আইসিসি ট্রফিই ছিল যখন স্বপ্নের গণ্ডি

স্বাধীনতার পর ক্রিকেট দলকে গোছানোর দ্বায়িত্ব দেয়া হয় রকিবুল হাসানকে। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দেশে খেলাধুলার মতো পরিস্থিতি ছিলোনা। এরপর আসলো ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের ভয়াবহ রাত। দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রিকেট নিয়ে কে-ই বা মাথা ঘামায়? Barclays World of Cricket উল্লেখ করেছে সেসময় ঢাকা স্টেডিয়ামের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, মূল স্কয়ার কয়েক ইঞ্চি মাটির নীচে চাপাপড়ে ব্যবহার না করার ফলে।

যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে ক্রিকেট ফিরে ১৯৭৩ সালে। ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন নক আউট টুর্নামেন্ট’, ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পর্যায়ের ক্লাব চ্যাম্পিয়নশীপ শুরু হয় ১৯৭৪-৭৫ সালে, যেটাকে এখন আমরা ডিপিএল বলি। এই টুর্নামেন্টের স্পন্সর হিসেবে ১৯৮৩-৮৪ সালে আসে উইলস টোবাকো কোম্পানী, দেশের ক্রিকেটে প্রথম স্পন্সর। এই ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ প্রথম শ্রেনীর মর্যাদার ছিলোনা, অস্ট্রেলিয়ার ‘গ্রেড ক্রিকেট’ সমমান।

যাইহোক বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরলো ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। এমসিসির একটা দল বাংলাদেশ সফরে আসে। প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল’ গঠন করা হয় ইতিহাসে। বাংলাদেশ তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচ খেলে জানুয়ারী ১৯৭৭ সালে। এরপর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল তাদের সাথে দুই দিনের একটা ম্যাচ খেলে রাজশাহীতে।

প্রচুর দর্শক হয়েছিলো মাঠে। এরপর ১৯৭৭ সালেই এমসিসির একটা দল পুনরায় বাংলাদেশে সফর করে। সেসময় তারা নর্থ জোন, ইস্ট জোন এবং সাউথ জোনের সাথে ম্যাচ খেলে। ওইসময়ই প্রথম অঞ্চল ভাগ করা হয়, যেটা এখনো এনসিএলে চালু আছে। এমসিসির সুপারিশে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ আইসিসির সহযোগী দেশের মর্যাদা লাভ করে।

১৯৭৬-৭৭ সালে এমসিসির বিপক্ষে বাংলাদেশ দল।

প্রথম আন্তর্জাতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে শ্রীলঙ্কা, ১৯৭৮ সালে। শ্রীলংকা তখন টেস্ট স্ট্যাটাসের খুব কাছে। বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১৩ জানুয়ারী ১৯৭৮ সালে। তিন দিনের সেই ম্যাচে শ্রীলংকা ইনিংস এবং নয় রানে জয়লাভ করে। মোট তিনটা ম্যাচ ছিলো। কোনটাই প্রথম শ্রেনীর মর্যাদা পায়নি। এছাড়া শ্রীলংকা নর্থ জোন, সেন্ট্রাল জোন (প্রথমবার গঠিত হয়) এবং বিসিবি সভাপতি একাদশের সাথে খেলে।

প্রথম কোন ভারতীয় দল হিসেবে ফেব্রুয়ারি মাসে আসে ভারতের ‘হায়াদ্রাবাদ ব্লুজ’। তারা জাতীয় দলের সাথে একটা ম্যাচ খেলে। ১৯৭৮ সালে এমসিসি পুনরায় আসে এবং ছয়টা ম্যাচ খেলে দেশের বিভিন্ন লোকেশনে, মূলত ক্রিকেটকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য।

ক্রিকেটের তৎকালীন নিয়ন্ত্রক এমসিসি ১৯৭৯ সালের আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। রকিবুল হাসানের অধিনায়কত্বে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ ফিজিকে ২২ রানে হারিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জয় লাভ করে। বাংলাদেশের পক্ষে গাজি আশরাফুল হক ২৩ রানের বিনিময়ে ৭ উইকেট লাভ করেন। গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচ গুলার ভেতর মালয়শিয়ার সাথে জিতলেও ডেনমার্ক এবং কানাডার কাছে হেরে বিদায় নেয় বাংলাদেশ।

