অতি চিনি দেয়া চায়ের কাপ জুড়ে থাকা বিদ্বান মাছি

হুমায়ূন আহমেদ একজন অত্যন্ত অহংকারী মানুষ ছিলেন। অতি অহংকারী যাকে বলে। অহংকারী মানুষকে কেউ সাধারণত পছন্দ করে না; কিন্তু এই অতি অহংকারী মানুষটাকে বাংলাদেশের মানুষ পাগলের মতো ভালোবেসেছে।

আমার আব্বা ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। যাদের মাথায় মগজ ছাড়া আর কিছুই নাই, তারাই সম্ভবত ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে। পরবর্তী জীবনে চাকরি-বাকরি এবং আমার ধারণা, আম্মার অত্যাচারে আব্বা গল্পের বই আর তেমন পড়তে পারেন নাই। অথচ সেই আব্বাকেও আমি চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইরে শুধুমাত্র হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তে দেখেছি। হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখে চোখের পানি ফেলতে দেখেছি। আমার আম্মা তার পাশে বসে দিলারা জামানের মতো বিরক্তি নিয়ে বলেছেন, ‘মেয়ে মানুষের মতো কাঁদো কেন?’, তাতে অবশ্য খুব একটা লাভ হয় নাই। লাখো বাংলাদেশিদের সাথে আব্বাও হুমায়ূন আহমেদের অমর সব সৃষ্টি দেখেছেন আর কেঁদেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ এবং গুলতেকিন আহমেদকে মানুষ দারুণ জুটি হিসেবেই ভাবতো। সুদর্শন ও সফল জুটি দেখতে মানুষ পছন্দ করে। নিজের জীবনে যা অবাস্তব তাই মানুষ স্বপ্নের চরিত্রদের মাঝে দেখতে পছন্দ করে। মিথিলা-তাহসানের ক্ষেত্রেও মানুষ তাই ভেবেছিল। মানুষ ভাবে এদের জীবন টিভি পর্দার মতোই ফিনফিনে। কিন্তু দিনের শেষে এরাও যে বাসায় এসে লুঙ্গি পরে এবং শ্বাশুড়ি যে এদেরকেও ৯ ঘন্টা কাজের শেষে ইফতারি ভাজতে বলে দিনের শেষে, সেটা আমরা সাধারণ মানুষরা তেমন ভাবি না। দর্শকদের রোমান্স এইসব তারকাদের জীবনে সবসময় থাকে না। হুমায়ূন আহমেদ গুলতেকিনকে ছেড়ে মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করলেন। শাওন অবিবাহিত ছিলেন। তিনই আরেকজন অবিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করতেই পারেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সব্বাইকে ত্যাগ করে তারপর শাওনকে বিয়ে করলেন। সমাজের স্বাভাবিক নিয়মে সবার হুমায়ূন আহমেদকে অপছন্দ করার কথা, কিন্তু মানুষ অপছন্দ করল শাওনকে। প্রিয় লেখককে বাঁচাতে গিয়ে মানুষ শাওনকে বলি দিয়ে দিল। নারীবাদ, পুরুষবাদ, মনুষ্যত্ববাদ, জিন্দাবাদ কোনকিছুই বেচারি শাওনকে রক্ষা করতে পারে নাই।

বেশ কিছু নামকরা কবি-সাহিত্যিক যখন স্বৈরাচারের পা-চাটছেন, শওকত ওসমানের মতো গুণী লেখক যখন মাথা নত করে হে হে করে হাসতে হাসতে এরশাদের কাছে ‘ক্রীতদাসের হাসি’র জন্য জাতীয় পুরষ্কার নিচ্ছেন, তখন হুমায়ূন আহমেদ পাখিকে দিয়ে ‘তুই রাজাকার’ বলালেন। ওই সময়ে দেশে রাজাকার, হানাদার, পাকিস্তানী বলে গালি দেয়ার চল ছিল না। হুমায়ূন আহমেদ তবু ছাড় দেন নাই।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব প্রজন্ম ভারতের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবে সমরেশ, সুনীল, বুদ্ধদেব, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র পড়ে বাংলাদেশি লেখকদের আর তেমন গোণায় ধরতেন না। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম ব্যস্ত মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কুয়াশা সিরিজ অর্থাৎ সেবা প্রকাশনীর জাদুতে। হুমায়ূন আহমেদ লাখ লাখ পাঠক তৈরী করলেন যারা পরবর্তীতে আহমেদ ছফা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আজাদ পড়ল। হুমায়ূন পড়তে পড়তেই তৈরী হলেন এখনকার অনেক নামকরা লেখক।

