অর্চনা-সুখেন্দুর সংসার

মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের থেকে তর্ক মতানৈক্য মনমালিন্য বিরহের হাহাকার অনেক প্রেম অনেক জুটিকে অমর করে রাখে। সুচিত্রা-সৌমিত্র জুটি ঠিক সেরকম।যার সূচনা ‘সাত পাকে বাঁধা’য় শেষ ‘প্রণয় পাশা’-য়।

অনেকেই ভাবেন সুচিত্রা-সৌমিত্র জুটি বেমানান। কিন্তু সুচিত্রা সেনের ক্যারিয়ারের জীবনের বাঁক-বদল সৌমিত্র’র সঙ্গে ছবি গুলোতেই। ‘সাত পাকে বাঁধা’ সৌমিত্র-সুচিত্রার স্বামী স্ত্রী রূপে বোঝাপড়া, ওদের দাম্পত্য বাস্তব ঘটনা করে তোলে।

উত্তম-সুচিত্রা রক্ষণশীল বাঙালীকে প্রেম করতে শিখিয়েছিল কিন্তু প্রেমের বিয়ে ভেঙে গেলে কিভাবে তাতে মলম লাগাতে হয় কিভাবে সেই পরিস্থিতি থেকে নিজের উত্তরণ ঘটানো যায় শিখিয়েছিল সৌমিত্র-সুচিত্রা-র ‘সাত পাকে বাঁধা’।আজকের সমাজেও প্রাসঙ্গিক ‘সাত পাকে বাঁধা’।এই ঘটনা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক থেকে যাবে।দু’চোখে রাগ-ক্ষোভ-অভিমানে পুরুষটির পাঞ্জাবী ছিঁড়ে দিচ্ছেন এক অভিমানীনি স্ত্রী৷

বাঙালিমাত্রই জানে এ দৃশ্য অজয় কর-র ছবি ‘সাত পাকে বাঁধা’র৷ সৌমিত্র অভিনীত আর এক সেরা চরিত্র সুখেন্দু৷ অপু আর অপর্ণার দাম্পত্য যদি জীবনের বাস্তবতার একপিঠ হয়, তবে আর একপিঠে নিশ্চয়ই থাকবে দাম্পত্যের এই ছবিটিও৷ আর দু’চোখে যন্ত্রণার কী অসম্ভব অভিব্যক্তি ধরে রেখেছিলেন সৌমিত্র, অথচ কোথাও বিন্দুমাত্র অতিরেক নেই৷১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবি যখন করছেন পরিচালক অজয় কর তখনই স্বামীর সঙ্গে সেপারেশন হয়ে যায় সুচিত্রা সেনের।

এই ছবিটি ছিল সুচিত্রার জীবনের সেই সময়েরই প্রতিচ্ছবি। ছবিতে একটি দৃশ্যে সুচিত্রা রাগে সৌমিত্রের পাঞ্জাবী ছিড়ে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি শুটিংয়ের দিনে তাঁর বাড়িতেই হয়েছিল। কথা কাটাকাটির জেরে স্বামী দিবানাথ সেনের জামা ছিঁড়ে চলে এসেছিলেন সোজা শুটিংয়ে সুচিত্রা।

‘কেউ আমাকে বুঝতে পারেনি। এমনকি সুখেন্দুও না। অথচ, তাকে বোঝাবার জন্য আমি কত চেষ্টাই না করেছি।’ – সারা ছবি জুড়ে এক অদ্ভুত সানাইয়ের সুর মন কেমন করিয়ে দেয়।

সুচিত্রার ‘সাত পাকে বাঁধা’-র ডায়লগ গুলো অমর হয়ে আছে সে তো নিজের জীবন দলিল সুচিত্রার। চুড়ান্ত ডিসটার্বড ছিলেন নায়িকা৷ মেক-আপ রুমে বসে বসে সিগারেট খাওয়া বেড়ে গিয়েছিল তাঁর, ছবিতে সুখেন্দু-অর্চনা যেমন ডিভোর্স না হলেও সেপারেট হয়ে গিয়েছিলেন, তেমনই পর্ব চলছিল সুচিত্রার নিজের জীবনেও৷