পাকিস্তান প্রথম আসে ১৯৭৯-৮০ সালে। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানের আগমন মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এম.এ. আজিজ স্টেডিয়ামে দুই দিনের ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ২১১ রানের টার্গেট নিয়ে ব্যাট করেছিলো বাংলাদেশ। সেসময় স্টেডিয়ামে দাঙ্গা ছড়িয়ে পরে। খেলা ড্র ঘোষনা করা হয়। এরপর ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান কখনোই নির্বিঘ্নে বাংলাদেশ সফর শেষ করতে পারেনি। এই দাঙ্গার কারণে চট্টগ্রামে একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ হবার কথা থাকলেও সেটা বাতিল করা হয়। দাঙ্গা হলেও আন্তর্জাতিক সফর বন্ধ ছিলোনা। ১৯৮১ সালে পুনরায় এমসিসি এবং কলকাতা দল এবং ১৯৮২ সালে হায়াদ্রাবাদ দল সফরে আসে।

বাংলাদেশ ১৯৮২ সালের আইসিসি ট্রফিতে অংশ নেয় ইংল্যান্ডে। টুর্নামেন্টের সেমি ফাইনালে বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের কাছে হেরে যায়। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ ওয়েস্ট আফ্রিকার বিপক্ষে ২৪৬ রান করে। গাজী আশরাফ হোসেন লিপু দলের পক্ষে ৭৭ রান করেন। জবাবে ওয়েস্ট আফ্রিকা ১৭০/৯ রান করে পঞ্চাশ ওভারে। গ্রুপ পর্বের পরের দুটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়।

চতুর্থ ম্যাচে আবহাওয়াজনিত কারণে বাংলাদেশ, মালেয়শিয়ার ম্যাচ হয় ২৫ ওভারের। বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাট করে ১২২/৭ রান তুলে (রকিবুল হাসান ৩৫), জবাবে মালেয়শিয়া ১১৩/৪ রান থেকে দ্রুত দুই উইকেট হারিয়ে নির্ধারিত ২৫ ওভারে ১২১/৬ রান তোলে। বাংলাদেশ ম্যাচ জেতে মাত্র ১ রানে। পরের ম্যাচে বাংলাদেশ বারমুডার সাথে মাত্র ৬৭ রানে অল আউট হয়। জবাবে তিন উইকেট হারিয়ে ১৫.৫ ওভারে জয় তুলে নেয় বারমুডা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডকে ছয় উইকেটে হারায়। নেদারল্যান্ডের ১৬৩ রানের জবাবে বাংলাদেশ চার উইকেট হারিয়ে ১৬৭ রান করে (ইউসুফ রহমান ৪৫)।

সেমিফাইনালে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ম্যাচটা বাংলাদেশ হারে কেভিন কারেনের কাছে। টসে জিতে ব্যাট করতে মাত্র ১২৪ রানে অল আউট হয় বাংলাদেশ (কারেন ৩১/৪) জবাবে দুই উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌছে যায় জিম্বাবুয়ে। কারেন করেন ৪৪ রান। এই কারেন পরে ইংল্যান্ড পাড়ি জমান। তার দুই ছেলে টম কারেন, স্যাম কারেন সারে কাউন্টি ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেন। বড় ছেলে টম কারেনের সম্প্রতি ইংল্যান্ডের হয়ে টি-টোয়েন্টি অভিষেক হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।

সেমি ফাইনালে হেরে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিলো তৃতীয় স্থান অর্জন করা। কিন্তু তৃতীয় স্থান নির্ধারণীর প্লে অফে পাপুয়া নিউগিনির কাছে তিন উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। প্রথমে ব্যাট করে ২২৪ রান করে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করেন ইউসুফ রহমান (১১৫)। ১৭০/০ রান থেকে ২২৪ রানে অল আউট হয় বাংলাদেশ। জবাবে পাপুয়া নিউ গিনি তিন উইকেট আর তিন ওভার হাতে রেখেই জয় পায়। তিনটা উইকেটই স্ট্যাম্পিং। ম্যাচটা আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ছিলোনা। না হলে ইউসুফ রহমানই হতেন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিয়ান।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।