অ্যান্টিবায়োটিক: প্রতিরোধ নাকি বিপর্যয়?

১.

খুব সম্ভবত আমাদের প্রজন্মে সব স্কুলেই এমন দুই একজন শিক্ষক ছিলেন যারা নাকি ক্লাসে আসতেন একটা চিকন বেত নিয়ে কিন্তু এরপরেও ক্লাসে হইচই কমাতে পারতেন না। এসব শিক্ষকদের অবস্থা এমন ছিল যে শুরুতে সবাই তাদের কে ভয় পেত কিন্তু একসময় তাদের এই ভয় দেখানোর বিষয়টা সবার গা সওয়া হয়ে যেত। এবং এক পর্যায়ে সেই শিক্ষক মার দিতে গেলেও ছাত্ররা ভয় পেত না। এর মূল কারণ ছিল ব্যক্তিত্বহীনতার কারণে ছাত্রদের কাছে মূল্যহীন হয়ে যাওয়া। অকারণে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে ভয় ভাঙ্গিয়ে ফেলা। অথচ আমাদের স্কুলে এমন শিক্ষকও ছিলেন যে আমরা চারতলায় ক্লাস করার সময়ও যদি শুনতে পেতাম দোতলায় সেই শিক্ষক এসে দাড়িয়েছেন তাহলেও সবাই মূর্তির মতো চুপ হয়ে যেত। ভয় কেটে যাওয়াটা খুব খারাপ বিষয়।

আচ্ছা এই প্রসঙ্গে একটু পরে আবার আসবো, এখন অন্য একটা প্রসঙ্গে যাই। আমার স্ত্রীর একটা অভ্যেস একসময় আমার কাছে বেশ খারাপ লাগতো। বাচ্চাদের নিয়ে একটু বেশি মাতাব্বরি করতো। ছোট বাচ্চাদের অসুখ বিসুখ খুব সাধারণ একটা ঘটনা। কয়েকদিন পর পর ঠান্ডা লাগেনি এমন বাচ্চা মনে হয় চাইলেও খুব বেশী খুজে পাওয়া যাবে না। এসব ছোট খাটো সমস্যা সমাধানের জন্য এন্টি বায়োটিক খাওয়ালেই ঝামেলা শেষ। কিন্তু আমার স্ত্রী সহজে ওষুধ খাওয়াতে চাইতো না। বাচ্চাদের কিছুদিন কষ্ট হতো কিন্তু কেন যেন এন্টি বায়োটিক খাওয়ানোর আগে একটু অপেক্ষা করতো। নিরুপায় না হলে এন্টিবায়োটিক খাওয়াতে চাইতো না। এতে বাচ্চাটা অকারণে কিছুদিন কষ্ট পেত। এন্টি বায়োটিক খাওয়ালে যেখানে দুই দিনে সেড়ে যেত সেখানে ৭ দিন লাগে।

কষ্ট করার কারণটা কি বুঝে উঠতাম না। একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলাম অকারণে এন্টিবায়োটিক ব্যাবহার করা আসলে উচিত না। বেশী ব্যাবহার করলে হিতে বিপরিত হবার সম্ভাবনা থাকে। অকারণে ওষুধ ব্যবহার করা উচিত না সেটা আগেও জানতাম কিন্তু এন্টিবায়োটিকের মতো ছোটখাটো বিষয়েও এভাবে মাথা ঘামাতে হবে সেটা ভাবিনি। কিছু জানার উদ্দেশ্যে এন্টিবডি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করলাম। পড়ে বুঝলাম বিষয়টা যতখানি ছোট খাটো ভেবেছিলাম ততটা ছোট খাটো তো নয়ই বরং ভয়ংকর বিষয়। পুরো মানব জাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এর কারণে। যা জেনেছি তার থেকে কিছু উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। অনেকেরই হয়তো বিষয়গুলো জানা। তবুও সময় থাকলে পড়তে পারেন।

২.

মানুষ জন্মের সময়ের তার শরীরে কিছু এন্টিবডি নিয়ে আসে মায়ের শরীর থেকে। এই এন্টিবডি পৃথিবীর জীবাণুর কাছ থেকে তাদেরকে প্রাথমিক সুরক্ষা দেয়। এরপর প্রতি নিয়ত নতুন অসুস্থতার সাথে সে নিজের দেহে একটা একটা করে নতুন এন্টিবডি তৈ্রী করে নেয়। বিষয়টা এরকম যে আপনার যখন জ্বর হয় তখন আপনার শরীরের সিষ্টেম সেই জ্বর সৃষ্টিকারী জীবাণুকে চিনে নিয়ে সেই অনুযায়ী নিজের মতো একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। এটাই এন্টিবডি। পরবর্তীতে যখনই আবার সেই একই জীবাণু আক্রমণ করবে তখন এন্টিবডি আপনাকে রক্ষা করবে। আমরা মাঝে মাঝে ছোট খাটো ঠান্ডা বা জ্বর হলে ওষুধ না খেলেও কয়েকদিনের ভেতর সুস্থ হয়ে যাই। এটা হচ্ছে আমাদের শরীরে এন্টিবডি থাকার কারণে। এখন জীবাণুও কিন্তু প্রতিনিয়ত নিজেদের উন্নতি ঘটায়। মাঝে মাঝে কিছু কিছু জীবানু আক্রমণ করে যা কিনা আমাদের দেহের এন্টিবডির চেয়ে শক্তিশালী হয় এবং এদের হাত থেকে দ্রুত নিস্তার পেতে এন্টি বায়োটিক প্রয়োজন হয়। যদি জীবাণু দেহে থাকা এন্টিবডির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয় তখন আমরা বেশী অসুস্থ হয়ে যাই এবং সেই সময় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সেই অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হয়।

