অমিতাভের দেখানো পথে হাঁটার সময় এসেছে শাহরুখের

শাহরুখ খান এখন ঠিক সেই সময় পার করছেন যা অমিতাভ বচ্চন একসময় পার করেছিলেন!

কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে হিটের পর হিট দিয়ে অমিতাভও বলিউডের শাহেনশাহ হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ১৯৯২ সালের খুদা গাওয়া নামক ইতিহাস সৃষ্টিকারী মুভিটির পর থেকে একেবারে ২০০০ সাল পর্যন্ত পাক্কা ৮ বছর অমিতাভ টানা ফ্লপ মুভি করে গেছেন। কোন সেমি-হিটও দিতে পারেননি। এমনকি ৫ বছরের জন্য সাময়িক ‘অবসরেও’ গিয়েছিলেন বিগ ‘বি’। তার অর্থ লগ্নিকারী মুভিগুলিও ফ্লপ ছিল। শাহরুখ তো তাও এখনো বিশ্বের অন্যতম ধনী অভিনেত, কিন্তু আট বছরের এই খরায় অমিতাভ হয়ে গেছিলেন একেবারে দেউলিয়া! বাড়ি বিক্রি করতে নেমে আসতে হয়েছিল তাকে!

এর সম্ভাব্য কারণ টার সাথেও সম্ভবত শাহরুখের অসফলতার কারণটা মিলে যায় –

১. স্ক্রিপ্ট না দেখে অপ্রচুর কাজ করা

২. তার চেয়েও বড় কারণ হল ৫২ বছরের অমিতাভকে ২২ বছর বয়সী নায়িকাদের সাথে ধানের ক্ষেতে নাচানাচি করতে তখন আর দর্শক বা সমালোচকরা নিতে পারতেছিলেন না… ঠিক যেমনটা শাহরুখের এখন হচ্ছে! এর থেকে মুক্তির জন্য অমিতজীর দরকার ছিল ইমেজের একটা ‘ইভলুশন’, একটা বড়, ইমপ্যাক্টফুল চেঞ্জ!

২০০০ সালে আদিত্য চোপড়ার ‘মোহাব্বাতে’ মুভিটা আমি বলব অমিতাভ না শুধু পুরো বলিউডের জন্যই ছিল আশীর্বাদ। এই মুভিটার মাধ্যমে অমিতাভ তার নিজের এই পাকা দাঁড়িওয়ালা, রাশভারী, ব্যক্তিত্ববান, গমগমে কন্ঠের একজন ‘ভীষ্ম পিতামহ’ সুলভ ইমেজ বলিউডে স্থায়ী করতে পেরেছিলেন। তার অভিনয়ের রেঞ্জ টাই বদল করে ফেলেছিলেন! যার কারনে অমিতাভকে আবারো দর্শকরা নতুন রূপে গ্রহন করতে শুরু করলো, অমিতাভ তার বয়স আর ব্যক্তিত্তের সাথে সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ রোল করতে শুরু করলেন। এবং এখনো করছেন, সাফল্যও পাচ্ছেন। ক্রিটিকালি এন্ড কমার্শিয়ালি – দুভাবেই।

শাহরুখ কি মার টা এখানেই খাচ্ছেন না?

শাহরুখ খান তার প্রাইম টাইমে বলিউডের জন্য যা করেছেন তা বলিউডের আর কোন অভিনেতাই ইতিহাসে করতে পারেন নি, পারবেনও কী না সন্দেহ। বলিউড কমার্শিয়াল ফিল্মকে সারা বিশ্বে একযোগে ছড়িয়ে দিতে পারা, ইন্ডিয়ার গন্ডি ছাড়িয়ে গ্লোবাল আইকন হতে পারা একমাত্র অভিনেতা শাহরুখ খান। কিন্তু এটা কি তার বোঝা উচিত না এ তার বয়স ৫২ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটাও কি তার বুঝা উচিত না যে দর্শকদের আকাঙ্ক্ষা ও রুচিরও পরিবর্তন ঘটছে!