হুমায়ূন আহমেদ অনেক অখাদ্য নাটক বানিয়েছেন। চ্যানেল আই এবং অন্যপ্রকাশ তাকে টাকার মোহে ফেলে অসংখ্য অখাদ্য নাটক, দূর্বল উপন্যাস তৈরী করিয়েছে সত্য, কিন্তু এখনও বাংলাদেশের সেরা কয়েকটি চলচ্চিত্রের নাম বলতে গেলে হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমনি, শঙ্খনীল কারাগার, শ্রাবণ মেঘের দিন, ঘেটুপুত্র কমলার নাম চলে আসবে। নাটক বলতে তো হুয়ামুন আহমেদ আর মমতাজ উদ্দীনকেই বুঝি!

হুমায়ূন আহমেদ অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। কোটি মানুষের ভালোবাসা। হুমায়ূন আহমেদকে পছন্দ করেন না মূলত তার সমসাময়িক কিছু হাতেগোণা লেখক, সাহিত্যিক, গল্পকার, চলচ্চিত্রকার, বুদ্ধিজীবী ও আমলা যারা নিজেদের অক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা না পাবার ব্যর্থতা থেকেই তাকে হিংসা করেন বলে আমার ধারণা। এনারা হুমায়ূন আহমেদকে সস্তা ও চটুল লেখক উপাধি দিয়ে হালকা করতে চান। তাদের অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, লেখার মান ও অবস্থানকে হুমায়ূন আহমেদ তো দূরের কথা, তার পাঠক হিসেবে আমরাও চ্যালেঞ্জ করতে পারি চাইলে। এরা ভুলে যান হুমায়ূন আহমেদ জমিদারি ব্যবসা থেকে সাহিত্যে আসেন নাই, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতি উচ্চ মানের পিএইচডি সম্পন্ন করে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন। অন্যদের মতো ভণ্ডামি করতে পারেন নাই বলে তিনি গুলতেকিন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দুই-ই ছেড়েছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের একজন স্বপ্নের জাদুকর। তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, বাংলা ডিকশনারি দেখে দেখে কঠিন শব্দমালা গায়ে গায়ে জড়িয়ে, উচ্চমার্গের কল্পনাশক্তি কাজে লাগিয়ে সাহিত্য প্রসব করেন নাই বটে, তবে খুব সাবলীলভাবে তুলে এনেছেন বাংলাদেশীদের দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্নার গল্প। ঠিক এই কারণেই হয়তবা পশ্চিম বাঙলার তাবেদারি সাহিত্যানুরাগী, বাংলা ভাষার তথাকথিত ঘটি সাহিত্যের ধারক-বাহকরা হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে যে কেবল বাংলা নয়, বাংলাদেশী সাহিত্যের অবিশ্বাস্য উত্থান হয়েছে তা মেনে নিতে পারেননি তাদের পুঁথিগত বিদ্যার ঠেলায়।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশি সাহিত্যের সেরা লেখক। ছিলেন, আছেন, থাকবেন। তার জন্ম কিংবা মৃত্যুদিনে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ তাকে স্মরণ করবেন, লাখো ফেইসবুকের স্ট্যাটাস রচিত হবে, অজ পাড়াগাঁয়ে জন্ম নেবে আরেকজন তরুণ লেখক। অথচ তার সমালোচনাকারীদের মৃত্যুর পর পুরনো কিছু টেবিল-চেয়ারে, চায়ের কাপ ঘিরে গোটা বিশেক মানুষের হাপিত্যেশের কথা জানবে না ওই অতি চিনি দেয়া চায়ের কাপ জুড়ে থাকা বিদ্বান মাছিরাও।

ভালোবাসা প্রিয় লেখক। ভালোবাসা একজন হুমায়ূন আহমেদ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।