অন্যরকম এক অভিনেত্রী

১৯৭৪ সালের কথা। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার শ্যাম বেনেগালের প্রথম ছবি ‘অঙ্কুর’ গৃহপরিচারিকা ‘লক্ষ্মী’র চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় এই ছবিতে তাঁর অভিনয় গুণে মুগ্ধ হয়ে ভবিষ্যতদ্বানী করেছিলেন, ‘ও যে ভারতীয় ফিল্ম  ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সেরা অভিনেত্রী হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’

কিংবদন্তির কথা বিফলে যায়নি, বরং প্রথম ছবিতেই জাতীয় পুরস্কার পেয়ে তাক লাগিয়ে দেন। তিনি কখনো সৌদামিনী, কখনো গৃহবধূ ইন্দু কিংবা সন্তানসম্ভবা রামা। সব চরিত্রেই নিজেকে উজাড় করে দেন, হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে সুদক্ষ অভিনেত্রী বলা হয় তাকে, তিনি কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা আজমী।

‘চলচ্চিত্র নয়, কান যেন এখন ফ্যাশনের উৎসব’ – এমন সমালোচনা তো তিনিই করবেন, কারণ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতীয় অভিনেত্রী হয়ে সবচেয়ে বেশি উনিই গেছেন। বাবা কবি কাইফি আজমি, মা মঞ্চের অভিনেত্রী শওকত কাইফি।

জন্ম ১৯৫০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। ছোটবেলা থেকেই পেয়েছেন সাংস্কৃতিক আবহ। পড়াশোনাতেও মনোযোগী ছিলেন শাবানা। সেন্ট জ্যাভিয়ার্স কলেজ থেকে মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। একই সাথে তিনি পুনের খ্যাতনামা  ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার (এফটিআইআই) একজন অ্যালামনাই।

রীতিমত প্রস্তুতি নিয়েই তিনি অভিনয়ের জগতে আসেন। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে জয়া বচ্চনের অভিনয় দেখে অনুপ্রাণিত হন। তখনই শাবানা যোগ দেন এফটিআইআই-তে। এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘জয়া ভাদুরীর ‘সুমান’ ছবিটা দেখি। অনুপ্রাণিত হই। সিনেমাটা ছিল এফটিআইআই-এর বানানো। বলা যায় এই সিনেমাটিই আমাকে পুনে নিয়ে আসে।’

‘পরিনয়’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন। তবে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘অঙ্কুর’, প্রথম ছবির সাফল্যের পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি, সত্তরের দশকেই অভিনয় করেন নিশান্ত, জুনুন, স্বামী, শতরঞ্জ কা খিলাড়ি, একদিন আচানক থেকে অামার আকবার অ্যান্থনি, কর্ম, ফকিরার মত সিনেমা।

আর্থ সিনেমার একটি দৃশ্য। স্মিতা পাতিল, শাবানা আজমি ও কুলভূষণ খারবান্দা। সিনেমাটি নিজের জীবন অবলম্বনে নির্মান করেছিলেন মহেশ ভাট।

আশির দশকে এসে নিজেকে আরো পরিক্ষীত করেন, একের পর এক নন্দিত সিনেমায় করে নিজেকে অনন্য করে তোলেন। অভিনয় করেন স্পর্শ, পার, আর্থ, নামকিন, খন্দর থেকে মাসুম, ভাবনার মত কালজয়ী ছবিতে। নব্বই দশকে এসে ফায়ার ছবিতে অভিনয় করে সমালোচিত হয়েছিলেন, এমন কি মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছিলেন, এটি ছিল সমকামিতা নিয়ে ভারতীয় প্রথম চলচ্চিত্র, গডমাদার ছবিতে দুর্দান্ত রুপে পর্দায় হাজির হয়েছিলেন।

এরপর গজগামিনী, উমরাওজান, নীরজাসহ বেশকিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। শুধু হিন্দি ছবিতে নয়,অন্যান্য ভাষার চলচ্চিত্রেও নিজেকে সমাদৃত করেছেন। হলিউডের ছবি ‘সিটি অব জয়’, অপর্ণা সেনের বাংলা ছবি ‘সতী’-তেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। বাংলাদেশে নারগিস আক্তারের ‘মেঘলা আকাশ’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘সোনাটা’।

অভিনয়ের ব্যাপারে তিনি কতটা ‘সিরিয়াস’ সেটা একটু বলি। দীপা মেহতার ‘ওয়াটার’ সিনেমাটি করতে তাঁকে চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছিল। চরিত্রের প্রয়োজনে শাবানা মাথার চুল অবধি ফেলে দেন। যদিও, পরে দীপা প্রোজেক্টটি লম্বা সময়ের জন্য স্থগিত করেন। পরে আবার যখন নির্মান করেন তখন পুরো নতুন ভাবে কাস্টিং করেন।

বর্নিল ক্যারিয়ারে পদ্মশ্রী পেয়েছেন, একবার হ্যাটট্টিকসহ (১৯৮৩-১৯৮৫) মোট পাঁচবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, যা অভিনেত্রীদের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া ফিল্মফেয়ার সহ আরো বহু দেশী ও আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। সমাজকর্মী হিসেবে নিজেকে সুপরিচিত করেছেন, রাজ্যসভার সদস্য ও হয়েছেন।

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন কিংবদন্তি গীতিকার, চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতারকে। তাঁদের বিয়েরও একটা গল্প আছে। দু’জন যখন বিয়ে করতে চান তখন জাভেদ আখতার দুই সন্তান ফারহান আখতার ও জয়া আখতারের বাবা হয়ে গেছেন। তাই সম্পর্কটা প্রথমে মানতেই চাননি শাবানার বাবা-মা। তাই, শাবানা-জাভেদ আলাদা হয়ে যাবেন বলেও ঠিক করে ফেলেন। অনেক জল ঘোলার পর বিয়ে হয় দু’জনের। এখন অবশ্য ফারহান আর জয়ার সাথৌ শাবানার বোঝাপড়াটা দারুণ।

আরেক কালজয়ী অভিনেত্রী টাবু হলেন শাবানার ভাগ্নি। জয়া বচ্চনের অভিনয় শাবানাকে অনুপ্রাণিত করলেও তিনি একটা সময় ছিলেন শশী কাপুরের ভক্ত। শশীর বাবা পৃথ্বীরাজ ছিলেন শাবানাদের প্রতিবেশি। শশী যখনই বাড়ি আসতেন নিজের একটা ছবিতে অটোগ্রাফ করে রেখে যেতেন শাবানার জন্য। পরে দু’জনে ফকিরাসহ একসাথে সাতটা ছবি করেন।

কালজয়ী ‘মাসুম’ ছবিটি করার সময় শেখর কাপুরের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল শাবানার। সম্পর্কে টিকে ছিল সাতটি বছর। শোনা যায় সেই সময় বাগদানও করে ফেলেছিলেন তাঁরা। যদিও, কালক্রমে তাঁরা আলাদা হয়ে যান। যদিও, বন্ধুত্বটা আগের মতই টিকে আছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।