প্রাকৃতিক উপাদানের যে রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা আছে, তা এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের বহু পূর্বে মানুষের জানা ছিল। তখন মানুষ সেভাবেই তার আত্মরক্ষা করতো। প্রথম এন্টিবায়োটিক ১৯২৭ লন্ডনের সেন্ট মেরি হাসপাতালে কর্মরত অণুজীব বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং আবিষ্কার করেন।

মেডিকেল সায়েন্স অনুযায়ী এন্টি বায়োটিক সাধারণত প্রথম প্রজন্ম থেকে চতুর্থ প্রজন্ম পর্যন্ত ভাগ করা থাকে। প্রথম প্রজন্মের চেয়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের ওষুধ বেশি শক্তিশালী, এভাবে চতুর্থ প্রজন্মের ওষুধ সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী এবং ক্ষমতাধর। চিকিৎসার নিয়ম অনুযায়ী সবার আগে প্রথম প্রজন্মের এন্টিবায়োটিক দিয়ে চেষ্টা করতে হয় এবং এর পরে ধাপে ধাপে চেষ্টা করে না হলে শেষ পর্যন্ত চতুর্থ ধাপের এন্টি বায়োটিক প্রয়োগ করতে হয়। এখানে সমস্যা হচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের এন্টিবায়োটিক যখন আপনি ব্যবহার করা শুরু করে দিবেন তখন আগের গুলো আর কাজ করবে না। কারণ তখন আপনার শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রথম প্রজন্মের শত্রুর বিপক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে চতুর্থ প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে আগেই সর্বোচ্চ শক্তি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে ফেলেছে।

তাই চতুর্থ প্রজন্ম ব্যবহার করার মানে হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তির বিপক্ষে দাড়ানোর মতো অস্ত্র আপনার কাছে আর অবশিষ্ট নেই। ‘কে হতে চায় কোটিপতি’ – অনুষ্ঠানটি নিশ্চয়ই দেখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যেতে আপনাকে অনেক ধাপ পেরুতে হয় এবং আপনার কিছু লাইফ লাইন আছে। লাইফ লাইন গুলো ব্যবহার করতে হয় সময় বুঝে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সবচেয়ে বড় লাইফ লাইনটা ব্যবহার করতে হয়। এখন আপনি যদি আপনার লাইফ লাইন আগেই শেষ করে ফেলেন তাহলে পরবর্তীতে বড় সমস্যায় পড়লে শেষ পর্যন্ত যেতে পারবেন না এটাই স্বভাবিক।

আবার লাইফ লাইন হাতে রেখে খেলা থেকে আউট হয়ে যাওয়াটাও বোকামি। রোগ বেড়ে গেলে যথা সময়ে ওষুধ খেতে হবে। এখন সেই যথাসময়টা কখন এবং আমাদের জন্য ঠিক কোন ওষুধটা কার্যকরী তা সবচেয়ে ভালো একজন ডাক্তারই বলতে পারবেন। পাচ ছয় বছর মেডিকেলে পড়ছে ডাক্তাররা আমাদের এসব ধরার জন্যেই।

বর্তমানে আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের অনেকের দেহেই প্রথম প্রজন্মের এন্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ৩য় প্রজন্মের এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০ বছরের মাঝে জীবাণুর বিপক্ষে আমাদের হাতে থাকা সব অস্ত্র শেষ হয়ে যাবে। ততদিনে যদি ৫ম প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক প্রস্তুত করতে না পারে তাহলে একটা বড় ধরণের বিপর্যয় দেখা যাবে।

এটা খুব বড় ধরণের একটা সমস্যা যা কিনা সাধারণ ভাবে অনেকেই বুঝতে পারবে না। বিশেষজ্ঞদের চোখে এটা এইডসের চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করবে। এইডস হবার জন্য কয়েকটা কারণ লাগে কিন্তু আপনার শরীরের অ্যান্টিবডি যখন জীবাণুর বিপক্ষে পেরে উঠবে না তখন সাধারণ ঠান্ডা হলেও আপনি মারা যাতে পারেন।

৩.