সেজন্য ছবিটা যেন আরও রিয়েল লেগেছিল। এসময়, বালিগঞ্জ প্লেসের শ্বশুরবাড়ি থেকে সংসারের পাট তুলে সুচিত্রা কিছুদিনের জন্য ভাড়া নেন ম্যুর অ্যাভিনিউয়ের একটি ফ্ল্যাট৷ সেখান থেকেই করতেন ‘সাত পাকে বাঁধা’র শ্যুটিং। পরে চলে যান নিউ আলিপুরের বাড়িতে৷ সেখানেই মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ নায়িকা নির্বাচিত হওয়ার খবর পান৷ জীবন যেমন একদিকে কেড়ে নেয়, তেমন অন্যদিকে ভরিয়েও দেয়।

আজকাল মনোবিদ দের কাছে সর্বাধিক বিবাহ কেন্দ্রিক কেস আসে। সেখানে ‘সাত পাকে বাঁধ ‘ ছবিটি দেখানো যেতেই পারে। ‘সাত পাকে বাঁধা’র গল্প, বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের ছবির গল্প গুলোয় নায়িকা বিয়ে করে সুখে সংসার করল এই দিয়ে সর্বসময় শেষ হতনা। নায়িকা আর্থিক ভাবে নিজনির্ভর দেখানো হত। তাঁর সমসাময়িক সব নায়িকাদের ছবি গুলো ভালো বউ হবার সংজ্ঞা মেনে করা। কিন্তু সুচিত্রা কখনও ডক্টর কি উকিল কি ডির্ভোর্সি-ব্যর্থ প্রেমিকা থেকে শিক্ষিকা। বিয়েটাই জীবনের মূল মন্ত্র নয়। বিয়ে ভেঙে গেলেও বাঁচা যায় সৌমিত্র-সুচিত্রা জুটির এই ছবি শিখিয়েছিল। যে পাঠ করায়নি উত্তম-সুচিত্রা-ছবিগুলি।

চিরদিনের রোম্যান্টিক ছবি হয়ে উত্তম-সুচিত্রা থাকবে যেমন, তেমন সব শেষের পরেও কি ভাবে জীবন কাটাতে হয় সেই ‘সাত পাকে বাঁধা’র গল্প রয়ে যাবে। ‘সাত পাকে বাঁধা’র প্রথম শ্যুট হয়েছিল আউটডোর-এ কলকাতার রাস্তায়। সেদিন আউটডোর শ্যুট শেষ করে সুচিত্রা সৌমিত্রকে নিয়ে গেছিলেন তাঁর বাড়ি। সেদিনি প্রথম সুচিত্রা তনয়া মুনমুন কে দেখেন সৌমিত্র।

সুচিত্রার সঙ্গে শ্যুটের ফাঁকে ফাঁকে মজা আড্ডাও হত সৌমিত্র’র। সুচিত্রা সৌমিত্রর সঙ্গে খুনসুটি করে বলতেন, ‘দেখি তোমাদের সত্যজিতের নায়ক কেমন রোম্যান্স করেন আমার সঙ্গে।’

এরপর অনেকদিন অনেকবছর এই জুটি ছবি করেননি। সত্তর দশকের শেষে অজয় কর তাঁর ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির জুটিকে নিয়েই করেন ‘দত্তা’। সুচিত্রা প্রান্তবেলাতেও সর্বোচ্চ হাইপেড নায়িকা ছিলেন।তিন লাখ টাকা নেন সুচিত্রা ‘দত্তা’র বিজয়া করতে। যা এখন তিন কোটির সমান।

বিজয়ার চরিত্রানুযায়ী সুচিত্রা বেশী বয়সী লাগলেও ঐ দাপটের দরকার ছিল তাই অজয় কর সুচিত্রার জন্যেই অপেক্ষা করেন। তখন সৌমিত্র আরও পরিনত অভিনেতা। বোঝাপড়া ভালোই হয় দুজনের। দত্তা ব্যবসায়িক সাফল্য বিশালাকারে পায়। সুচিত্রার ফ্লিমোগ্রাফিতে সর্বাধিক সপ্তাহ চলা ছবি হল ‘দত্তা’।

