রত্নখচিত এক অস্ট্রেলিয়া-বধ

১.

যারা ৯০ এর দশকে স্কুলে পড়েছেন তাদের সবারই স্কুল লাইফে একটা রচনা পড়তে হতো – জীবনের লক্ষ্য – Aim in life. এখন সেটা পড়েয়ানো হয় কিনা জানা নেই। আমাদের সময় বেশীর ভাগ ছেলে মেয়ে সে যাই হতে চাক না কেন খাতার ভেতর লিখে আসতো ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়।

অথচ একই সময়ের ভারতের পত্র পত্রিকা পড়লে দেখা যেত তাদের সবাই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইতো না। কেউ কপিল দেব হতে চাইতো, কেউ শচীন টেন্ডুলকার, কেউবা অমিতাভ বচ্চন আবার কেউ লতা মঙ্গেশকার।

চিন্তা ভাবনার এই পার্থক্যটুকু থাকার কারণ কি?

কারণ আছে। খুব জোড়ালো কারণই আছে।

বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের মনে কোন কিছু করার ইচ্ছে জাগে যখন তার সামনে কোন একটা উদাহরণ থাকে। এমন কোন উদাহরণ যা তার মনে দাগ কেটে যায়।

আমাদের দেশে এমন কোন মানুষ কি আমাদের প্রজন্মে দেখেছি?

বর্তমানে কোন মানুষ যদি নায়ক হতে চায় তাহলেও সে টম ক্রুজ অথবা শাহরুখ খানকে ফলো করে। আমাদের দেশের কতজন মানুষ শাকিব খান অথবা জায়েদ খান হতে চায়?

বছর খানেক আগে একটা মেয়ে সম্ভবত পাখি ড্রেস না পেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তখন এক বড় ভাই মার্কেটে এক দোকানে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিল, ‘আমাদের দেশের নায়িকারা এমন কিছু করতে পারলো না যে কেউ মৌসুমী ড্রেস অথবা শাবনুর ড্রেসের জন্য আত্মহত্যা করবে’। দোকানদার হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘ভাই, আমাদের দেশের নায়িকারাই এসে ভারতীয় সিরিয়ালের পোশাক নিয়ে যায়’।

দোকানদারের কথা কতটুকু সত্য জানিনা তবে এটা ঠিক অনেক দিন যাবত বাংলাদেশে সেরকম কোন আইডলের জন্ম হচ্ছে না। অথচ এক সময় আমাদের দেশের অনেক তরুন সালাউদ্দিনের মতো ফুটবলার হতে চাইতো।

অনেক দিন ধরে আক্ষেপ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম সেই সময়টা আবার কবে ফিরে আসবে সেটা দেখার জন্য।

২.

আক্ষেপের পালা খুব সম্ভবত শেষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশের অনেক তরুনই এখন সাকিব, তামিম কিংবা মাশরাফি হতে চায়। এদের মাঝেও সাকিব আলাদা ভাবে একটা জায়গা দখল করে আছে।

খুব সম্ভবত আমাদের দেশে সাকিবই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা তার নিজের সেক্টরে পুরো বিশ্বের মাঝে নাম্বার ওয়ান হবার গৌরব অর্জন করেছে। আমাদের দেশের অনেক তরুন যেমন পপ সংগীত শিল্পী হতে চাইলে মাইকেল জ্যাকসনকে ফলো করে ঠিক তেমনি অন্যান্য অনেক দেশের তরুনও ক্রিকেটে অলরাউন্ডার হতে চাইলে সাকিব আল হাসানকে ফলো করে। এটা যে কতো বড় একটা অর্জন সেটা বলে বুঝানো যাবে না।

অথচ মেধার দিক থেকে বাংলাদেশেই সাকিবের চেয়েও অনেক এগিয়ে আছে অনেক খেলোয়াড়। সাকিবের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে সে তার নিজের শক্তির জায়গাটা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারে এবং সেটা কাজে লাগাতে পারে।

