অভিনয় আমার জন্য আত্মার খোরাক: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় – পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রের এক শক্তিমান অভিনেতার নাম। প্রায় ছয় দশক ধরে নিজের অভিনয় দিয়ে সিনেমাপ্রেমী দেরবিমোহিত করে রেখেছেন তিনি। গতবছর, ১২ মে মুক্তি পেয়েছে তাঁর অভিনীত এবং নন্দিতা-শিবপ্রসাদ পরিচালিত সিনেমা ‘পোস্ত’, আর সিনেমাটিতে তাঁর অভিনয় দর্শক-সমালোচক সবার কাছেই ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। ছবিটিতে তিনি একজন নানার চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যে তাঁর প্রিয় নাতীর অভিভাবকত্বের জন্য মেয়ে এবং জামাতার সাথে  লড়াই করে। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সৌমিত্র চ্যাটার্জি’র নিজের পৌত্র রণদীপ বোস গত মার্চে বাইক দুর্ঘটনার পর কোমায় চলে গিয়েছিলেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্ক্রল.ইনে নিজের অভিনয় জীবন, সত্যজিত রায়ের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা, এবং আরও নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। তাঁর সেই কথোপকথনের কিয়দংশ তুলে ধরা হল।

আপনার অভিষেক সিনেমা ‘অপুর সংসার’ থেকেই আপনি শিশুশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। শিশুশিল্পীদের সাথে সাবলীলভাবে অভিনয়ের রহস্য কি?

আমার কাছে শিশুশিল্পীদের সাথে কাজ করা কখনো কঠিন মনে হয়নি। অনেকেই হয়ত কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তবে আমার ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। আমি সবসময় নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অভিনয়ের চেষ্টা করেছি। বাবা হিসেবে আমার সন্তানদের সাথে সম্পর্ক এবং আমার বাবার সাথে আমার সম্পর্ক, এই সম্পর্কের অভিজ্ঞতাগুলোই কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া আমার মেনটর ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যার সিনেমাগুলোতে শিশুশিল্পীদের করা চরিত্রগুলো অমর হয়ে আছে। সত্যজিৎ রায়ের এমন কোন ছবি নেই, যেটিতে শিশুদের বর্ণাঢ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। শিশুদের সাথে তিনি খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন, আর তাই তাদের থেকে সেরা কাজটাও বের করে আনতে পারতেন।

ক্যামেরার সামনে শিশুরা কি আগের চেয়ে এখন বেশি সাবলীল হয়ে কাজ করে?

আমি একমত নই। ক্যামেরার সামনে কাজ করা সব সময়ই কঠিন। একটা ছোট উদাহরণ দিই, একবার আমার এক ছবিতে একজন যৌন কর্মীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য একজন ভদ্রমহিলাকে নির্বাচিত করা হয়, যিনি বর্তমানে একটি এনজিও-তে কর্মরত আছেন। তবে পূর্বে তিনি যৌনকর্মী ছিলেন। তিনি চরিত্রটি রুপায়ন করার ব্যাপারে বেশ আত্নবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু অভিনয়ের সময় তিনি কোনোভাবেই চরিত্রে প্রবেশ করতে পারেননি। অবশেষে নির্মাতা একজন পেশাদার অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে চরিত্রটিতে অভিনয় করান।

অভিনয় এক ধরনের বিদ্যা, এটিকে অর্জন করতে হয়। ধীরে ধীরে এই বিদ্যাটিকে রপ্ত করতে হয়। চরিত্রগুলোকে অনুভব করার মাধ্যমেই অভিনয় বিদ্যা রপ্ত করা যায়।

আপনি কি কোথাও অভিনয়ের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন?

না, কখনো না।

আপনার আবির্ভাব থিয়েটারের মাধ্যমে, তাহলে সেটিই কি আপনাকে চলচ্চিত্রের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছে?

দু’টি মাধ্যম একেবারেই আলাদা। থিয়েটার আমাকে চলচ্চিত্রের জন্য হয়তবা কিছুতা সাহায্য করেছে। তবে আমার অভিনয় রপ্ত করার মাধ্যম ছিলেন মূলত সহ-অভিনেতা ও পরিচালকেরা, তাদের কাজ লক্ষ্য করা ও তাদের নির্দেশনা গুলো মেনে চলার মাধ্যমেই অভিনয় শিখেছি। আর আমি আগেই বলেছি, অভিনয় এমন একটি বিদ্যা, যেটি কাউকে শেখানো যায়না। তবে কেউ শিখতে চাইলে নিজেদের মত করে শিখতে পারে।

নতুনদের মধ্যে কেউ কি কখনো আপনার কাছে অভিনয় শেখার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে?

না, এখনো পর্যন্ত এমন কাউকে পাইনি।

‘পোস্ত’-র ব্যাপারে কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত করেছে?