যখন বিজয়া মাইক্রোস্কোপে চোখ দিয়ে নরেন কে বলে ‘সব ঝাপসা’, বালিকা হয়ে ওঠে সুচিত্রার মুখ। তাই সৌমিত্র-সুচিত্রা জুটির এই শরৎ-সাহিত্য নিয়ে ছবিটি উল্লেখযোগ্য ভুলে গেলে চলবেনা।

তবে সত্যজিৎ রায় একটা কথা বলেছিলেন, ‘কোনো নারীকে জড়িয়ে ধরলে উত্তমের নার্ভ গুলো ছেড়ে দেয়, কিন্তু সৌমিত্রর কোনো নায়িকাকে আলিঙ্গন করলে নার্ভ গুলো আড়ষ্ট হয়ে যায়।’

কথাটা তো সে অর্থে ভুল নয়। রোম্যান্টিসিজমে উত্তম সেরা সৌমিত্রর উপর সম্মান রেখেই বলছি। সুচিত্রা’র শেষ নায়ক সৌমিত্র। মঙ্গল চক্রবর্তীর ছবি ‘প্রণয় পাশা’। ছবিটি ফ্লপ হলেও বিভিন্ন দিক দিয়ে ছবিটির অবদান কম নয়।

প্রথমত, সৌমিত্র’র তুখোড় নৃশংস বহুগামী ভিলেন অভিনয় এই প্রথম।তার আগে তপন সিংহ’র ময়ূরবাহন করেছেন কিন্তু তার চেয়েও ‘প্রণয় পাশা’র সৌমিত্র মারাত্মক ভিলেন যে খুনী বহুগামী লম্পট শয়তান। যে নায়িকাকে খুনের চেষ্টা করে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে নায়িকার বোনকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। এত ভয়ঙ্কর ভিলেন কি দারুন করেছিলেন সৌমিত্র।

সৌমিত্র’র ভিলেন হিসেবে উল্লেখযোগ্য তিনটি ছবি। ‘ঝিন্দের বন্দী’ যেমন তপন সিনহা’র ছবি বলে লোকে মনে রাখে। তেমনি ‘প্রণয় পাশা’ সুচিত্রা সেনের শেষ ছবি বলে আলোচিত হয়। কিন্তু ‘প্রতিশোধ’ ছবিতে আরও ভয়ঙ্কর ভিলেন হন সৌমিত্র। যে ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘প্রণয় পাশা’র মত সফিস্টিকেটেড নয়। খুব গ্রাম্য শয়তান ভিলেন। উত্তমকুমারও রয়েছেন সেই ছবিতে।

সুখেন দাসের ছবিতে জমিদার উত্তমের সব সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছেন ভাই সৌমিত্র৷সাবিত্রীকে গুম ঘরে আটকে রেখেছে সৌমিত্র। কোমর দুলিয়ে অনামিকা সাহার চিবুক ধরে মদ্যপ সৌমিত্র গাইছেন, ‘কী বিষের ছোবল দিবি কালনাগিনী তুই/ আমারও যে বিষ আছে, বুঝবি যদি তুই/হাতে হাত প্রমাণ পাবি, কেমন করে হয়/ বিষে বিষে বিষক্ষয়৷’

সেখানে সৌমিত্র-র চোখের চাহনির নৃশংসতা ফুটে উঠছে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যেন৷ ‘প্রণয় পাশা’ বা ‘ঝিন্দের বন্দি’ ছবিতে সৌমিত্রর ঝলমলে ভিলেনি মনে করেন অনেকে৷ সুচিত্রা সেনের বা তপন সিংহের ছবি বলেই৷ সুখেন দাসের ছবি বলে কি সৌমিত্রর প্রতিশোধের ভিলেনের অভিনয়ের কথা লোকে বলে না?সুখেন দাস মানেই কি সস্তা? কিন্তু ‘প্রতিশোধ’-এ সৌমিত্র সেরা ভিলেন অবশ্যই।