এখনও যদি শাহরুখ নিজেকে ভারুন ধাওয়ান-সিদ্ধার্থ মালহোত্রাদের সমগোত্রীয় ভাবতে থাকেন তাহলে কিভাবে হবে! রা-ওয়ান, চেন্নাই এক্সপ্রেস, হ্যাপি নিউ ইয়ার, দিলওয়ালের মতো অযৌক্তিক মাসালা ফিল্ম বা রাইস, ফ্যান, জাব হ্যারি মেট সেজালের মতো একমাত্রিক কাহিনীছাড়া মুভি করার জন্য কি আমরা শাহরুখ খানকে চেয়েছিলাম? পুরনো ভাল কাজের, ভাল অভিনয়ের নাম ভাঙিয়ে আর কতদিন।

অমিতাভ দেউলিয়া হয়েছিলেন কারণ তখন বলিউডের ব্র্যান্ডিং আর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বলতে কিছু ছিল না! শাহরুখ কখনো দেউলিয়া হবেন না, তার নামের ব্র্যান্ডভ্যালুর জন্য মুভি ১০০ কোটি ব্যবসা করে, কিন্তু হল থেকে বেরিয়ে দর্শক সমালোচক সেই নামধারীকেই একযোগে ‘ছি ছি’ করে ওঠে… শৈশব থেকে শাহরুখ খানকে ফিল্মের ইন্সটিটিউট মেনে আসা আমাদের মতো ভক্ত-সমর্থকরা কি এটা সহ্য করতে পারে? নিজের দুই যুগ ধরে গড়ে তিলে তিলে গড়ে তুলা ইমেজের ১২টা তো শাহরুখ এখানেই বাজাচ্ছেন!

শাহরুখেরও তাই আমার মতে অমিতাভের মতো এখন নিজের ক্যারিয়ারটাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো উচিত। পারলে অমিতাভের মতো নিজের অভিনয়ের রেঞ্জ পাল্টে ফেলা উচিত। অমিতাভের মতো রাশভারী ভীষ্ম পিতামহ তিনি অবশ্যই হতে পারবেন না, কিন্ত তার এমন কোন একটা প্রোজেক্ট নেওয়া উচিত যা তার ইমেজকে একেবারে নতুন করে দর্শকদের কাছে তুলে ধরবে, যা তার বয়সের সাথেও খাপ খাবে!

উদাহরণ স্বরূপ শাহরুখের গত ৭ বছরের একটা গোবরে পদ্মফুল এর নাম নেওয়া যায় ‘ডিয়ার জিন্দেগী’। এই মুভিতে শাহরুখ ছাড়া অন্যকেউ থাকলে এইমুভি ১৩০ কোটির ব্যবসা করতো না এটা শিওর! কিন্তু কেবল শাহরুখের নেইম সেইকটাই এই মুভির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল না! এই মুভিতে তিনি দীর্ঘদিন পর তার রোমান্স কমেডি অ্যাকশনের একঘেয়ে চক্র থেকে বেরিয়ে একটা ব্যাতিক্রমী ভূমিকায় ‘অভিনয়’ করেছিলেন।

দর্শক সমালোচকরা নামে মুভি দেখতে গিয়েছে, অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরেছে। যেমনটা একসময় হতাম আমরা কাল হো না হো, ডন, মাই নেম ইজ খান, চাক দে ইন্ডিয়া, স্বদেশ, দেবদাস দেখে। এগুলোতে শাহরুখ কেবল রোমান্স করেননি, অ্যাকশন করেননি, কমেডি করেননি। সবার চোখ ধাধিয়ে দিয়ে ‘অভিনয়’ করেছিলেন!

তাই লুতুপুতু রোমান্স, কাতুকুতু কমেডি আর একমাত্রিক অ্যাকশন বাদ দিয়ে এখন, ‘অভিনয়’ করার সময় এসেছে শাহরুখ খানের সামনে। ব্র্যান্ড ভ্যালুর কারণে ৩০০ কোটি ব্যবসা করা মুভিও কোনদিন গ্রহনযোগ্যতা পাবেনা যদি শাহরুখ খান ফের ‘অভিনয়’টা না করেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।