চারদিকে এখন যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। নানা কারণে পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। ছেলে মেয়েরা তাদের বাবা-মাকে দেখতে আসে কালেভদ্রে, কখনো ছয় মাসে একবার, আবার কখনো বছর পেরিয়ে যায়। আর এই দূরত্ব নানা সমস্যা তৈরি করে।

এই ছবিটি একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে, যে তার দাদা-দাদির কাছে ছোটবেলা থেকে থাকে । তারাও ছেলেটিকে নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকে, ছেলেটির উপর তাদের অধিকারের জন্ম নেয়। কিন্তু এই অধিকারটি নিয়েই ছবির যাবতীয় দ্বন্দ্ব ও সমস্যাগুলো আবর্তিত হয়। আমার কাছে গল্পটি বেশ সময়োপযোগী মনে হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের সাথে মানিয়ে নিতে আপনার অসুবিধার কথা পূর্বে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছিলেন। আর নন্দিতা-শিবপ্রসাদের সাথে এটি আপনার চতুর্থ কাজ। এর আগে ‘অলিক সুখ’, ‘বেলাশেষে’ আর ‘প্রাক্তন’-এ নির্দেশকদ্বয়ের সাথে কাজ করেছিলেন। তাদের কোন বিষয়টি আপনাকে বারবার তাদের সাথে কাজে উদ্বুদ্ধ করে?

সাধারণ মানুষকে বিনোদন দিতে তাদের উপর যে দায়িত্বটি রয়েছে, সেটি ঠিকঠাক ভাবে পালনে তারা সচেতন। আর তাঁরা এই দায়িত্বটি সামাজিক-পারিবারিক বিভিন্ন ইস্যুতে চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে সুচারুভাবে পালন করছে। তাঁদের কাজগুলো মানুষকে আবেগতাড়িত করে। আর বিষয়গুলোকে গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপন করায় তাদের মুনশিয়ানা প্রশংসার যোগ্য। তারা মিলিতভাবে কাজ করার ফলে কাজগুলো আরো বেশি পূর্ণতা পায়।

সম্প্রতি সুজয় ঘোষের শর্টফিল্ম ‘অহল্যা’-তে অভিনয় করেছেন, যেটি মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আপনি কি মনে করেন, নতুন প্রজন্ম আপনাকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন করে আবিষ্কার করছে?

আমি মোটেই ‘নতুন করে আবিষ্কার করছে’ কথাটার সাথে একমত নই। সৌভাগ্যবশত, এখনো বাংলার শিশু-কিশোররা ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ দিয়ে চলচ্চিত্র দেখার হাতেখড়ি করে। আরেকটু বড় হলে তারা ‘সোনার কেল্লা’ বা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ দেখে। আমার কাজগুলো বাঙালির জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, আর এর জন্যে কৃতিত্বের দাবিদার সেই পরিচালকেরা যারা আমাকে কাজের সুযোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহাসহ আরো অনেকে।

কিন্তু এটিও স্বীকার করতে হবে যে, প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন কাজগুলো অনেক বেশি সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যমের বরাতে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনদের সিনেমাগুলো এখনো মানুষ দেখতে পারছে। আমি এখনো সেই সিনেমাগুলোর জন্য ভক্তদের কাছ থেকে বাহবা পাই।

এখন পর্যন্ত ২৫০ টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, তবুও ‘ফেলুদা’ চরিত্রটিতেই দর্শকরা আপনাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছে। এই বিষয়টি কিভাবে দেখেন?

এটি খুবই আনন্দের। প্রথম যখন ‘ফেলুদা’ চরিত্রে অভিনয় করি, আমি খুব খুশি ছিলাম এই জন্য যে, শেষ পর্যন্ত আমি এমন একটি ছবি করলাম, যেটি আমার বাচ্চারা খুব পছন্দ করবে। যা তারা তাদের বন্ধুদের নিয়ে দেখবে। কিছু সময় পরে আমি বুঝতে পারি যে, মানুষ আমাকে এই চরিত্রটিতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছে। বাইরে বের হলে ভক্তরা আমাকে ‘ফেলু’ বলে ডাকতো। মাঝে মাঝে হতাশ-ও হতাম। ভাবতাম, আমার অন্য কাজগুলো কি মানুষ দেখে না? কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বিষয়টি উপলব্ধি করতে সামর্থ্য হই যে, যদি কোনো অভিনেতাকে তাঁর একটি চরিত্রের জন্য মানুষ মনে রাখে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারেনা।

অভিনেতাদের ক্যারিয়ারের সাথে ‘উত্থান-পতন’, ‘কামব্যাক’ শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আপনার ক্যারিয়ারের প্রেক্ষিতে বিষয়গুলো কতটা প্রযোজ্য?