দ্বিতীয়ত অনেকে সুচিত্রা ফ্যানই ‘প্রণয় পাশা’ ফ্লপের জন্য সৌমিত্রকে দায়ী করেন কিন্তু সৌমিত্র বরং সুচিত্রার চেয়ে অনেক ভালো অভিনয় করেন ‘প্রণয় পাশা’য়। সুচিত্রা তখন হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে অস্থির ক্লান্ত ছিলেন তাই লাউড মেক আপে লঘু বালখিল্য অভিনয়ে ছবিটিকে ছড়ান। কিন্তু একটা প্রতিশোধ নেবার গল্পে দুরন্ত দাপট দেখান সুচিত্রা। পরিচালক আরও যত্ন নিয়ে ছবিটি করলে হয়তো ফ্লপ হতনা।

তৃতীয়ত, অনেক উত্তম-সুচিত্রা ভক্তরা দাবী করেন, ‘প্রণয় পাশা’য় সৌমিত্র থাকায় সুচিত্রা ছবি ফ্লপ করে। উত্তম থাকলে এটা হতনা।

প্রথম কথা উত্তম সুচিত্রার বিপরীতে ভিলেন করতে রাজী হতেননা হয়তো। ভিলেন উত্তম সেসময় ‘বাঘবন্দী খেলা’সহ নানা ছবিতে করেছেন কিন্তু সুচিত্রার বিপরীতে নায়ক ইমেজ উত্তম নষ্ট করতেননা।

দ্বিতীয় কথা, ‘প্রণয় পাশা’র আগের ছবি সুচিত্রার ‘প্রিয় বান্ধবী’ উত্তমের সঙ্গেই। কিন্তু সেটি চুড়ান্ত ফ্লপ করে। তাহলে সৌমিত্রকে দোষ দেওয়া কেন? ‘প্রিয় বান্ধবী’-র গল্প খুব উন্নত ছিলনা। তবে উত্তম-সুচিত্রা’র শেষ দৃশ্যটি সুন্দর।

তাই সৌমিত্র যে তিনটি ছবি করেছেন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তিনটি ছবি বিভিন্ন দিক দিয়ে তাঁদের ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য। উত্তম-সুচিত্রা জুটির স্ট্যাটাস, প্রেম, উচ্চতা, গভীরতা কালজয়ী। সেটার পরিপূরক কিছু হয়না। কিন্তু সুচিত্রার একটা সেরা অভিনয় যা বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি পায়, সর্বাধিক সপ্তাহ চলা ছবি, শেষ ছবি সৌমিত্র’র সঙ্গেই।

সৌমিত্র কন্যা পৌলমী’র বিয়ে তে সৌমিত্র মিসেস সেনের বাড়ি গেলে সুচিত্রা দেখা করেননি। কারণ তখন অন্তরালে চলে যান সুচিত্রা। নিমন্ত্রণ লোক মারফৎ নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বভাবতই যাননি।

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক সৌমিত্র’র সেভাবে ছিলনা। কিন্তু তাঁদের জুটির গুরত্ব কিছু কম নয়। সাত পাকের বাঁধনে অর্চনা সুখেন্দু দর্শকের ভালোবাসায় চিরভাস্বর।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কথা দিয়েই শেষ করি, তিনি বলছেন ‘আমি শুধু অজয় করের সপ্তপদী ছবিতে উত্তম কুমারের সঙ্গে তার ওথেলো দৃশ্যাভিনয়টির কথা বলতে চাই। নিজে অভিনেতা বলেই বুঝতে পারি, অমন শেক্সপিয়রীয় উচ্চারণ (কণ্ঠ দিয়েছিলেন জেনিফার কেন্ডাল, সঙ্গে উত্তম কুমারের লিপে উৎপল দত্ত) নিখুঁতভাবে বাঙালি ওষ্ঠাধরে ধারণ করা কতটা কঠিন কাজ। সেই কাজটি সুচিত্রা পর্দায় যতটা অনায়াসে সম্পন্ন করেছিলেন, ব্যাপারটি আসলে ততটা সহজ নয়। একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের স্বপ্নপ্রতিমা হয়ে চিত্রজগতে ছিলেন সুচিত্রা সেন। সেই স্বপ্ন একের পর এক বছর শুধু নয়, বাঙালির একাধিক দশককে আলোড়িত করেছে। ফল, সুচিত্রা সেনের স্থান বঙ্গ-মানসে এক ধরনের অমরতা লাভ করেছে বললে বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি হয় না।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।