অধিনায়ক মুশফিকের ‘সমস্যা’ ও আমাদের টিম ম্যানেজমেন্ট

২০১১ সালের অক্টোবর মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রামের মাটিতে টেস্ট অধিনায়কত্বের অভিষেক মুশফিকুর রহিমের। বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট ক্যাপ্টেন। বাংলাদেশের ১০ টেস্ট জয়ের ৭ টিই তার অধীনে।

ব্লুমফন্টেইন টেস্টের আগে মোট ৩৩টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে সাত জয় ছাড়াও মুশফিকের দল ড্র করেছে ৯ টেস্টে, পরাজয় ১৭টিতে। সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়ার মতো ক্রিকেটের পরাশক্তিকে হারিয়ে টেস্টে বাংলাদেশের উত্থানও কাগজে-কলমে তাঁর হাত ধরেই।

অধিনায়কত্বের চাপ মুশফিকের ব্যাটিংয়েও কখনো সমস্যা তৈরি করেছে বলে মনে হয়নি। উল্টো অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর দারুণ ফর্মে বাংলাদেশের ট্যাকনিক্যালি সবচেয়ে নিখুঁত ব্যাটসম্যান মুশফিক।

শুরু থেকেই মুশফিকের অধিনায়কত্বের বিস্তর সমালোচনা। অধিনায়ক হিসাবে যথেষ্ট আক্রমনাত্মক মনোভাবের পরিচয় দিতে ব্যর্থ মুশফিক। ফিল্ড প্লেসিং, বোলিং চেঞ্জ, রক্ষনাত্মক ফিল্ডিং বিভিন্ন ইস্যুতে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে মুশফিকের অধিনায়কত্ব নিয়ে আছে হরেকরকম সমালোচনা।

এছাড়া টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত মনোপুত না হলেও তা মেনে নেয়া তার অধিনায়কত্বে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলেছে। দলের একাদশ নির্বাচন, ফিল্ড প্লেসিং, ব্যাটিং অর্ডার নির্ধারণ সবকিছুতেই টিম ম্যানেজমেন্টের একছত্র আধিপত্য। এমনকি নিজের কিপিং ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন টিম ম্যানেজমেন্টের একান্ত ইচ্ছাতেই।

ব্লুমফন্টেইন টেস্টে তার ফিল্ডিং করার জায়গা নাকি চূড়ান্ত করে দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম দিনের বেশির ভাগ সময়ই ফিল্ডিং করেছেন সার্কেলের বাইরে। সাধারণত ক্রিকেটে ম্যাচে দলীয় অধিনায়ক সার্কেলের মধ্যেই ফিল্ডিং করে থাকেন। দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনেও এই প্রশ্নটা উঠেছে। মুশফিকের উত্তরটা ছিল শিহরন জাগানিয়া—‘আমি আসলে ফিল্ডিংয়ে খুব একটা ভালো নই। কোচরা চেয়েছেন আমি যেন বাইরে বাইরে ফিল্ডিং করি। আমি সামনে থাকলে আমার কাছ থেকে নাকি বেশি রান হয়ে যায় বা আমার হাতে ক্যাচট্যাচ এলে নাকি ধরার সম্ভাবনা থাকে না।’

যে খেলোয়াড়টি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ দলের উইকেটকিপার হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, তাঁর ফিল্ডিং এতটাই খারাপ যে অধিনায়ক হলেও তাঁকে বৃত্তের বাইরে  ফিল্ডিং করতে হবে!একজন অধিনায়ক কি শুধু ফিল্ডিং করতেই বৃত্তের মধ্যে থাকেন। যেকোনো ম্যাচেই একটা পরিকল্পনা সব অধিনায়কের মাথাতেই থাকে।

কিন্তু সেই পরিকল্পনাগুলো যে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? অনেক সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলাতে হয়। নতুন পরিকল্পনাগুলো তো আসতে হবে অধিনায়কের মাথা থেকেই। আর বোলারদের সাথে কথা বলা, নানা ধরনের পরামর্শ দেয়া, এসবের দায়িত্ব তো অধিনায়োকের।

আসলে আমাদের টিম ম্যানেজমেন্ট কে? কে নাড়ছে কলকাঠি? আঙ্গুল উঠছে প্রধান কোচ হাতুরেসিংহের দিকে। হাতুরের সঙ্গে অবশ্য অধিনায়কের সম্পর্ক নিয়ে এবারই  প্রথম কথা উঠেনি। ইতিপূর্বে মাশরাফির সাথে হাতুরের খারাপ সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। অবশ্য মাশরাফি তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে কোচ হাতুরেসিংহের সাথে লড়াই করেছেন। এখানেই মাশরাফির সাথে অধিনায়ক মুশফিকের পার্থক্য।

হাতুরের ব্যাক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ দল নির্বাচনে দারুণ প্রভাব ফেলে। নাহলে কিভাবে মমিনুলকে টেস্ট স্কোয়াড থেকে বাদ দেয়। নাসিরকে দীর্ঘদিন থাকতে হয়েছে জাতীয় দলের বাহিরে। আবার মাহমুদুল্লাকে ছুড়ে ফেলতে চেয়েছিল ওডিআই  দল থেকে। এগুলো কি আসলেই হাতুরের চাওয়া। যদি তাই হয় তবে পেছন থেকে হাতুরেকে সমর্থন দিচ্ছে কে? তবে বলতে হবে হাতুরের লাগাম টেনে ধরার সময় এখনই।

দল নির্বাচনে পূর্ণ স্বাধীনতা নির্বাচকদের হাতে থাকলে ভালো দল পাওয়া যাবে। গত ৪-৫ বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটের যে উথান তা ধরে রাখতে হলে কোচ-অধিনায়কের যুগলবন্দী পারফরমেন্স থাকতে হবে। তাহলে দলে থাকবে দারুণ শৃঙ্খলা। আর সবকিছু মিলিয়ে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেয়ার সময় এসেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।