একদমই প্রযোজ্য না। সৌভাগ্যবশত, আমার ক্যারিয়ার সবসময়ই ক্রমশ অগ্রগতির পথেই ছিল। আমি মনে করি, অভিনয়ে সবসময় ভিন্ন কিছু চেষ্টাকরার ফলশ্রুতিতেই এটি সম্ভব হয়েছে। যেমন ‘অভিযান’ সিনেমায় একজন রাজপুত ড্রাইভার অথবা তপন সিনহা’র ‘ঝিন্দের বন্দি’-তে খল ভূমিকায় আমার অভিনয়ের প্রশংসা ভিন্ন কিছু করতে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি আবৃত্তি, লেখালেখি এবং থিয়েটার করি। মাঝে-সাঝে কোনো সিনেমা দর্শকপ্রিয়তা না পেলে আমি সেটিকে সাময়িক ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য করে পরবর্তী কাজে মনোযোগ দিতাম।

একসময় যুবসমাজের মাঝে আপনার বেশ ক্রেজ ছিল। ‘তিন ভুবনের পাড়ে’ সিনেমায় ‘জীবনে কি পাব না’ গানটিতে আপনার বিশেষ ভঙ্গীতে নাচ বেশ সারা জাগিয়েছিল।

হ্যাঁ, এটা এবং ‘হয়ত তোমারি জন্য’ গান দুটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সলিল চৌধুরী’র মতো সুধীনদাশগুপ্ত-ও (গানটির কম্পোজার) নিজের সুর করা গান নিজেই লিখতেন। যুগের সঙ্গীতের দাবি মেটাতে তারা দুজনেই পারদর্শী ছিলেন। চরিত্রটিও ছিল বাস্তব থেকে অনুপ্রাণিত, তখনকার সময় আমাদের সবার জানাশোনার মধ্যেই এমন দু-একজন ছিল, যারা একটু খাপছাড়া, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। আর আমি তাদের স্টাইল, অঙ্গভঙ্গী অনুকরণের চেষ্টাই করেছিলাম চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার জন্য।

শেক্সপিয়ারের ‘কিং লেয়ার’ নিয়ে মঞ্চে অনেক কাজ করেছেন আপনি। ভবিষ্যতে শেক্সপিয়ারের অন্য কোনো চরিত্রে কাজ করার ইচ্ছে আছে কি?

শুরুর দিকে ‘হ্যামলেট’ করার ইচ্ছে ছিল। অনেক কাজও করেছিলাম কাজটি নিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরিত্রটিকে নিয়ে মঞ্চে আসা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। আর এভাবেই একদিন উপলব্ধি করলাম যে, এই বয়সে ‘হ্যামলেট’ চরিত্রে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। খারাপ লেগেছিল খুব, শুধু মনে হচ্ছিল ‘আমি কি আর কখনো শেক্সপিয়ার নিয়ে মঞ্চে কাজ করতে পারবোনা?’ আর তখনই ‘কিং লেয়ার’ চরিত্রটি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই।

এখনো কাজ করতে কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে?

বিষয়টা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আমি কখনো আত্মতৃপ্তিতে ভুগি না। সবার জীবনেই এমন একটা সময় আসে যখন মানুষ ভাবে আসলে তার জীবনের উদ্দেশ্য কি? সে সমাজকে কি দিয়েছে?

যদি সম্ভব হত, আমিও আলবার্ট শুইয়েইটযারে’র মতো সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে কোনো এক লেবার ক্যাম্পের সেবায় নিজেকে সঁপে দিতাম। কিন্তু সেটা সম্ভব না। তখন আমি ভাবলাম, যদি আমি মানুষের জীবনে ক্ষণিকের জন্য হলেও আনন্দ নিয়ে আসতে পারি, সেটাও এক প্রকারের সমাজসেবা-ই হবে।

দর্শকদের প্রতি আমার দায়িত্ববোধই আমাকে তাঁতিয়ে রাখে। যারা আমার কাজ দেখতে আসে, তারা যেন কিছু সুখের স্মৃতি নিয়ে যেতে পারে আমার কাজ থেকে, সেই চেষ্টাই করি। তাঁরা আমাকে দেখার জন্যই গাঁটের পয়সা খরচ করে। তাই আমার সবকিছুর জন্য আমাকে তাদেরকেই ধন্যবাদ দিতে চাই, প্রযোজকদের নয়।

বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) গিয়ে অনেক পয়সা-কড়ি আয় করতে পারতাম। কিন্তু আমি গ্লামারাস জীবন-যাপনের চেয়ে মধ্যবিত্ত জীবনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, ক্যারিয়ারের এর চেয়ে আত্মার খোরাক বেশি জরুরী। অভিনয় আমার জন্য আত্মার খোরাক। আমার কাজগুলোই ভক্তদের প্রতি আমার সেবা, যাদের অফুরন্ত ভালবাসায় আমি আজকের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।