাপন, দ্বিতীয় বসন্ত, অনুরণন, বেদেনী, দেবীপক্ষ, চতুরঙ্গ, আরোহণ, চারুলতা ২০১১ এরপর মুক্তধারা, অলীক সুখ, রাজকাহিনী এই ছবিগুলোতে অভিনয় করে নিজেকে সুদক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

হেমা মালিনীর টেলিফিল্ম ‘মোহিনী’ অভিনয়ের পর বেশ কয়েকটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সব মিলিয়ে ঋতুপর্ণার করা হিন্দী সিনেমার সংখ্যা ২৩ টি। এর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল রাজপাল যাদবের  সাথে ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ম্যায় মেরি পত্নী ওর ও’। রোটেন টমেটোতে সেই সিনেমার রেটিং ৮/১০, আইএমডিবিতে ৭.৩/১০।  মজার ব্যাপার হল ঋতুপর্ণা ২০১৩ সালে ‘কাথাভিডু’ নামের একটা মালায়ালাম সিনেমাতেও কাজ করেন।

যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘স্বামী কেন আসামী’ দিয়ে বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করেন ঋতুপর্ণা, এরপর রাঙা বউ, সাগরিকা, মেয়েরাও মানুষ, তোমার আমার প্রেম, চেয়ারম্যান, শেষ যুদ্ধ, দেশ দরদী সহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক সফল ছবির নায়িকা হয়েছেন। বহু বছর পর ‘একটি সিনেমার গল্প’ তে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সিনেপর্দায় আবার আসছেন তিনি।

এই দশকে এসেও পরপর দু’বছরের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সফল ছবির নায়িকা হয়েছেন, শিবু-নন্দিতার ‘বেলাশেষে’র পর বহুদিন পর প্রসেনজিতের সাথে জুটি বেঁধে উপহার দিয়েছেন সুপারহিট ছবি ‘প্রাক্তন’। এখনো হাতে আছে, বেশ কয়েকটি ছবি।

অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যেও বেশ পারদর্শী তিনি, রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা, শ্যামা, চন্ডালিকায় অংশগ্রহণ করে প্রশংসিত হয়েছেন, লেখালেখি হিসেবেও সুপরিচিত। এক সময় আনন্দলোক ও বাংলাদেশের হৃদয়-এ নিয়মিত কলাম লিখতেন।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে জাতীয় পুরস্কারসহ বিএফজিএ, ফিল্মফেয়ার, আনন্দলোক পুরস্কার সহ বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন। চলচ্চিত্রে প্রসেনজিতের সাথে জুটি হচ্ছে টালিগঞ্জের নব্বই পরবর্তী সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি, এছাড়া অভিষেক, চিরঞ্জিত, তাপস পাল সবার সাথেই অভিনয় করেছেন।

শিবু-নন্দিতার প্রথম ছবি ‘ইচ্ছে’র সহ-প্রযোজক হয়ে মুক্তি দিতে সাহায্য করেছেন। অভিনয় জগতে স্বনামধন্য হবার পরেও কখনো সুনির্বচনীয় হননি, এখনো যাচাই-বাছাই ছাড়া একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেন যা হতাশাজনক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার আগমনের জন্য ও তাকে দায়ী করেন অনেকে।

১৯৭১ সালের সাত নভেম্বর তাঁর জন্ম। ব্যক্তিজীবনে ১৯৯৯ সালে বিয়ে করেছেন সঞ্জয় চক্রবর্তীকে, নিন্দুকদের মুখে কুলুপ এঁটে এখনো সংসার করে যাচ্ছেন। তাদের ঘরে রয়েছে দু’টি সন্তান। নিজেকে যুক্ত করেছেন বিভিন্ন সমাজ সচেতনতা মূলক কাজে। ব্যক্তিজীবন ও চলচ্চিত্র জীবনে নিজেকে আরো বর্ণিলতর করুক, এটাই প্রত্যাশা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।