ক্রিকেট ইতিহাসে সম্ভবত সাকিব আল হাসানই একমাত্র ক্রিকেটার যে কিনা ‘শুধু ব্যাটসম্যান’ অথবা ‘শুধু বোলার’ হিসেবে দলে জায়গা পাওয়ার দাবি রাখে।

এরকম একটা মানুষ আমাদের দেশে জন্মেছে এবং সেটা আমরা স্বচক্ষে দেখেছি বিষয়টা ভাগ্যবান না হলে সম্ভব না।

প্রতিটা দেশেই যুগে যুগে অনেক গ্রেট জন্মায়। কিন্তু যে মানুষটা প্রথম কোন কাজ করে তাকে সবসময়েই একটা বাধার সম্মুখীন হতে হয় – সেটা হচ্ছে মানসিক বাধা। ইতিহাস ভাঙাটা খুব কঠিন কাজ, সবাই পারে না। যারা পারে তারা ইতিহাসে নতুন একটা অধ্যায় লিখে রাখে তাদের কীর্তি দ্বারা।

আচ্ছা, অস্ট্রেলিয়াকে হারানোটা আমরা এত বড় করে দেখছি কেন? সেটা বুঝতে হলে আপনাকে কিছু তথ্য জানতে হবে।

৩.

টেষ্ট ক্রিকেটের সূত্রপাত হয় অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের হাত ধরে। একারণে এই দুই দেশকে ক্রিকেটের ‘Father and Mother’ ও বলা হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়া হচ্ছে এমন একটা দল যে দলের সাথে সবাই খেলতে চায়। সেটা হার জিতের কারণে নয়। কারণটা হচ্ছে সর্বোচ্চ শক্তির বিপক্ষে নিজের শক্তিটাকে যাচাই করে নেওয়া। অস্ট্রেলিয়ার সাথে খেলা হলে পরবর্তীতে অন্যান্য প্রতিপক্ষকে খুব বেশী কঠিন মনে হয় না।

সেই অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ হারিয়ে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এর আগে বাংলাদেশ মাত্র ৪ টি টেষ্ট খেলেছে। নিজেদের ১০১ তম আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫ম টেষ্টে এসে জয়টা ধরা দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা ৩য় সিরিজেই সিরিজ জয়ের একটা হাতছানি। বিষয়টা কতটা বিশাল একটা বিষয় সেটা বুঝানোর জন্য কিছু ইতিহাস জানানো জরুরী মনে করছি।

  • জিম্বাবুয়ের মতো দল ১০২ তম টেষ্ট এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩ টি টেস্ট খেলেও এখন পর্যন্ত জয় আনতে পারে নি।
  • ভারত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮ম ম্যাচে জয় পায়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয় করতে পারে তাদের দ্বিপাক্ষিক ৮ম সিরিজে।
  • সাউথ আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি ৬ষ্ঠ ম্যাচে জয় পায়। সিরিজ জয় করতে পারে ১২ তম সিরিজে।
  • শ্রীলঙ্কা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১১ তম ম্যাচে জয় পায়। সিরিজ জয় করে ৬ষ্ঠ সিরিজে।
  • ওয়েষ্ট ইন্ডিজ তাদের ৫ম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় পায়। সিরিজ জয় করে ৫ম সিরিজে।
  • একমাত্র পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হওয়া প্রথম ম্যাচেই জয় পায়। সেই সিরিজটাও এক ম্যাচের হওয়ায় সিরিজেও জয় পায়।
  • ইংল্যান্ড সিরিজ জয় করতে পারে ৩য় সিরিজে।

পাকিস্তান আর ইংল্যান্ড বাদে আর কোন দলই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এত কম ম্যাচ খেলে জয় অর্জন করতে পারে নি। আর সিরিজটা যদি জিততে পারে তাহলেও পাকিস্তানের পরেই যৌথ ভাবে ইংল্যান্ডের সাথে সবচেয়ে কম সিরিজ খেলে সিরিজ জয়ের রেকর্ড থাকবে।

শুভ কামনা বাংলাদেশ দলের পরবর্তী ম্যাচের জন্য।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।