আরেকটা কমন সমস্যা হচ্ছে আমরা অনেকেই এন্টিবায়োটিক ডোজ কমপ্লিট করি না ( আমি নিজেও এতদিন করতাম না)। ডোজ কমপ্লিট করলে জীবানুটা সম্পূর্ণ ভাবে মরে যায়। আর এমনিতে দুই চারটা এন্টি বায়োটিক খাওয়ার পর আমরা যখন একটু সুস্থ বোধ করি তখন আসলে জীবানুটা মারা যায় না, একটু ঝিম মেরে থাকে। ঝিম মেরে যখন ফিরে আসে তখন সে আগের এন্টিবডিকে চিনে ফেলে এবং তাকে প্রটেক্ট করতে পারে। ফলে পরবর্তীতে তাকে মারতে হলে আরো হাই এন্টিবডি প্রয়োজন হয়।

আমাদের মতো অনুন্নত দেশের আরেকটা সমস্যা হচ্ছে আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসা ফলকে খুব মূল্যায়ন করি। কোন কিছুই সময়ের আগে হওয়া ভালো নয়। দেখা গেল যে এন্টিবায়োটিক দিয়ে আমাদের সাত দিনে জ্বর সাড়ার কথা তার চেয়ে হাই এন্টি বায়োটিক নিয়ে তিন দিনে সুস্থ হয়ে গেলাম। কিন্তু আমরা যে আমাদের অজান্তেই একটা অপশন কমিয়ে ফেলাম সেটা লক্ষই করলাম না। আমাদের দেশের ফার্মেসীগুলোতে অকারণেই বেশি ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দিতে চায়। এগুলো বিক্রি করলে তাদের লাভ বেশি হয়, এছাড়া রোগীও তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়। কিন্তু মূল ক্ষতিটা যে কত বড় সেটা আমরা টেরই পাই না।

বিশ্বের অণুন্নত অঞ্চলে এন্টিবায়োটিকের সবচেয়ে অপব্যবহার ঘটে। এই সব দেশে বিশেষভাবে গ্রামাঞ্চলে দক্ষ লোকের অভাবে এন্টিবায়োটিক প্রায় সর্বত্রই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা হয়। এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৮% এন্টিবায়োটিক ডাক্তারের উপদেশে বিক্রি করা হয়। এছাড়া উন্নত বিশ্বেও যে এই সমস্যা নেই তা না। আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রন কেন্দ্র (Center For Diseases Control) সি.ডি.সির এক জরিপে দেখা গেছে, সেখানে সাধারণ ঠান্ডার জন্য যে এন্টিবায়োটিক দিয়েছে তার ১০০%, এবং গলা ব্যথার জন্য যে এন্টিবায়োটিক দিয়েছে তার ৫০% অপ্রয়োজনীয়।

এভাবে অকারণে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে একটা সময় আসবে যখন আপনার দেহে কোন এন্টিবডিই আর কাজ করবে না। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে চলছে নতুন নতুন এন্টিবডি তৈরী করার জন্য। এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে একটা নতুন এন্টিবায়োটিক তৈ্রী করার জন্য বিজ্ঞানীদের গড়ে ৪০ বছর সময় লাগে। আর এত কষ্ট করে আবিষ্কার করা একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস অপব্যবহার করে নিজ হাতে নষ্ট করে ফেলছি।

৪.

মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে এই মূহুর্তে মানব জাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে জীবানু। এমন এক সময় আসবে যখন সাধারণ হাচি কাশির হলেও মানুষ মারা যাবে। জীবানুগুলো আর এন্টিবডিদের ভয় পাবে না। অনেকটা আমাদের স্কুলের বেত ওয়ালা শিক্ষকদের মতো। অকারণে ব্যাবহার করে ছাত্রদের বেয়ারা বানিয়ে ফেলা।

গত সপ্তাহে একটা রিপোর্ট দেখলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মেডিকেল কলেজের একজন রোগীর শরীরে কোন এন্টিবডি আর কাজ করবে না। বিষয়টা ভেবে দেখেছেন কি ভয়ংকর? এই মুহুর্তে সে যদি সাধারণ কাশিতেও আক্রান্ত হয় তবুও তাকে বাচানো সম্ভব হবে না।

২০৫০-২০৬০ সাল নাগাদ মানুষ একটা বড় ধরণের বিপর্যয়ের সম্মুখিন হবে । তবে আশার কথা হচ্ছে ইতিহাস বলে মানুষ আগেও অনেক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে কিন্তু এক পর্যায়ে সেই পরিস্থিতি পার করতে সক্ষম হয়েছে। একসময় সাধারণ কলেরা রোগে গ্রামের পর গ্রাম ফাকা হয়ে গিয়েছে। মানুষ সেই পরিস্থিতিকে জয় করতে পেরেছে। কিন্তু তার আগে অনেক লোকের প্রাণহানী ঘটেছে। সামনে যে সমস্যা আসবে সেটাও আশা করি সমাধান করতে পারবে। কিন্তু তার আগে কত লোক মারা যাবে সেটা চিন্তার বিষয়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।